১৯ নভেম্বর ২০১৮

বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল...

কদম ফুল - সংগৃহীত

ষড়ঋতুর লীলার মধ্যে বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যে বর্ষাকাল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বসন্তকে ঋতুরাজ বললেও রূপের গৌরব ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের জন্য বর্ষাই প্রকৃতির রানী। বর্ষার আগমনে খালবিল জলমগ্ন হয়ে যায়। বর্ষার মাঠে এলোমেলো বাতাসে সবুজ ধানের শিষগুলোর দুলুনি আর পানির ঢেউয়ের ছন্দমিল দৃশ্য অভিভূত করে তোলে মন। খাল-বিলে অজস্র শাপলা ফুটে হাসতে থাকে। ছোট ছেলেমেয়েরা ডুবিয়ে ডুবিয়ে শাপলা-শালুক কুড়ায়, যেন ডুবসাঁতারে হার মানায় পানকৌড়িকেও। এ সময় পল্লীবধূরা ছই নৌকায় বাপের বাড়ি নাইয়র যায়। শাড়ির আঁচলের ফাঁকে ঘোমটা পরা রাঙামুখ ফিরে ফিরে চায় ফেলে আসা পথ পানে। পানির স্রোতের কল কল ধ্বনি আর বাতাসে পালের শব্দ। নৌকা চলতে থাকে আপন মনে। দরাজ গলায় মাঝি গেয়ে ওঠে উদাসী ভাটিয়ালী গান। কতই না আনন্দ অনুভূত হয়! রিমঝিম বৃষ্টির মিষ্টিমাখা সুরে প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতি। হেসে ওঠে সবুজরঙা গাছপালা।

বর্ষা মানে বাহারি রঙের সুগন্ধী ফুলের সমাহার। বর্ষা যেন আমাদের প্রকৃতিকে আপন মনে বিলিয়ে দেয় এবং এর ফুলের সৌন্দর্য আমাদের করে তোলে বিমোহিত। বর্ষার নানারকম ফুলগুলো ফুটতেও শুরু করেছে। বর্ষার যে ফুলগুলো আমাদের আকৃষ্ট করে তোলে তাহলো- শাপলা, কদম, কেয়া, কলাবতী, পদ্ম, দোলনচাঁপা, সোনাপাতি (চন্দ্রপ্রভা), ঘাসফুল, পানাফুল, কলমী ফুল, কচুফুল, ঝিঙেফুল, কুমড়াফুল, হেলেঞ্চাফুল, কেশরদাম, পানি মরিচ, পাতা শেওলা, কাঁচকলা, পাটফুল, বনতুলসী, নলখাগড়া, ফণীমনসা, উলটকম্বল, কেওড়া, গোলপাতা, শিয়ালকাটা, কেন্দার, কামিনী, রঙ্গন, অলকানন্দ, বকুল এবং এ ছাড়া নানা রঙের অর্কিড। বর্ষা ঋতু যেন ফুলের জননী।

কদম : 'বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল...'। বাংলাদেশের কদমফুল বর্ষার স্মারক। আমাদের ঐতিহ্যে ও সাহিত্যে কদম ফুল আদি প্রাচীন। বর্ষার বৃষ্টিতে যেন কদমফুল বেয়ে অশ্রু ঝরে। কদমফুল Rubiaceae পরিবারভুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Antho cephalus kadamba। এগুলো সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলে পাওয়া যায়। কদমগাছ সাধারণত ৩০-৪০ ফুট লম্বা হয়। প্রস্থ ঊর্ধ্বে ৫ থেকে ৭ ফুট হয়। ফুল গোলাকৃতি লম্বা বৃন্তে দণ্ডায়মান। ফুলের রঙ হলুদ সাদায় মেশানো। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেই এই ফুল ফোটে। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ প্রথম এই কদমগাছে উঠে বাঁশি বাজান এবং তার দয়িতা শ্রীরাধিকাকে আকৃষ্ট করেন। এই ফুলের সৌন্দর্য আছে কিন্তু গন্ধ নেই।

শাপলা

 

শাপলা : আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা সর্বত্রই পাওয়া যায়। সমাজের সর্বস্তরের লোকের হৃদয় হরণকারী এই ফুল। আমাদের কাছে এগুলো আটপৌরে মনে হলেও আজ অনন্যতায় ভাস্বরিত। শাপলার (জাতীয় ফুল) বৈজ্ঞানিক নাম Nzmphaca lotus। Nzmphaece পরিবারে ৮টি গোত্র ও ৯০টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাপলা জাতীয় প্রজাতি হলো- সাদা বা লাল শাপলা, হলদে শাপলা, নীল শাপলা ও বড় শাপলা। সাদা শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। তা ছাড়া শাপলা ফুল এবং পাতা সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলের নাম ঢেপ। যার থেকে সুস্বাদু এবং ছোট ছোট গোলাকার মুড়ি তৈরি হয়ে থাকে। এই মুড়ি থেকে মোয়াও তৈরি হয়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা ফুলের ডাঁটা ভেঙে সুন্দর সুন্দর গহনা বানিয়ে গলায় পরিধান করে। এ ছাড়া এ ফুল পুকুর-ডোবা, খাল-বিলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।

দোলনচাঁপা : দোলনচাঁপার ইংরেজি নাম Butterflz Lilz ও বৈজ্ঞানিক নাম Hedzchium coronarium। বাংলায় দুলালচাঁপা বা গুলবাকাওলী বলেও ডাকা হয়। এটিও সাদা রঙের ফুল। বড় বড় দু’টি পাপড়ি। ফুলটা দেখতে ভারী মিষ্টি। পাপড়ি দুটো প্রজাপতির ডানার মতো দেখতে লাগে বলে এর ইংরেজি নাম বাটারফ্লাই লিলি।

দোপাটি : চমৎকার একটি ফুল দোপাটি। এর ইংরেজি নাম Touch me not। বৈজ্ঞানিক নাম Impatiens blasmina। ফুলগুলো একক অথবা জোড়া হয়। গোলাপি, লাল, বেগুনি, লাইলাক, আকাশি, নীল, সাদাসহ আরো কয়েক রঙের ফুল হয়। দোপাটির অনেকগুলো জাত রয়েছে। এই ফুলটি শুধু বর্ষা নয়, গ্রীষ্মকালেও ফোটে। মে-জুন মাসে লাগালে বর্ষায় ফুল পাওয়া যায়।

কেয়া : কবি নজরুল কেয়াকে নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন- ‘রিমি ঝিম রিমি ঝিম ঐ নামিল দেয়া/শুনি শিহরে কদম, বিদরে কেয়া।’ আবহমানকাল ধরে বাংলায় কেয়া ফুলের সুগন্ধের খ্যাতি ছড়িয়ে আছে। বর্ষাকালে কদমফুল দেয় যেমন দৃশ্যের আনন্দ সেরকম এই কেয়া ফুল দেয় সৌরভের গৌরব। এই ফুল বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডল এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Pandamus Odoratiss imus, Pandamus নামটা এসেছে মূলত মালয়েশিয়া থেকে। এর পাতা সরু লম্বা এবং কাঁটাযুক্ত। ফুলগুলো শ্বেতবর্ণ, ধানের ছড়ার মতো বিন্যস্ত এবং উগ্র সুবাসযুক্ত। এর বায়বীয় মূল কাণ্ড থেকে ঝুলে পড়ে বায়ু থেকে খাদ্য উপাদান নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। অনেক সময় ফুলগুলো পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এর ঘ্রাণে বিমুগ্ধ হয়ে সাপ ও বিষাক্ত কীটপতঙ্গ গাছে জড়িয়ে থাকে। পারফিউম তৈরি করতে এর রস ব্যবহৃত হয়। গ্রাম্য মেয়েরা সৌন্দর্য চর্চায় এই ফুল অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করে।

চালতা ফুল : চালতা সুদৃশ্য পত্রমোচি বৃক্ষ। বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica। গাছের উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার। কাণ্ড অনেক বড় নয়। শাখা-প্রশাখা এলোমেলো। ছায়াঘন ও প্রসারিত। বাকল লালচে, মসৃণ। পাতা টিয়াসবুজ আর দীর্ঘ হয়। পাতার শিরাবিন্যাস তীক্ষè ও খাজকাটা। পাতার এই আকৃতির কারণে চালতাকে রূপসী গাছ বলা হয়। চালতার ফুল আকারে বেশ বড় হয়। এই ফুল শ্বেতবর্ণের ও সুগন্ধিযুক্ত। পাতার গাঢ় সবুজের পটভূমিতে ফুলের দুধসাদা পাপড়ির ঔজ্জ্বল্য আকর্ষণীয়। কিন্তু ফোটার দিনই তা ঝরে পড়ে। পাতার সজীবতা, ফুলের শুভ্রতা, হলুদ পরাগ কেশরের সমাহার মিলে চালতা ফুলের সৌন্দর্য অদ্ভুত।

দোলনচাঁপা

 

চন্দ্রপ্রভা : হলুদ রঙের অসম্ভব সুন্দর এই ফুলটির নাম চন্দ্রপ্রভা ফুল। ঘণ্টা আকৃতির স্বর্ণাভ হলুদ রঙা গন্ধহীন এ ফুলকে কেউ কেউ একে সোনাপাতি নামেও ডাকে। গ্রীষ্ম বা বর্ষায় ডালের আগায় বড় বড় থোকায় দেখা যায় হলুদ রঙের এই ফুল। এটি Bignoniaceae পরিবারে একটি উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tecoma stans। অন্যান্য স্থানীয় নামের মধ্যে Yellow bells, Yellow trumpet, Yellow-Elder উল্লেখযোগ্য। এটি Bignoniaceae পরিবারে একটি উদ্ভিদ। জানা গেছে, চন্দ্রপ্রভা ফুলের গাছ চিরসবুজ। মাথা কিছুটা ছড়ানো। দল ফানেলের আকার, ৩-৪ সে.মি চওড়া। ফল শুকনো, ১২-২০ সে.মি লম্বা, বীজ আকারে ছোট। বীজ ও কলমে চাষ হয়। ডালের আগায় বড় বড় থোকায় হলুদ রঙের ফুল ফোটে। দেখতে অনেকটা হলুদ ঘণ্টার মতো। Tecoma gaudichaudi নামে সোনাপাতি ফুলের আরেকটি প্রজাতি আছে যেটায় সারা বছর ফুল ফুটে।

কলাবতী : বর্ষার এক অনন্য ফুল কলাবতী। এর আরেক নাম সর্বজয়া। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে কিংবা শহরের বিলাসী বাগানে লাল-হলুদ এবং লাল ও হলুদ মেশানো কলাবতী ফুল পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ফুলগুলো Cannaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর ৫৫টি প্রজাতি রয়েছে। এগুলো বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। দেখতে সরু, লম্বায় ৩ থেকে ৫ ফুট, পাতা দুই প্রান্তের দিকে চাপা, মাঝখানে প্রশস্ত। এগুলো একবীজপত্রী উদ্ভিদ। ৩টি বৃন্তযুক্ত এই ফুলে ৫টি পাপড়ি রয়েছে।

বকুল : পাঁচ বৃন্তের এ ফুলে অসংখ্য পাপড়ি থাকে। ফুলটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি গন্ধশ্রাবী। এ গাছটির উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বকুল ফুল শুকিয়ে গেলেও এর সুবাস অনেক দিন থাকে।

গুলানার্গিস : আদি নিবাস ইউরোপে। বর্ষা মওসুমে এটি বেশি চোখে পড়ে। এ ফুলের পাপড়িগুলো ৪ থেকে ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কমলা ও হলুদ রঙের এ ফুলটি শোভাবর্ধনকারী ফুল হিসেবে পরিচিত। সাধারণত গ্রীষ্মের মাঝামাঝি ও বর্ষা মওসুমে গাছে ফুল দেখা যায়।

রঙ্গন : চিরসবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ রঙ্গনের আদি নিবাস সিঙ্গাপুর হলেও আমাদের দেশে শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে এটি অতি জনপ্রিয় নাম। বর্ষা মওসুমে রঙ্গনগাছে থোকা থোকা ফুল ফোটে। আমাদের দেশে সাদা ও লাল আকৃতির রঙ্গন দেখা যায়।

সুখদর্শন : লাল ও সাদা রঙের এ ফুলটি টবে বেশ মানানসই। ফুলগুলো আকারে বড়। টাইগার লিলি নামেও ফুলটি পরিচিত। সুখদর্শন গাছের পাতাগুলো বেশ চওড়া হয়ে থাকে। গুচ্ছবদ্ধভাবে ফুল ফোটে। এ ফুলটি টবে লাগালে দেখতে চমৎকার হয়।

বকুল

 

ঘাসফুল : এটি বর্ষাকালের চমৎকার একটি ফুল। এর আরেকটি নাম জেফির লিলি। এর পাতাগুলো চিকন, লম্বা আকৃতির। সাদা, গোলাপি, হলুদ, লাল রঙের ঘাসফুল সমতল ভূমিতে বর্ষাকালে ফোটে। প্রায় সব জায়গায় এ ফুল লাগানো সম্ভব। টবে লাগালে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।

অলকানন্দ : অলকানন্দ ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Allamanda nerifolia। এটি Apocznaceae পরিবারের অন্তর্গত। গুল্মজাতীয় ফুল গাছ। সোনার ঘণ্টার মতো অলকানন্দ ফুলগুলো দেখতে তাই বাংলাদেশ ঘণ্টাফুল বা অ্যালমন্ডা নামেও পরিচিত। বর্ষার শুরুতে ফুলে ফুলে ভরে যায় গাছ। জাতভেদে ফুলের রঙ সোনালি, হলুদ, লাল ও গোলাপি হয়ে থাকে।

কামিনী : গাছটি ঝোপের মতো ৩ থেকে ৫ মিটার লম্বা হয়। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে প্রতি গুচ্ছে অসংখ্য ফুল থাকে। এ ফুলের মধুর মিষ্টি গন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত মউ-মউ করে। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত গাছে ফুল দেখা যায়।

আবহমান কাল ধরেই আমাদের প্রকৃতিকে বর্ষার ফুল স্বতন্ত্র্য সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়ে আসছে উদারতায়। বর্ষা ও তার ফুল যেন বাংলার প্রকৃতির আত্মা; বৃষ্টিস্নাত বর্ষার ফুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি মানুষের মনে রঙ লাগিয়ে আসছে। বর্ষা নামলেই হাত চলে যায় প্রিয়ার খোঁপায় আর চোখ চলে যায় জানালার ফাঁক দিয়ে। তাই তো কবি কণ্ঠে উচ্চারিত হয়- অনন্য কবিতার পঙ্ক্তিমালা- ‘আঁধারে ডুবিছে সবি/কেবল হৃদয়ে হৃদি অনুভবি।’

দেখুন:

আরো সংবাদ