২২ জুন ২০১৮

ময়মনসিংহে টক জিলাপির কদর বাড়ছে

-

ময়মনসিংহবাসির কাছে ইফতারের ব্র্যান্ড আইটেম ‘টক জিলাপি’। প্রত্যেক রোজাদারের কাছে ইফতারের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠে ‘টক জিলাপি’। এবারের ইফতারে টক জিলাপির কদর একটুও কমেনি বরং দিনদিনই চাহিদা বাড়ছে। শহরের জিলাস্কুল মোড়ের ‘টক জিলাপি’ খায়নি এমন মানুষ খুব কমই আছেন।
রোজার মাসে একদিন না একদিন টক জিলাপি ইফতার সামগ্রীর তালিকায় থাকবেই। যতই দিন যাচ্ছে এই টক জিলাপি নগরবাসির পাশাপাশি ভিন্ন এলাকার মানুষের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই জেলার বাইরে থেকে ছুটে আসছেন অনেকেই টক জিলাপির স্বাদ গ্রহণ করতে। প্রথম রোজা থেকে রোজার শেষ ইফতার পর্যন্ত টক জিলাপি বেচাকেনা হয়।
গত ২৭ বছর ধরে মুখরোচক টক জিলাপি তৈরি করেন মো. জাকির হোসেন। তিনি জানান, মাষকলাই ডালের গুঁড়া, চালের গুঁড়া, ময়দা, চিনি ও তেঁতুলের টক দিয়ে তৈরি করা হয় টক জিলাপি। সারা বছর ১২০ টাকা কেজি দরে এই জিলাপি বিক্রি করা হলেও রোজায় এই জিলাপিতে ডাল ও চালের গুঁড়া বেশি দিয়ে তৈরি করা হয় বলে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।
টক জিলাপি তিন রকমের হয়ে থাকে। সাধারণ টক জিলাপি ১২০ টাকা কেজি, স্পেশাল টক জিলাপি ১৪০ টাকা কেজি এবং ঘি দিয়ে ভাজা টক জিলাপি ১৬০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হয়।
প্রতিদিন গড়ে ৬/৭ মণ জিলাপি বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি। টক জিলাপি তৈরির গল্প বলতে গিয়ে জাকির হোসেন আরো জানান, আজ থেকে ২৭ বছর আগে তিনি আর দশটা বিক্রেতার মতোই সাধারণ জিলাপি তৈরি ও বিক্রি করতেন।
একদিন ভারী বর্ষণের কারণে ক্রেতার অভাবে জিলাপি তৈরির কিছু ময়াল (মন্ড) থেকে যায়। তিনি সেই ময়ালের সাথে মাষের ডাল, চালের গুঁড়া ও তেঁতুলের টক মিশিয়ে দেড় কেজি পরিমাণ জিলাপি তৈরি করেন। যা নিজে ও পরিবার নিয়ে খেয়ে স্বাদ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আরো কয়েকদিন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে টক জিলিাপি খান। সবাই টক জিলাপি খেয়ে ভূয়শী প্রশংসা করেন।
এরপর তিনি বাণিজ্যিকভাবে জিলাস্কুল মোড়ে হোটেল মেহেরবানে টক জিলাপি তৈরি ও বিক্রি শুরু করেন। দিনে-দিনে টক জিলাপির স্বাদ ছড়িয়ে পড়ে শহরবাসির মুখে মুখে। এভাবেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে ‘টক জিলাপি’। যা এখন নগরবাসির কাছে ‘ব্র্যা- আইটেম’ হয়ে গেছে।
এদিকে নগরবাসির কাছে টক জিলাপি ছাড়াও হরেকরকম বাহারি মুখরোচক খাবার ইফতারের নিত্যসঙ্গী। যদিও গ্রামাঞ্চলের রোজাদারগণ এখনো চিড়া-মুড়ি আর পিঠা-পুলি, খিচুরি বা ডাল-ভাত দিয়ে ইফতার করেন।
নগরবাসির সামথ্য অনুযায়ি ইফতারের আয়োজনও ভিন্ন রকমের হয়। বুট-মুড়ি, বড়া-বেগুনির সাথে নানা বাহারি নামী-দামী খাবারও থাকে। ইদানিং শহরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার বাসায় ইফতারের ঝামেলা এড়াতে হোটেল-রেস্তেুাঁরায় সপরিবারে ইফতার করেন। অনেকেই আবার একেকদিন একেক ধরণের ইফতারের আয়োজন করেন। টিএজ’রা সবান্ধব ইফতারের আয়োজনে বাসার চেয়ে হোটেল-রেস্তেুাঁরাকেই প্রাধান্য বেশি দেয়।
শহরের হোটেল-রেস্তেুাঁরায় অর্ধশতাধিক আইটেমের ইফতার বেচাকেনা হয়। প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে যাবার পর থেকে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। শহরের সি কে ঘোষ রোড, নতুনবাজার, ওল্ডপুলিশক্লাব রোড, চরপাড়াসহ শহরের অলিগলিতেও চলছে জমজমাট ইফতার বেচাকেনা। ধানসিঁড়ি রেস্তেুাঁরা, সারিন্দা, রোম থ্রি, রিফাত, পাঁচতারা, সরগরম ও পাক-মুসলিম হোটেলসহ নামিদামি হোটেলগুলোতে বাহারি আইটেমের ইফতার বেচাকেনা হয়। নামকরা হোটেলগুলোতে রয়েছে ইফতারির প্যাকেজ। আছে ডিনারসহ ইফতারের প্যাকেজ। মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তরা প্যাকেজ নিয়ে ইফতার ও ডিনার সারছেন।
পেঁয়াজু, বুট, মুড়ি, বেগুনি, বড়া ও আলুর চপ ছাড়াও রয়েছে নানা ধরণের জিলাপি, হালিম, বুরিন্দা, লাচ্ছি, ফালুদা, জুস, শাক ফুলুরি, চিকেন বল, ডিম চপ, জালি কাবাব, শামী কাবাব, সমুচা, চিকেন টোস্ট, ভেজিটেবল রোল ও টোস্ট, স্পেশাল অনথন, চিকেন গ্রিল, চিকেন রোল, চিকেন তান্দুরী, চিকেন ফ্রাই, চিকেন চাপ, কাঠি কাবাব, মেঙ্গু শেক, দই, মাঠা, বোরহানিসহ নানা বাহারি ইফতার সামগ্রী। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব কেন্টিনের ঐতিহ্যবাহি ‘কাটলেট’ ও ব্যাপক জনপ্রিয়।
প্রতিদিন বিকেল থেকেই কাটলেটের জন্য ক্যান্টিনে বেশ ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এখন ‘মধুমাস’ হওয়ায় আম, কাঠাঁল, লিচু ও পেয়ারাসহ মওসুমি নানা রকমের ফল ইফতারের আইটেমে যোগ হয়েছে। প্রতিশ’ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৪০০/৫০০ টাকায়। এজন্য মৌসুমি ফলের কদরও বেড়েছে। ইফতারে হালিমের চাহিদাও রযেছে। ঘরোয়া ইফতারে হালিমের স্বাদ পেতে অনেকেই শহরের সারিন্দা, রুম-থ্রি, ধানসিঁড়িসহ কয়েকটি ইফতারির দোকানে ছুটছেন। হালিম কিনতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
মাটির সানকিতে ১০০ টাকা থেকে ৩০০/৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে হালিম। রোম থ্রি রেস্তেুাঁরার ঘি’য়ে ভাজা প্রতি কেজি জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। ইফতারে খেজুরের চাহিদা এখনো শীর্ষেই রয়েছে। শহরের রেস্তেুাঁরায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও বন্ধু মহলের ইফতার পার্টি চলছে। ইফতারের সময় হলেই শহরজুড়ে এক ধরণের নিরবতা নেমে আসে। ঘরে ঘরে চলে ইফতারের মহোৎসব।


আরো সংবাদ