১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রাবি নবাব লতিফ হলের জৌলুস আর নেই

ঝুঁকি নিয়ে বসবাস শিক্ষার্থীদের
-

নবাব আব্দুল লতিফ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী একটি আবাসিক হল। ১৯৬৫ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এ হলে থাকার চাহিদা ছিল সবার শীর্ষে। কিন্তু এই হলের নবাবী জৌলুস এখন আর নেই। এখন একেবারে জনাজীর্ণ অবস্থা। মনে হয় কয়েক শ’ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত একটি ভবন। ২৬ বছর আগেই বিশেষজ্ঞরা হলের ছাদের সংস্কারের প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান তেমন কোনো সংস্কার না করায় ৩২৫ শিক্ষার্থীর এ আবাসিক হলে দীর্ঘ দিন থেকে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেছেন শিক্ষার্থীরা।
রুমপ্রতি দুই সিটের এ আবাসিক হলে নিয়মিতই ভবনের ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। এতে বিভিন্ন সময়ে আহত হয়েছেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। ছাদ থেকে খসে পড়া পলেস্তারার টুকরার আঘাতে মাথা ফেটে গুরুতর আহত হয়ে পাঁচটি সেলাই দেয়া হয় এক ডাইনিংয়ের কর্মচারীর। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
ঐতিহ্যবাহী এই হলের তৃতীয়তলার ছাদের অবস্থা ভয়াবহ। অন্যান্য তলার অবস্থাও প্রায় একই রকম। মাঝে মধ্যে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি উঠে হলকে ব্লক করে দেয়ার কিংবা হলের তৃতীয়তলার ছাদ ভেঙে পুরোটাই সংস্কারে। এ দিকে হলের সিঁড়িগুলোর অধিকাংশতেই ফাটল ধরেছে। হলের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আশঙ্কা করছেন যেকোনো মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের অনাকাক্সিত ঘটনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক এই হলের। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ হলের মধ্যে শেরেবাংলা, সৈয়দ আমির আলী, শাহ মখদুম হলও রয়েছে। সম্প্রতি হলের সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি হল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯২ সালে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে আগুনে পুড়ে যায় গোটা হল। তখনই হলটি ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বুয়েট থেকে বিশেষজ্ঞদের আনা হলে তারা হলের শক্তি পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, হলের একশত ভাগের মধ্যে মাত্র ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ শক্তি অক্ষত ছিল। এর মধ্যে ৩৬২, ৩৬৪ নম্বর রুমের শক্তিক্ষমতা মাত্র ১৫ পারসেন্টের কম থাকায় বিপদের আশঙ্কা করে রুম দু’টি পুরোপুরি ব্লক করে দেয়া হয়।
বড় ধরনের বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে ১৯৯৪ সাল থেকে হল প্রশাসন সংস্কার আবেদন জানালেও এখন পর্যন্ত নজর দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, হলের ছাদের পলেস্তারা ভেঙে পড়ে। মাঝে মধ্যে কোনো কোনো রুমের ফাটা ছাদ দিয়ে পানিও পড়ে। অধিকাংশ সিঁড়িতে ফাটল ধরেছে। এতে বড় ঝুঁকির মুখে থাকি আমরা। অন্যান্য সমস্যা তো আছেই। যেহেতু পুরো হলেই ড্যাম তাই হয় হলকে ব্লক করে দেয়া হোক অথবা হলের তৃতীয় তলার ছাদ ভেঙে পুরোটাই সংস্কার করার ব্যবস্থা করা হোক।
আহত হলের ডাইনিংয়ের কর্মচারী আব্দুল খালেক বলেন, বিভিন্ন সময়ে হলের সংস্কারের কথা জানালেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। কিন্তু ছাদের পলেস্তারা পড়ে আমার মাথা ফেটে পাঁচটি সেলাই দেয়া হলেও চিকিৎসার জন্য মাত্র ৫০০ টাকা দেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তৌহিদ মোর্শেদ বলেন, হলের সংস্কার দাবিতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১৮ দফা দাবি নিয়ে প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছি। আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
হল প্রশাসনের দাবি, ১৯৯৪ সাল থেকে সংস্কারের দাবি করা সত্ত্বেও কোনো সংস্কার হচ্ছে না। তাই কারো জীবনের ক্ষতি বা বড় বিপদের ঘটনা হলে হল প্রশাসন দায় নেবে না। এ দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সিরাজুম মুনির জানান, হলের সংস্কারের জন্য চার থেকে পাঁচবার বাজেট চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাজেট না এলে এ ব্যাপারে আমাদের করার কিছুই থাকে না। আমাদের নিজ উদ্যোগে কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই। তবে এ বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।
হলের সাবেক ও বর্তমান (ভারপ্রাপ্ত) প্রভোস্ট ড. বিপুল কুমার বিশ্বাসকে পরপর দুই দিন ফোনে এবং সরাসরি অফিসে গিয়ে যোগাযোগ এবং এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কথা বলতে রাজি হননি তিনি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রোভিসি-২ প্রফেসর ড. চৌধুরী মো: জাকারিয়া বলেন, আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি। শিক্ষার্থীরা যাতে আতঙ্ক ছাড়াই হলে থাকতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে দ্রুতই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 


আরো সংবাদ