২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা যে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে’

‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা যে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে’ - সংগৃহীত

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের যে অংশটি মধুরছড়া এলাকায় কোন ধরনের সহায়তা ছাড়াই রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। মিয়ানমারের বুতিদং এলাকায় একসময় স্কুল শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন। এর পর থেকেই কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আছেন। 

তিনটি শিফটে ৯০ জন শিক্ষার্থী। নিজের খুপরি ঘরেই স্কুল। কোন সাইনবোর্ড নেই। তবুও নাম দিয়েছেন হোলি চাইল্ড আইডিয়াল প্রাইভেট সেন্টার। সেখানে পড়তে এসেছেন আসমা আক্তার। তার ইচ্ছে একদিন ক্যাম্পে বিদেশিদের জন্য দোভাষীর কাজ করবেন।

তিনি বলছেন, আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। এখানে আবার পড়া শুরু করেছি। এখানে আমি ইংরেজি পড়ছি। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ...বাইরে থেকে যখন ভিজিটর আসে, বড়লোকরা আসে, ওরা তো আমাদের রোহিঙ্গা ভাষা বুঝে না। এজন্যে আমি যদি ইংরেজি শিখি, ওদের সাথে কথা-বার্তা বলতে পারবো। কারো কারো কথা অনুবাদও করতে পারবো।

খুব লাজুক এই মেয়েটি শুরুতে কথাই বলছিল না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কঠিন জীবন। তবুও নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা তার থেমে যায়নি।তার সহপাঠী কবির আহমেদ শিক্ষক হতে চান। তিনি বলছেন, আমি এখানে আসছি লেখাপড়া করবো বলে। নিজে লেখাপড়া করে আমার মতো আরেক ভাইকে লেখাপড়া শেখাবো।

এই ছেলে মেয়ে দুজনের স্বপ্নকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছেন তাদের শিক্ষক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তিনি বলছেন, আমি যখন প্রথম আসি তখন দেখি আমার মতো এখানে অনেক পরিবার আছে। কিন্তু এখানে কোন স্কুল নেই। আমি এখানকার জন্য কি করতে পারি তা চিন্তা করছিলাম। এভাবেই আমি অগ্রসর হই। আমার মনে হয়েছে যে যদি আমরা এই অবস্থাতেই থাকি, আমাদের ছেলে মেয়েরা দিন-দিন বড় হয়ে যাচ্ছে। ওদের কোন লেখাপড়া না থাকলে ওদের জীবন দিন-দিন ধ্বংসের পথে চলে যাবে।

কক্সবাজারে সরকারি হিসেবে যে ৩০টি রোহিঙ্গা শিবির রয়েছে। সেখানে নতুন ও পুরোনো শরণার্থী শিশুর সংখ্যা সব মিলিয়ে সাড়ে ৫ লাখের মতো। প্রতিদিন আরো জন্ম নিচ্ছে ৬০ টি করে শিশু। কিন্তু এই শিশুদের জন্য সেই অর্থে কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা নেই। তবে এখানে রোহিঙ্গারা নিজেরা বেশ কিছু আরবি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

মধুরছড়ায় বাঁশ দিয়ে বানানো একটি ঘরে একজন মৌলভী আরবি পড়াচ্ছিলেন। তিনি নিজেই এখানে এসেছেন গত বছর। সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে প্রাণে বাঁচতে। তিনি বলছিলেন, দ্বীন ইসলাম রক্ষা করিবার জন্য এটা বানিয়েছে।

কুতুপালং ক্যাম্পে কিছুদূর পর পর চোখে পড়ে চিহ্নিত শিশু বান্ধব এলাকা ও লার্নিং সেন্টার নামে কিছু ব্যবস্থা। যেখানে শিশুদের খেলাধুলা, বার্মিজ ও ইংরেজি বর্ণমালা ও প্রাথমিক সংখ্যা জ্ঞান শেখানো হয়।

বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ভাগাভাগি করে এগুলো পরিচালনা করে। কিন্তু অভিভাবকেরা আরো বেশি কিছু চান। যেমনটা বলছেন সফুরা বেগম।তিনি বলছেন, আমাদের স্কুলও নেই। ফলে আমাদের যে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা আছে, তারা পড়াশোনা করতে পারছে না। আমাদের যদি বার্মায় ফেরত যেতে হয়, আমাদের ছেলে-মেয়েদেরতো পড়াশোনা লাগবে। এজন্যে আমাদের তো বার্মিজ পড়ার জন্য, ইংরেজি পড়ার জন্য এখানে শিক্ষকও নেই, স্কুলও নেই। এটা আমাদের জন্য খুব জরুরি। ছেলে-মেয়েরা যে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে।

এখানে বার্মিজ শেখানো ব্যাপারে বেশ মত পাওয়া গেলো। সফুরা বেগম আরো বলছেন, আমরা যদি আবার বার্মায় ফিরে যাই, ওখানে আমাদের কাজ করতে গেলে বার্মিজ এবং ইংলিশ, দুটিই জানতে হবে। এজন্যে আমাদের অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করানোর জন্য শিক্ষক দরকার।

কক্সবাজারে আগে আসা রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ স্থানীয় স্কুলে পরেন। ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিজেদের তৈরি কয়েকটি স্কুল রয়েছে। কিন্তু ক্যাম্পগুলোতে সাহায্য সংস্থাগুলোকে স্কুল প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়নি সরকার।

কক্সবাজারে সেভ দা চিলড্রেনের কর্মকর্তা ড্যাফনি কুক বলছেন, এটা খুবই উদ্বেগের যে একটি প্রজন্ম শিক্ষা ছাড়া বেড়ে উঠছে। তিনি বলছেন, বাংলাদেশের সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় অসাধারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের জন্য শিক্ষা। তাদের জন্য ক্যাম্পে অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে যেখানে একদম প্রাথমিক পর্যায়ের ইংরেজি, বার্মিজ বা সংখ্যা শিখতে পারছে শিশুরা। কিন্তু তা কিছুতেই যথেষ্ট নয়।

উদ্বেগ প্রকাশ করে মিজ কুক জানান, কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া এখানে রোহিঙ্গা শিশুরা বেড়ে উঠছে হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম হিসেবে।তিনি আরো বলছেন, আমি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংগে কথা বলে যতদূর বুঝেছি তারা এমন একটা ব্যবস্থা চায় যা তাদের সামনে এগুতে সাহায্য করবে। এখন কয়েকটি শিফটে বিভিন্ন বয়সী শিশুদের একই জিনিস শেখানো হচ্ছে।

কিন্তু বাচ্চারা যা চায় তা হল এমন একটা ব্যবস্থা যাতে একটা গ্রেড শেষ করে তারা যেন আর একটা গ্রেডে উঠতে পারে, যাতে তারা একটা সার্টিফিকেটের মতো কিছু পায়, বলছেন মিজ কুক। তিনি জানান, আমরা আনুষ্ঠানিক কিছু চাই। যা শিশুরা ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে পারবে। আমরা দেখছি শিশুরা, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা বিষয়টা নিয়ে হতাশ। আমরা চাই এর একটা পরিবর্তন হোক।

এসব শিশুদের জন্য সামান্য হলেও আশার আলো ছড়াচ্ছেন মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তার খুপরি ঘরে সারাদিন শোনা যায় সামনে এগুতে চায় এমন রোহিঙ্গা শিশুদের জোরালো কণ্ঠ।

 


আরো সংবাদ