২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
ফতুল্লা খেলার মাঠ দখল নিয়ে স্থানীয় জনতা-গণপূর্ত বিভাগ মুখোমুখি

সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ : ৭ দিনের আলটিমেটাম : শিক্ষার্থীরা রাস্তায়

ফতুল্লায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ : নয়া দিগন্ত -

সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পের ভবন নির্মাণের জন্য ফতুল্লার পাগলায় আলীগঞ্জ এলাকায় জমি বরাদ্দ দিয়েছে একনেক। সে জমি মূলত আলীগঞ্জ খেলার মাঠ। কয়েক যুগ ধরে এখানে খেলাধুলা করে আসছে এলাকার যুবকেরা। পাশে রয়েছে একটি হাইস্কুল। গণপূর্ত বিভাগ তাদের জমি উদ্ধার করবে। অপর দিকে স্থানীয় লোকজন খেলার মাঠ দখল করতে দেবে নাÑ এ নিয়ে স্থানীয় জনতা এবং গণপূর্ত বিভাগ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কয়েক দফা মাঠ দখল নিতে গেলে ক্ষুব্ধ জনতার তোপের মুখে ফিরে গেছেন গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা। সর্বশেষ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মাঠ দখল ছেড়ে দেয়ার জন্য এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন তারা। এর আগে রাস্তায় কাঠ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে স্থানীয় লোকজন। এ ছাড়া আশপাশ স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে। সকাল থেকেই আলীগঞ্জের আশপাশের কয়েক হাজার লোক মাঠ দখল ঠেকাতে অবস্থান নেয়।
গতকাল রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিজওয়ান আহমেদের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক র্যাব পুলিশ সদস্য নিয়ে উচ্ছেদ করতে গিয়ে বাধার মুখে ফিরে যান। পরে কাজগপত্র যাচাই বাছাই শেষে সাত দিনের সময় দিয়েছেন।
এলাকাবাসী ও বিভিন্ন স্কুল মাদরাসার শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠে প্রবেশমুখে বাধা দেয়। মাঠ রক্ষার দাবিতে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী একনেকের সভায় অনুমোদিত অগ্রাধিকার প্রকল্প অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের আবাসান প্রকল্প নির্মাণ করার জন্য গণপূর্ত বিভাগ ১১ দশমিক ৬৭ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে। কিন্তু এখানে খেলার মাঠের দাবিতে স্থানীয় লোকজন বেশ কিছুদিন ধরে মাঠ ও মাঠের আশপাশ জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এই জায়গা দখলমুক্ত না হওয়ায় ভবন নির্মাণকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো জানান, এই প্রকল্পের আওতায় আড়াই একর জমির ওপর একটি খেলার মাঠসহ প্রায় সাড়ে চার একর ভূমি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এলাকাবাসী এই বিষয়টি অবগত ছিলেন না। বিষয়টি তাদেরকে অবগত করে এই জায়গার দখল ছেড়ে দিতে এক সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিজওয়ান আহম্মেদ জানান, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল কয়েকটি সংস্থা থেকে লিজ এনে সরকারি আবাসন প্রকল্পের বেশ কিছু জায়গা দখল করে রেখেছে। তাদেরকে সাত দিনের সময় দেয়া হয়েছে। সবার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে পরে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি কাউছার আহম্মেদ পলাশ জানান, জেলা পরিষদ থেকে লিজকৃত জায়গাটি কয়েক যুগ ধরে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই মাঠকে শেখ রাসেলের নামে মিনি স্টেডিয়াম হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি। এই মাঠ না থাকলে স্থানীয় যুবসমাজ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়রা জানান, একনেকে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসানের জন্য বরাদ্দ দেয়ার পর তা নিয়ে আদালতে মামলা হয়। মামলায় আলীগঞ্জ খেলার মাঠ দখলের ওপর ৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। ১৬ এপ্রিল উচ্চ আদালতের বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক এ রায় দেন। এর আগে আলীগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠ দখল বন্ধের আদেশ চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। স্কুলটির পক্ষে এই পিটিশন দাখিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো: মোতালেব ভূঁইয়া।
তিনি জানান, আলগীগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী নিখিল চন্দ্র সরকার বাদি হয়ে উচ্চ আদালতে ওই রিট পিটিশন করেন। শুনানি শেষে মহামান্য আদালত ১৬ এপ্রিল এ সংক্রান্ত রায় প্রদান করেন। রায়ে মাঠে সব ধরনের দখলীয় কর্মকাণ্ডের ওপর ৬ মাসের স্থগিতাদেশ প্রদান করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল থেকে আগামী ৬ মাস মাঠ দখল সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আদালত অবমাননা হবে।
অ্যাডভোকেট মোতালেব ভূঁইয়া জানান, মহামান্য আদালত গণপূর্ত বিভাগের সচিব, গণপূর্ত বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, জেলা পুলিশ সুপার এবং ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশকে এ রায় সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আলীগঞ্জ ক্লাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, যেখানে উচ্চ আদালতের আদেশ আছে আইন অনুযায়ী মাঠের মধ্যে অন্য কিছু হতে পারবে না। পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত কোনো খেলার মাঠ নেই। পুরো এলাকায় প্রায় ২০-২৫ লাখ মানুষের বসবাস। সুস্থ ও সুন্দর মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান আলম জানান, আলীগঞ্জ খেলার মাঠ রক্ষার জন্য এলাকার ২৫ হাজার লোক গণস্বাক্ষর দিয়েছে। সেই স্মারকলিপিটি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, এ স্মারকলিপিটি পাঠানোর দুই মাস পর মাঠটিকে অন্তর্ভুক্ত করে পিডব্লিউডি একটি প্রজেক্ট পাস করিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি প্রজেক্টে এ মাঠের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারটি জানতেন তাহলে আমরা বিশ্বাস করি তিনি এই মাঠকে বাদ দিয়েই বাকি কাজগুলো করার নির্দেশ দিতেন।


আরো সংবাদ