১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচন

ছবিতে বা থেকে অধ্যাপক ড. মো: শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. সামছুল আলম, অধ্যাপক ড. গোলাম কাদের খান ও অধ্যাপক ড. বজলুর রহমান মোল্যা। - ছবি: নয়া দিগন্ত

বিশ্বে এই প্রথম ইলিশ মাছের পূর্ণাঙ্গ জীবন রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞানীরা। সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় ইলিশের জীবন রহস্য প্রস্তুতকরণ, জিনোমিক ডাটাবেজ স্থাপনে গবেষণায় সাফল্য পেয়েছেন বলেও জানান বাকৃবির গবেষকরা।

শনিবার সকালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম ও তার সহযোগি গবেষকরা প্রায় দুই বছর গবেষণা করে এ সাফল্য অর্জন করেন বলে দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম ও ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম কাদের খান উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এককভাবে সর্বাধিক অবদান রাখছে জাতীয় মাছ ইলিশ। একক প্রজাতি হিসাবে বাংলাদেশে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ, মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২%।

অন্যদিকে, পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০% উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এদেশের প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ আহরণের সাথে জড়িত। কাজেই এই জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আহরন নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক নির্দেশক (জি আই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর দেশীয় ইলিশের জীবন রহস্য প্রস্তুত করণ, জিনোমিক ডাটাবেজ স্থাপনে গবেষণায় সাফল্য পেয়েছেন বাকৃবির গবেষকগণ।

ইলিশ জিনোম সিকোয়েন্সিং ও অ্যাসেম্বলি টিমের সমন্বয়ক এবং ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, জিনোম হচ্ছে কোনো জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াসহ সকল জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোম দ্বারা। ইলিশের জিনোমে ৭৬ কোটি ৮০ লাখ নিউক্লিওটাইড রয়েছে যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স জানার মাধ্যমে অসংখ্য অজানা প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে খুব সহজেই। বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের স্টকের সংখ্যা (একটি এলাকায় মাছের বিস্তৃতির পরিসীমা) কতটি এবং দেশের পদ্মা, মেঘনা নদীর মোহনায় প্রজননকারী ইলিশগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্টক কিনা তা জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সর মাধ্যমে। বছরে দুইবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে এই দুই সময়ের ইলিশ জীনগতভাবে পৃথক কিনা তা জানা যাবে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কিনা সেসব তথ্যও জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে।

ইলিশের প্রজনন সম্পর্কে তিনি বলেন, বছরে দুইবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কিনা তা জানা যাবে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কিনা সেসব তথ্যও জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে।

তিনি আরো বলেন, এরকম নতুন নতুন তথ্য উন্মোচনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে ইলিশের টেকসই আহরণ। ইলিশের জন্য দেশের কোথায় কোথায় ও কতটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। দেশীয় ইলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের (ভারত, মায়ানমার, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য) ইলিশ থেকে জীনতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র কিনা তাও নিশ্চত হওয়া যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সংবেদনশীল ও খাপ খাওয়ার জন্য নিয়ামক জিন আবিস্কারের মাধ্যমে ইলিশের বায়োলজির উপর বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিরুপন করাও সহজ হবে।

গবেষকরা জানান, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই ইলিশের পূর্ণাঙ্গ ডি-নোভো জিনোম অ্যাসেম্বলী প্রস্তুত করেন। ওই বছরের ২৫ আগষ্ট ইলিশের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিনোম ডেটাবেজ ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনে’ (এনসিবিআই) জমা দেন। এছাড়াও ইলিশের জিনোম বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল দু’টি আর্ন্তজাতিক কনফারেন্সেও উপস্থাপন করেছেন।

জাতীয় মাছ ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং এর গবেষণা কাজটি গবেষকবৃন্দের নিজস্ব উদ্দ্যোগ, শ্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টর পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার যুগে প্রবেশ করেছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গবেষকরা।

এই প্রচেষ্টার ফলে এ মাছের সংখ্যা ও মজুদের বিস্তৃতি নির্ধারণ করে টেকসই আহরণ ও সংরক্ষণের জন্য লাগসই কর্মসূচী প্রণয়নে আধুনিক এবং বাস্তব প্রযুক্তি প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলো। তবে ইলিশের সার্বিক উন্নয়নে পূর্নাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবন রহস্য উদঘাটনের এই জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে হলে এ বিষয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে। সে জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন গবেষকরা।


আরো সংবাদ