০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

লন্ডন রুটে বিমানের কার্গোতে মাসে লোকসান দেড় কোটি টাকা

লন্ডন রুটে বিমানের কার্গোতে মাসে লোকসান দেড় কোটি টাকা - ফাইল ছবি

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন রুটে কার্গো ব্যবসায় প্রতি মাসে লোকসান গুণতে হচ্ছে দেড় কোটি টাকারও বেশি। গত এক যুগ ধরে বিমানের অন্যতম লাভজনক এই রুটে কার্গো সেক্টরের একচেটিয়া ব্যবসা করে বিমানের আয়ের খাতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করলেও তা হঠাত করে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় এই ব্যবসাটি এখন চলে যাচ্ছে বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে।

অভিযোগ উঠেছে, বিমানের নতুন ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খাঁনের কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে হাতছাড়া হতে চলেছে, বিপুল সম্ভাবনাময় এই কার্গো সেক্টর।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যেখানে বিমানের কার্গো থেকে আয় ছিলো বাংলাদেশী মুদ্রায় যথাক্রমে ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা, ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ও ৪ কোটি ৩২ লাখ। সেখানে এ বছর ২০১৯ সালের একই সময়ে তা নেমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ কোটি ৮২ লাখ, ৩ কোটি ৯ লাখ ও ৩ কোটি টাকায়। গড়ে যা প্রতি মাসে কার্গো সেলস কমে গেছে এসেছে দেড় কোটি টাকায়। বছর হিসেবে যা প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

লন্ডনে কার্গো ব্যবসায় সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন কান্ট্রি ম্যানেজার লন্ডনে আসার পর থেকেই প্রতি মাসেই এভাবেই লোকসান গুনছে বিমানের লন্ডন রুটের কার্গো শাখা। অথচ বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কার্গো সেক্টরে বিমান লাভজনক অবস্থায় ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের ঢাকা অফিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানের কার্গো শাখায় লাভজনক এ রুটে হঠাৎ লোকসানে কর্তৃপক্ষ বিব্রত। এজন্য কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানের কাছে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। হারুন লোকসানের বিষয়টি স্বীকার করলেও কারণ জানাতে পারেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন কান্ট্রি ম্যানেজার বিমানের লন্ডন অফিসে হিসেবে নিয়োগ লাভের পূর্বে মালয়েশিয়ায় বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার ছিলেন। গত বছর জৈষ্ঠ্যতা লংঘন করে তাকে পোস্টিং দেয়া হয় লন্ডন অফিসে। তিনি লন্ডন অফিসে এসেই বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ণ নিয়ম চালু করেন। বিমানের ইতিহাসে যেখানে কমপক্ষে তিন মাস পর কার্গো মূল্য পরিবর্তনের নিয়ম রয়েছে সেখানে হারুণ খান নিজ ক্ষমতাবলে এক মাসেই তিনবার কার্গো মূল্য পরিবর্তন করেন। যা বৃটেনের কার্গো মার্কটের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এছাড়া বাংলাদেশী মালিকানাধীন কার্গো প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের নিয়মিত বরাদ্দকৃত কার্গো স্পেস কমিয়ে আনারও অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে লন্ডন থেকে কার্গো অনেক খালি যাবার অভিযোগও ওঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লন্ডনে থাকা কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খাঁন এ বিষয়ে বাংলাদেশে বিমানের পিআরও এর সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। মোবাইল ভাইবারে তিনি বলন, ‘এ বিষয়ে আমার কোন কিছু বলার নেই। অফিসিয়েলি আপনি তথ্য চাইলে ফাইল বের করে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে হয়তো জবাব দেবেন’।

২০০৯ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন স্টেশনের জন্য কার্গো জিএসএ নিয়োগ করে। কিন্তু জিএসএ নিয়োগ করলেও কার্গো ব্যবসা প্রসারে এই জিএসএ এককভাবে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। কমিউনিটির কার্গো ব্যবসায়ীরা নিজস্ব প্রচেষ্টায়, মিডিয়াতে প্রচার ও প্রসার করে কার্গো ব্যবসাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। প্রায়ই ১০টি কার্গো প্রতিষ্ঠান সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল।

২০১১ সালে বিমান বহরে বোয়িং ট্রিপল সেভেন যুক্ত হলে, লন্ডন রুটে কার্গো ব্যবসা দ্বিগুন হয়ে যায়। ২০১৩ সালে লন্ডন রুটে ৪টি ফ্লাইট চালু হলে, কার্গো স্পেস বৃদ্ধি পায় এবং কার্গো ব্যবসা ইউকেসহ ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। কিন্তু গত বছর ২০১৮ সালে হঠাৎ করে বিমান কর্তৃপক্ষ জিএসএ বাতিল করে। জিএসএ নিজস্ব দায়িত্বে নেয়ার ফলে এটি আমলাতন্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও ম্যানেজারদের ক্ষমতার অপব্যবহার।

প্রবাসীরা জানান, ব্রিটেনে দশ লক্ষাধিক ব্রিটিশ বাংলাদেশীর বসবাস। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীকে কেন্দ্র করে বিলেতের প্রায় প্রত্যেকটি শহরে গড়ে উঠেছে ছোট বড়ো অনেকগুলো কার্গো, ট্রাভেল এজেন্সী ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান। ব্রিটেন এবং ইউরোপ মিলে রয়েছে কয়েক শতাধিক কার্গো ব্যবসা। এসকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে বিমানের কার্গো সেক্টরকে গড়ে তুলেছেন, লাভের মুখ দেখিয়েছে বিমানকে। প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে বিলেত থেকে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠাচ্ছেন। দেশে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত ব্যাগেজ সহজেই পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বেড়েছে এর চাহিদা।

ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট বশির আহমেদ বলেন, বিমান ব্রিটেনের মূলধারার জিএসএ দ্বারা এতোদিন পরিচালিত হওয়ায়, অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা হয়নি। বর্তমানে বিমান কর্তৃপক্ষ জিএসএ পরিবর্তন করায় এই সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিমান বাংলাদেশের কতিপয় কর্মকর্তাদের গাফলতি ও দূরদর্শিতার অভাবে বিমানের তৈরী করা এই ব্যবসা অন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সের দিকে চলে যাচ্ছে। একই মন্তব্য করেন বৃটেনে বিমান বাংলাদেশ অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সীগুলোর সংগঠন বাটা‘র প্রেসিডেন্ট হেলাল খান।


আরো সংবাদ

সকল




Paykwik Paykasa
Paykwik