Naya Diganta

বাংলাদেশী নাজমা খানের আহ্বানে হিজাব পরছেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও

ইলি লয়েড ও গ্রেস লয়েড

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেস লয়েড যখন হিজাব পরে রমজানের প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকল, সব সহপাঠীরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানালো। সহপাঠিদের এমন আচরণে মুগ্ধ গ্রেস। আর তার সহপাঠীর চমকিত গ্রেসের মাথায় হিজাব দেখে। কাতারের রাজধানী দোহার গালফ ইংলিশ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেস লয়েড একজন ব্রিটিশ খ্রিস্টান। তবে খ্রিস্টান হয়েও এই রমজানে সে পুরো মাস হিজাব পরে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মা ইলি লয়েডের সাথে কাতারে বসবাস করে ১১ বছর বয়সী গ্রেস লয়েড। তার মা ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’ নামক দাতব্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ও একই সাথে সংস্থাটির কাতার প্রতিনিধি। ইলি লয়েড বলেন, হিজাব শুধু একটি কাপড়ই নয়, এটি মুসলিম নারীদের বিশ্বাসের সাথে যুক্ত।

ব্রাজিলের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পামেলা জাফরেদ

 

শুধু গ্রেস নয়, তার মতো আরো অনেকে বিশ্ব হিজাব দিবসের উদ্যোক্তা নাজমা খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হিজাব পরতে শুরু করেছেন এই রমজানে। ‘হিজাব চ্যালেঞ্জ’ নামের ওই কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সব ধর্মাবলম্বী নারীরা হিজাব পরছেন রমজানে। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য মুসলিম নারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ ও যারা হিজাবের কারণে বিভিন্ন সময় বৈষম্যের শিকার হন তার প্রতিবাদ।
হিজাব পরার বিষয়ে গ্রেস বলেন, ‘আমি বিষয়টিতে শক্ত অবস্থান নিয়েছি। আমার ক্লাসের সবাই হিজাব পরে, তাই আমার জন্য আরামদায়ক হচ্ছে বিষয়টি।’ অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করার কারণে যে সুবিধা গ্রেস পাচ্ছেন তার বিপরীত চিত্র আছে অন্যত্র। হিজাব চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়ে অনেকেই মুখোমুখী হয়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতির। তবুও তারা দমে যাচ্ছে না।

ব্রাজিলের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পামেলা জাফরেদও তাদের একজন যারা এই রমজানে পুরো মাস হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পামেলার মতে হিজাব তার চোখ খুলে দিয়েছে। ব্রাজিলের মধ্যাঞ্চলীয় গইয়ানিয়া শহরের বাসিন্দা পামেলার জন্ম ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে। মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজাব পরে প্রথম দিন তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, সেটি ছিলো সবচেয়ে বাজে দিন আমার জন্য। আমি হিজাব পরে জিমে গেলাম, অনেকেই কটুক্তি করতে লাগলো। গ্রুপ ভিত্তিক ক্লাস হয় সেখানে, কিন্তু আমার সাথে কেউ আসতে চায়নি যতক্ষণ না ইনস্ট্রাটক্টর তাদের ভাগ করে দেয়।’
পামেলা বলেন, এর মাধ্যমে আমি বুঝতে পারছি হিজাব পরার কারণে মুসলিম নারীদের কতটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাদের সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়।

নাজমা খান

 

বিশ্ব হিজাব দিবসের উদ্যোক্ত নাজমা খান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তার উদ্যোগেই প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় বিশ্ব হিজাব দিবস। তিনি বলেন, ‘হিজাব পরার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম নারীরা কতটা নিগৃহীত হয় সেটি বুঝতে পারবেন যারা এই কর্মসুচিতে সাড়া দিয়ে একমাস হিজাব পড়বেন।’ নাজমা খান জানিয়েছেন, মুসলিম নারীদের সাথে সংহতি জানিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হিজাব পরার কর্মসুচির ব্যাপক প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।

মরমন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক কেয়লা হাজ্জি জানিয়েছন, শুধু হিজাব নয় তিনি এ বছর রোজাও রাখতে শুরু করেছেন মুসলিমদের মতো। যুক্তরাষ্ট্রর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্রেসনোতে বসবাসকারী ৩৫ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘মুসলিমদের কাছাকাছি না আসলে আমি বুঝতে পারতাম না তাদের সাথে মেশা কতটা আনন্দের’। তিনি চান হিজাব চ্যালেঞ্জের সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়–ক, যা মুসলিম নারীদের অধিকার আদায়ে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, মুসলিম নারীরা তাদের পোশাক নিয়ে কতটা সংগ্রাম করেন সেটিও বুঝতে পারতাম না হিজাব না পরলে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম নারীদের হিজাব পরার কারণে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দেশটিতে মুসলিমদের ওপর হেট ক্রাইম অনেক বেড়ে গেছে। মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপগুলো প্রায়ই মুসলিমদের দেশ থেকে বের করে দিতে প্রচারণা চালায়। ইউরোপীয়ান আদালতও গত বছর কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় চিহ্ন সম্বলিত পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা নাজমা খান আশা করছেন, এই কর্মসুচির মাধ্যমে সারা বিশ্বে হিজাবের বিষয়ে সচেতনা তৈরি হবে। মুসলিম নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার একটি অংশ যে হিজাব সে বিষয়টি সবাই বুঝতে পারবে। এবং সারা বিশ্বে মুসলিম নারীরা কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই হিজাব পরতে পারবেন।

আরো পড়ুন : ১০ বছর ধরে ছিন্নমূল মানুষের জন্য ইফতার
সোহেল রানা, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) 
১০ বছর যাবৎ ছিন্নমূল, পথচারী ও এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য চলছে ইফতার আয়োজন। প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিনশত মানুষ একত্রে ইফতার মাহফিলে অংশ নেন। শুধু মুসলিম নয় এলাকার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানদের মাঝে বিতরণ করা হয় ইফতার সামগ্রী। এলাকাবাসী বলছে এতে বাড়ছে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ। সেই সাথে রমজান মাস যেন এই এলাকায় উৎসবে পরিণত হয়। আর আয়োজকরা বলছে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছে হাত পেতে নয়, এলাকাবাসীই আগ্রহ সহকারে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা-পয়সা, চাল-ডাল দিয়ে সহায়তা করে আয়োজন করছে ইফতার মাহফিলের।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের বেলগাছি এলাকায় ২০০৮ সালে কয়েকজন লালন ভক্ত লালনকে ধারন করে লালনের বাণী পৌঁছে দিতে গড়ে তুলেন বেলগাছি আরশি নগর লালন স্মৃতি সংঘ। যার প্রতিষ্ঠাতা ওই এলাকার ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম আক্কাছ। প্রতিষ্ঠানটি বেলগাছি রেলস্টেশন সংলগ্ন। ওই বছরই রেল স্টেশনে থাকা কয়েকজন ছিন্নমূল মানুষ শুধু পানি দিয়ে ইফতার করতে দেখে তারা উদ্যোগ নেন ছিন্নমূল মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করার। শুরু হয় কাজ। তখন প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জনকে ইফতার করাতেন। সেই থেকে শুরু যা চলছে এখনো।

এলাকাবাসী জানান, প্রতিদিন দুপুর থেকে চলে ইফতার আয়োজন, চাল, ডাল, আলু, গাজরসহ বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি হয় খিচুরি সেই সাথে ছোলা, মুড়ি, খেজুর ও পানির ব্যবস্থা থাকে। আর এই ইফতার আয়োজনে অংশ নেন রেলস্টেশনে থাকা ছিন্নমূল মানুষ, পথচারী ও এলাকার মানুষ।

এলাকাবাসী আরো জানান, রাজবাড়ীর অন্য কোথাও এমন আয়োজন নেই। এক সাথে এই ইফতার করাটা একটা আনন্দের বিষয় এমন একটি সুন্দর আয়োজন দেশের সব স্থানে হলে একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

বেলগাছি আরশি নগর লালন স্মৃতি সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুল আলম আক্কাছ জানান, ছিন্নমূল মানুষের কথা ভেবে ২০০৮ সাল থেকে আমরা শুরু করেছি ইফতার মাহফিলের, যা চলমান আছে। প্রতিবছর রমজানের পুরো মাস এই আয়োজন থাকে। প্রতিদিন ইফতার আয়োজনের জন্য ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয় আমরা কোনো দল বা কারো কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেই না। আমরাই নিজেরা এর যোগান দিয়ে থাকি সামনেও এর ধারা অব্যহত থাকবে।