১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

১০ বছর পর কী হতে যাচ্ছে পৃথিবীতে!

১০ বছর পর কী হতে যাচ্ছে পৃথিবীতে! - ছবি : সংগৃহীত

বাড়ছে অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলার হার।আগুন জ্বলছে। প্রতি সেকেন্ডে, ঘণ্টায়, দিনে, বছরে উষ্ণতা বাড়তে বাড়তে ক্রমেই জলন্ত অগ্নিপিণ্ড হয়ে উঠছে পৃথিবী। নেভানোর জন্য সময় মাত্র ১০ বছর। আর লক্ষ্যপূরণ না হলে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভয়ঙ্কর বিপদ। মানব সভ্যতার জন্য অপেক্ষা করছে মহাপ্রলয়ের মতো বিপর্যয়। জাতিসঙ্ঘ নিয়োজিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ছিল শুধুই বিপদের আগাম পূর্বাভাস। এবার সরাসরি তার ফল ভুগতে শুরু করেছে মানবগ্রহ। আর উপমহাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে তিন থেকে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। মেট্রো শহরগুলি হয়ে উঠতে পারে ‘তপ্ত দ্বীপ’।

সোমবারই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওলে আইপিসিসি-র বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্ট বলা হয়েছে, প্রথমবারের জন্য পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পৌঁছে গেছে ১ ডিগ্রিতে। কমার পরিবর্তে বেড়েই চলেছে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণ। তার জের ধরে অ্যান্টার্টিকা আর গ্রিনল্যান্ডে বরফ গলনের হার আরো বাড়ছে। আরো উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০-এর মধ্যে এই মাত্রা পৌঁছে যাবে দেড় ডিগ্রিতে। এই কারণেই ভয়ঙ্কর ও অভূতপূর্ব উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবীর তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি বেড়ে গেলে কী কী হতে পারে, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অ্যান্টার্কটিন্টা ও গ্রিনল্যান্ডে আরো দ্রুত গলবে বরফ। দক্ষিণ গোলার্ধে উষ্ণতা বাড়লে তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বেই। পাহাড়প্রমাণ হিমশৈল তথা বরফের চাঁই গলে সমুদ্রের পানিতে মিশবে। আয়তন বাড়বে পানিভাগের। পানির স্তরের উচ্চতা তখন আর ইঞ্চিতে নয়, প্রতি বছর ফুটের হিসাবে বাড়বে। ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে বাস্তুতন্ত্র। আর তারপর এক সময় অপেক্ষা করতে হবে শুধুই মহাপ্রলয়ের।

আইপিসিপি-র বিজ্ঞানীরা একইসঙ্গে রাষ্ট্রনেতাদের তুলোধনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, ২০১৫-র প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৫০ দেশ গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণ কমানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। তাদের দাবি, ওই চুক্তি যে শুধুই কাগজে-কলমে থেকে গেছে, তার প্রমাণ পৃথিবীর এই রেকর্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রনেতারা জলবায়ু তথা পরিবেশের এই ভয়ানক বিপদের কথা বুঝতেই পারেন না বলেও দাবি বিজ্ঞানীদের। তার উদাহরণ, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণকারী দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্যারিস চুক্তি থেকে তাদের দেশকে সরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ডের অন্যতম মুখ্য বিজ্ঞানী ক্রিস ওয়েবার যেমন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বলেছেন, ‘‘সম্ভব ও অসম্ভব নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর।’’

তবে শুধুই আশঙ্কা নয়, মুক্তির উপায়ও রয়েছে আইপিসিপি-র রিপোর্টে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এখনো পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়নি। সহজ সরল ভাষায় বুঝিয়েছেন, মুক্তির দু’টিই শর্ত। হয় কার্বন ডাই অক্সাইড তথা গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে, নয়তো এমন কিছু করতে হবে, যাতে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া গ্রিন হাউস গ্যাস শুষে নেয়া যায়। এবং এই শুষে নেয়া বা পরিশুদ্ধ করার পরিমাণ হতে হবে নির্গমণের থেকে বেশি।

নির্গমণ কমানোর জন্য বরাবরের মতোই আবারো অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারে জোর দেয়ার কথাও বলেছেন বিজ্ঞানীরা। সৌরশক্তি, পানিবিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, এটা করলে অন্তত ২০৫০ সালের মধ্যে ফের জলবায়ুর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। না হলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও স্পষ্ট ইঙ্গিত বিজ্ঞানীদের।

রিপোর্ট পেশের পর সংবাদ সম্মেলনে আইপিসিসি-র চেয়ারপার্সন হোসিয়াং লি বলেন, ‘‘বিশ্ব উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বেঁধে রাখা অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য সমাজের সব স্তরে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রাক্তন বিশেষ দূত ম্যারি রবিনসন বলেন, ‘‘আমাদের নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজেদেরই পরিকল্পনা করতে হবে। আমাদের সময় খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দায়িত্ব বিশাল।’’

কীভাবে তৈরি হয়েছে জাতিসঙ্ঘের এই রিপোর্ট। সারা বিশ্ব থেকে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রায় ছয় হাজার উদাহরণ নিয়ে সেগুলি বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। বিশ্বের কয়েক হাজার পরিবেশ বিশারদ ও বিজ্ঞানীর মতামত নেয়া হয়েছে। ৪০টি দেশের ৯১ জন লেখক ও সম্পাদক এই রিপোর্ট তৈরি করেছেন।

 


আরো সংবাদ