২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরছে না : ট্রাফিক পুলিশ ব্যস্ত মোটরসাইকেল নিয়ে

-

পুলিশের একমাত্র টার্গেটই যেন মোটরসাইকেল। চেকপোস্টগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে থামিয়ে রাখা হচ্ছে দুই চাকার এই গাড়িটি। অথচ এর পাশ দিয়ে পুলিশের চোখের সামনে ট্রাফিক আইন অমান্য করে শাঁই শাঁই করে চলে যাচ্ছে বড় গাড়িগুলো। রাজধানীতে দিনের বেলায় ঢোকার অনুমতি নেই, এমন গাড়িও দিনের বেলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজসড়ক। লক্কড়ঝক্কড় রঙচটা গাড়িগুলো ঠিকই রাজধানীতে চলছে। এখানে সেখানে পার্কিং করা হচ্ছে দামি গাড়িগুলো। এসবের দিকে নজর নেই ট্রাফিক পুলিশের।

গতকাল বেলা ২টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৫-৬টি বাস। একটি ছেড়ে যাচ্ছে; আরেকটি আসছে। যে বাসটি আসছে সেটিই রাখা হচ্ছে এলোপাতাড়ি। বাসের পেছনটি পুরো রাস্তা আটকে রাখছে। পাশে দাঁড়িয়েই দায়িত্ব পালন করছে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিক কনস্টেবলরা দু-একবার তাদের মুখের বাঁশি ফুঁ দিয়ে চালককে ইশারা করছেন সরে যেতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। এলোপাতাড়ি বাস রাখার কারণে এখানে মুহূর্তে মুহূর্তে যানবাহন আটকে যাচ্ছে। বেলা আড়াইটায় মৈত্রী পরিবহনের একটি বাস জনতা ব্যাংকের সামনে দিয়ে শাঁই শাঁই করে মতিঝিলের দিকে যাচ্ছিল। জনতা ব্যাংকের সামনে ক্রসিং পার হওয়ার সময় তার সামনে কিছু আছে কি না দেখারও প্রয়োজন মনে করলেন না চালক। ব্যস্ত এ ক্রসিংয়ে দিনভর ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ওই সময় কাউকে দেখা যায়নি। ফলে যে যার মতো ইচ্ছে গাড়ি চালাচ্ছে। বেলা ৩টায় পল্টন মোড়ের উত্তর-পশ্চিম পাশে দেখা যায় বাসগুলোর যত্রতত্র যাত্রী তোলা হচ্ছে। পুলিশের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। এভাবে রাস্তার ওপর যাত্রী তোলার কারণে ওই ক্রসিংয়ে যানজট লেগে যায়।

হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো নিষেধ হলেও রাজধানীর যেখানে সেখানে এই হর্ন কানে আসে। এমনকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালসহ বেশ কিছু স্থানে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ থাকলেও বেশির ভাগ চালকই তা মানছেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে এখনো অসংখ্য গাড়ি চলছে যার লাইসেন্স নেই, ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই। আবার কোনো কোনো গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চালকের লাইসেন্স নেই, অথবা ভুয়া লাইসেন্সে গাড়ি চালাচ্ছে, রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্য করছে, অবৈধ পার্কিং করছে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ-এ এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও সেদিকে যথাযথ নজর নেই ট্রাফিক পুলিশের। কিন্তু একটি মোটরসাইকেল দেখলেই চেকপোস্টে দায়িত্বরত প্রায় সব সদস্যই যেন এগিয়ে গিয় সেটি থামানোর চেষ্টা করেন। আব্দুল্লাহ নামে এক মোটরসাইকেল চালক গতকাল বলেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল আসার পথে অন্তত ১০টি স্থানে পুলিশ তার মোটরসাইকেল থামায়। এর তো কোনো মানে হয় না। এতবার কেন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র তল্লাশি করতে হবে। আব্দুল্লাহ বলেন, এ সময় তিনি বেপরোয়া গতির যানবাহন চলে যেতে দেখেছেন পাশ দিয়ে। পুলিশের সেদিকে কোনো নজর নেই। পুলিশ তার মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে রঙচটা, সেই লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোই রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মতিঝিলের আরামবাগ থেকে মোহাম্মদপুরগামী বেশ কয়েকটি পরিবহন গতকাল আরামবাগ টিঅ্যান্ডটি কলোনির পাশে পার্কিং করা দেখা যায় দুপুরের দিকে। তার মধ্যে একটি গাড়ির বাইরের আস্তর ঠিক নেই।

কমলাপুর থেকে শুরু করে মতিঝিলের বিভিন্ন স্থানে দিনের বেলায় পার্কিং করে রাখা হয় দূরপাল্লার বেশ কিছু বাস। বিশেষ করে কমলাপুর বিআরটিসি বাসডিপোর সামনে থেকে আরামবাগ পুলিশ বক্স পর্যন্ত রাস্তায় ৪-৫টি কোম্পানির বাস গতকাল পার্কিং করা দেখা গেছে। এই বাসগুলো কুমিল্লা, হোমনাসহ বেশ কিছু রুটে চলাচল করে। দিনের বেলায় এই বাসগুলোর রাজধানীতে প্রবেশেরই কথা নয়। অথচ রাজধানীর ভেতরে ব্যস্ততম সড়কে টার্মিনাল পেতে বসেছে কোম্পানিগুলো।

রাজধানীর টিকাটুলী মোড় থেকে মানিকনগর পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে। এসব গাড়ির বেশির ভাগেরই কোনো হেডলাইট বা ব্যাকলাইট নেই। গতিও বেপরোয়া। রাতের বেলায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এগুলো দুর্ঘটনা ঘটায়। অথচ এসব গাড়ির বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বলেছেন, এভাবে পক্ষ করে রাস্তায় শৃঙ্খলা আনা যায় না। এতে চাঁদাবাজির রেট বাড়ে- এই যা। তিনি বলেন, রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। রাস্তায় গাড়ি চলবে, আর ফুটপাথ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। তিনি বলেন, এখনো ফিটনেসবিহীন ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এ দিকে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতেই পুলিশ কাজ করছে। প্রতিদিনই আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। গত ১৬ জানুয়ারি দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬৭২২টি মামলা ও ৩১,০২,১০০ টাকা জরিমানা আদায় করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়াও অভিযানকালে ৪০টি গাড়ি ডাম্পিং ও ৮৪৯টি গাড়ি রেকার করা হয়।

উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কারণে ১১৩২টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা, হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করার দায়ে ১৩৯টি, হুটার ও বিকনলাইট ব্যবহার করার জন্য ৭টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা, মাইক্রোবাসে কালো গ্লাস ব্যবহারের অভিযোগে ১৭টি মামলা, ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে ২৭০৪টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা ও ১৩৪টি মোটরসাইকেল আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অপরাধে চালকের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রতিদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় যে মামলা হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেক মামলাই মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। বলা বাহুল্য, মোটরসাইকেল হচ্ছে সবচেয়ে ভালনারেবল বাহন। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া একজন মোটরসাইকেল চালক সব সময় নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য সতর্ক থাকেন। অন্য কোনো বাহন বা কোন কিছুকে আঘাত করা তার নিজের জীবনের জন্যই ক্ষতিকর। তাই পারতপক্ষে কোনো মোটরসাইকেল চালক দুর্ঘটনা ঘটান না। বরং আমাদের জানা মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়। তারপরও কেন মোটরসাইকেলের প্রতি এরূপ বিমাতাসুলভ আচরণ পুলিশের।

গত ১৫ জানুয়ারি থেকে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme