Naya Diganta

যেসব কাজে রোজা ভেঙে যায়

মদিনার মসজিদে নববীতে ইফতারের দৃশ্য

সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। আরবি দ্বিতীয় হিজরিতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন মুসলিমদের ওপর রোজ ফরজের বিধান নাজিল করেন। প্রতি বছর রমজান মাসে সারা বিশ্বের মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করেন। রোজ অবস্থায় কিছু কাজ করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা আদায় করা ওয়াজিব হয়। আবার কিছু কাজ আছে যেগুলোতে রোজা ভেঙে যায় এবং সেই রোজার জন্য কাজা আদায় এবং কাফফারা দুটোই করতে হয়।

যেসব কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাজা করা ওয়াজিব হয়

৮ কাজে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাজা করা ওয়াজিব হয়; কাফফারা-

১. স্ত্রীকে চুম্বন বা স্পর্শ প্রভৃতির করার কারণে বীর্যপাত হলে।

২. স্বেচ্ছায় মুখ ভরে বমি করলে।

৩. পাথরের কণা, লোহার টুকরো বা ফলের বিচি গিলে ফেললে।

৪. ডুস গ্রহণ করলে।

৫. নাকে বা কানে ফোটায় ফোটায় ওষুধ নিলে।

৬. পেট বা মাথার ক্ষতস্থানে তরল ওষুধ ব্যবহারের পর তা পেটে বা মস্তিষ্কে পৌছে গেলে।

৭. গুহ্যদ্বার ও যোনীপথ ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে যৌনক্রিয়া করার ফলে বীর্য নির্গত হলে।

৮. স্ত্রীলোকের যোনীপথে ওষুধ ব্যবহার করলে।

 

যেসব কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং কাজা-কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব হয়

৩টি কাজে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং কাজার সাথে সাথে কাফফারাও ওয়াজিব হয়। সেগুলো হলো, রোজার নিয়ত করার পর-

১. স্বেচ্ছায় এমন বস্তু খাওয়া যা খাদ্য বা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২. স্বেচ্ছায় এমন বস্তু পান করা যা খাদ্য বা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩. ইচ্ছাকৃতভাবে গুহ্যদ্বার কিংবা যোনীপথে সহবাস করা। সহবাসের ক্ষেত্রে বীর্যপাত ঘটা শর্ত নয়; বীর্যপাত না ঘটলেও কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হবে।

মাসআলা : রোজা অবস্থায় কেউ কোনো বৈধ কাজ করলো। যেমন স্ত্রীকে চুম্বন দিল কিংবা মাথায় তেল দিল, তা সত্ত্বেও ওই ব্যক্তি রোজা নষ্ট হয়ে গেছে মনে করে এর পরে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করলো, এমন ব্যক্তির উপর সে রোজার কাজা কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব হবে।

আরো পড়ুন:

অনন্য ইবাদত কিয়ামুল লাইল
হাফেজ মাওলানা আবদুল কুদ্দুস

কিয়াম শব্দের অর্থ দাঁড়ানো বা দণ্ডায়মান হওয়া। আর দণ্ডায়মান হওয়া নামাজের আরকানের একটি। হোক সেটি ফরজ কিংবা নফল। এখানে কিয়ামুল লাইল বলতে- গভীর রজনীতে দাঁড়িয়ে যে নামাজ আদায় করা হয় তাকে বুঝানো হয়েছে। যে নামাজের ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা মুজাম্মিলে বর্ণিত হয়েছে- ‘রাতে জাগরণ করো (নামাজ আদায় করো)। রাতের কিছু অংশ বা তার কম অথবা তার একটু বেশি’। আর নফল নামাজের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময় নামাজ হচ্ছে কিয়ামুল লাইল; যা তাহাজ্জুদ নামাজ হিসেবে পরিচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ঘোষণা করেন- ‘তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রায় যেত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত’। (সূরা আযযারিয়াত : ১৭-১৮) সুতরাং রাতে কম ঘুমিয়ে নামাজে মশগুল থাকা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা নেককার, পরহেজগার ও মুত্তাকিদের অন্যতম বিশেষ গুণ।

প্রবৃত্তি দলনে কিয়ামুল লাইলের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে মন্দ ও খারাপ কাজের দিকে পরিচালিত করে। নফসের কুপ্রভাব, প্রতারণা ও ধোঁকা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এবং নফসের উন্নতি সাধনে এই নামাজের কার্যকারিতা অতুলনীয়। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে : ‘নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রিতে উঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল’। (সূরা মুজাম্মিল : আয়াত : ৬) সুতরাং রাত্রিতে জেগে মনের সব কালিমা মোচনের জন্য কিয়ামুল লাইল অধিক ফলপ্রসূ। আর নফসের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে মুমিনের রাত জাগরণ করা জরুরি। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা: বলেন, তাহাজ্জুদ-এর অর্থ রাত্রিতে ঘুমের পর গাত্রোত্থান করা। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ।

কিয়ামুল লাইল নামাজ আদায়ের শ্রেষ্ঠ সময় পবিত্র রমজান মাস : 
রাসূলে আকরাম সা: রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি কিয়ামুল লাইল আদায় করেছেন। কিয়ামুল লাইল আদায় করলে গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা দিয়েছেন তিনি।

অপর একটি হাদিসে রাসূল সা: বলেন : ‘কেউ রমজানে একটি নফল আদায় করলে অন্য সময়ের ফরজ আদায়ের সওয়াব পাবে। আর ফরজ আদায় করলে অন্য সময়ের ৭০টি ফরজ আদায়ের সমান হবে।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস নং- ৩৩৩৬)

জলিলুল ক্বদর সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন; তবে দৃঢ়ভাবে নির্দেশ দিতেন না। এরপর তিনি বলতেন : যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশা নিয়ে রমজান মাসে কিয়াম করবে (রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে) তার আগের সব গুনাহখাতা মাফ করে দেয়া হবে।’ 
রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল নামাজ আদায়ের অপর একটি ফজিলত হচ্ছে এ মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। আর যে ব্যক্তি পূর্ণ রমজান কিয়ামুল লাইলে কাটাবে সে অবশ্যই ভাগ্যরজনী লাইলাতুল কদর পাবে।

রমজান মাসে কিয়ামুল লাইলের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা শরিয়তসম্মত; বরং সেটা একাকী আদায় করার চেয়ে উত্তম। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামুল লাইলের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। এমনকি মহিলাদের জামাতের সাথে কিয়ামুল লাইল পালনের অনুমোদন দিয়েছেন।

হজরত আবু যার রা:-এর হাদিসে এসেছে, মহিলাদের জন্য জামাতে হাজির হওয়া শরিয়তসম্মত। বরং মহিলাদের জন্য পুরুষদের ঈমামের পরিবর্তে পৃথক ঈমাম নির্ধারণ করাও জায়েজ। কেননা হজরত ওমর রা: যখন জামাতের সাথে কিয়ামুল লাইল আদায় করার জন্য লোকদের সমবেত করলেন তখন পুরুষদের জন্য উবাই বিন কা’ব রা:কে এবং মহিলাদের জন্য সুলাইমান বিন আবু হাছমা রা:কে ঈমাম নিযুক্ত করলেন। আরফাজা আল-ছাকাফি রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আলী বিন আবু তালেব রা: রমজান মাসে লোকদের কিয়ামুল লাইল আদায় করার নির্দেশ দিতেন। তিনি পুরুষদের জন্য একজন ইমাম ও মহিলাদের জন্য অন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করতেন। তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম মহিলাদের ঈমাম’।

কিয়ামুল লাইল নামাজে খতমে কুরআন :
হজরত ওমর রা:-এর জমানায় এটাই ছিল সাহাবায়ে কেরামের আমল। আব্দুর রহমান বিন উবাইদ আল-ক্বারি বলেন : একবার রমজানের এক রাত্রিতে আমি ওমর রা:-এর সাথে মসজিদের উদ্দেশে বের হলাম। এসে দেখলাম লোকেরা বিক্ষিপ্তভাবে নামাজ আদায় করছে। কেউ একাকী নামাজ পড়ছে। কারো পেছনে একদল লোক নামাজ পড়ছে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ, আমি মনে করি আমি যদি এদের সবাইকে একজন ক্বারির পেছনে একত্রিত করি সেটাই উত্তম। এরপর তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সবাইকে উবাই বিন কা’ব রা:-এর পেছনে একত্রিত করলেন। তিনি বলেন, এরপর অন্য এক রাতে আমি তাঁর সাথে বের হলাম; গিয়ে দেখলাম লোকেরা তাদের ক্বারির পেছনে নামাজ পড়ছে। তখন ওমর রা: বলেন : ‘এটি কতই না উত্তম আমল! তারা যে সময়টায় ঘুমিয়ে থাকে সে সময়টা, যে সময়টা নামাজ পড়ে সে সময়ের চেয়ে উত্তম (তিনি শেষ রাতের কথা বুঝাতে চেয়েছেন)। লোকেরা প্রথম রাত্রিতে নামাজ পড়তেন।’

আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের দেশে অনেক মসজিদেই কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) নামাজ জামাতের সাথে আদায়ের সুযোগ রয়েছে। মসজিদ কমিটি হাফেজদের মাধ্যমে কোথাও এক খতম, কোথাও দুই খতম, আবার কোথাও তিন খতম কুরআনুল কারিম নামাজে তিলাওয়াত শুনার ব্যবস্থা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে ঢাকা শহরের উল্লেখযোগ্য মসজিদগুলো হলো- জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম, গাউছুল আজম জামে মসজিদ, মহাখালী, শ্যামলী শাহী মসজিদ, শাহজাহানপুর, রাজারবাগ ইত্যাদি। সুতরাং রমজানে কিয়ামুল লাইল পালনের মোক্ষম সুযোগকে কোনোক্রমেই হাতছাড়া করা যাবে না।
সারা বছর তাহাজ্জুদ পড়তে না পারলেও রমজান মাসে তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করা প্রতিটি খাঁটি মুমিনের দায়িত্ব। এমনিতেই তো আমরা বিভিন্ন গুনাহে জর্জরিত। পঙ্কিল ও পূতিদুর্গন্ধময় জীবন থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে স্বচ্ছ, পবিত্র ও নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী হতে হলে এর চেয়ে উত্তম সুযোগ আর হতে পারে না। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) নামাজ আদায়ের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়