২৪ জানুয়ারি ২০২০

নারায়ণগঞ্জে ভুয়া পুলিশের দৌরাত্ম্য

দুই সপ্তাহে ৬টি ঘটনায় গ্রেফতার ৮
-

পরনে অবিকল পুলিশের পোশাক। হাতে অস্ত্র আর ওয়াকিটকিও। অনেকের হাতে আবার ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল লাইট । দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এরা আসল না নকল। তবে এরা অনেকে ছিনতাই-ডাকাতিসহ বড় ধরনের অপরাধ ঘটাতে পারদর্শী। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডে, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রূপগঞ্জে পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই-ডাকাতি করতে গিয়ে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ছয়টি ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে আটজন । বিভিন্ন অপরাধ ঘটাতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে আসল পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে অনেক ভুয়া পুলিশ। আবার অনেক ভুয়া পুলিশকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
গত ৪ জানুয়ারি। বেলা ২টা ৪৫ মিনিট। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের নম পার্ক থেকে সামান্য দূরে। এক ভদ্রলোক ড্রাইভারের সাথে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। হঠাৎ চারজন লোক গাড়িটি ঘিরে ধরেন, তাদের কারো হাতে ওয়াকিটকি, কারো পরনে পুলিশের পোশাক। তারা নিজেদের পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে লোকটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে নেন। দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করে গাড়িটি। পথে গাড়ির ভেতরই শুরু হয় তাদের ধস্তাধস্তি। বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে গাড়িটি লিংক রোডের ভুইগড় পৌঁছতেই দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সেই সাথে গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসে ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ চিৎকার। তার চিৎকারে পুলিশ পরিচয়ধারী লোকগুলো তাদের ওয়াকিটকি-পিস্তল ফেলেই পালিয়ে যায়। তবে এ সময় স্থানীয়রা আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশের পোশাক পরিহিত শামীম নামের এক যুবককে। জনতা গণধোলই দেয় ওই যুবককে। ফতুল্লা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জানতে পারে, এরা ভুয়া পুলিশ। পরে থানায় নিয়মিত মামলা হয়। এর এক দিন পরই ৬ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির সময় নারায়ণগঞ্জে বসবাসকারী দুই যুবকসহ তিনজনকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃত দুইজন হলেন, ফতুল্লার জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) ও সিদ্ধিরগঞ্জের রিপন মিয়া (৪৬)। গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে পুলিশ পরিচয়ের ভুয়া আইডি কার্ড উদ্ধার করে ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনায় তিনজনকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। তিনজনের মধ্যে দুইজন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের। আর অন্যজন হলো কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার রায়পুর গ্রামের বারেক মিয়া (৫০)। হাইওয়ে পুলিশ ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মনিরুল ইসলাম জানান, স্থানীয়রা তাদেরকে আটক করে গণপিটুনি দেয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করি। এ সময় তাদের একজনের কাছ থেকে একটি পুলিশের ভুয়া আইডি কার্ড উদ্ধার করি। ওই আইডি কার্ডধারীর ছবিতে অতিরিক্ত আইজিপির র্যাংক ব্যাজ থাকলেও পদবিতে উপপরিদর্শক লেখা রয়েছে। এই চক্রটি দীর্ঘ দিন মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতি করছে।
গত ৮ জানুয়ারি রূপগঞ্জের ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় ফ্যাফকন টেক্সটাইল নামক একটি প্রতিষ্ঠানের দু’জন কর্মকর্তা ও চালক ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার পথে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে একদল ছিনতাইকারী অস্ত্র ঠেকিয়ে ৩৯ লাখ টাকাসহ প্রাইভেট কার ছিনিয়ে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ৭ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জ সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মো: আলমগীর খাঁ নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, সে নিজেকে সেনাবাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর ও ৩০ ডিসেম্বর দুই দফা দুই বোনকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে হত্যার চেষ্টা করে।
গত ৯ জানুয়ারি সোনারগাঁও থেকে ডিবি পরিচয়ে ট্রাকসহ ৩৭টি গরু ছিনতাই করা হয়।
গত ১২ জানুয়ারি র্যাব পরিচয়ে ডাকাতির অভিযোগে ফতুল্লার ভুইঘড় থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক এসআই রাশেদুল আলমকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গতকাল ১৪ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ভুয়া র্যাব সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা। পরে র্যাব-১০ এসে তাদের নিয়ে যায়।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ফতুল্লা থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, একটি সিগেরেট কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজারকে র্যাব পরিচয় দিয়ে তুলে নেয়ার চেষ্টাকালে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয়; পরে তাদের গণপিটুনি দিয়ে র্যাবের কাছে হস্তান্তর করে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান জানান, এখন নারায়ণগঞ্জে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এটা এমন একসময়, যখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর আসল সদস্য আর ভুয়া সদস্য চেনা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আমি মনে করে তাদের পেছনে প্রভাবশালী কারো হাত রয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পবিত্র মান-মর্যাদা রক্ষার জন্য এদের (ভুয়া) বিরুদ্ধে এখনই কঠোর হওয়া উচিত।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানান , ভুয়া পুলিশ, র্যাব কিংবা সেনাবাহিনীর সদস্যÑ যাই হোক না কেন? এদের ধরতে হাইওয়েগুলোতে সাদা পোশাকে পুলিশের একাধিক টিম রয়েছে। এ ছাড়া ঘনবসতি এলাকাগুলোতেও পুলিশ কাজ করছে। তাই এমন কাউকে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কিংবা ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে জানাতে পারবে।


আরো সংবাদ