১৫ নভেম্বর ২০১৮

ঈদে ঘরমুখো মানুষের পদে পদে ভোগান্তি

ঈদে ঘরমুখো মানুষের পদে পদে ভোগান্তি - ছবি : সংগৃহীত

ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘœ করতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে থাকলেও ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না যাত্রীদের। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে পথে পথে তীব্র ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। ঢাকায় যানবাহন সঙ্কট, মহাসড়কে ভয়াবহ যানজট, পদ্মায় ফেরি সঙ্কট, সময়মতো বাস না ছাড়া, সব ধরনের পরিবহনে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়সহ নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ৩৩টি পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। বিশেষ করে গত রোববার বিকেল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করলে মহাসড়কগুলোতে শুরু হয় যানজট। গতকাল সকাল থেকে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আর যানজটে আটকে পড়ার কারণে বাসগুলো সঠিক সময়ে ঢাকায় ফিরে পরবর্তী ট্রিপ নিতে পারছে না। এতে যাত্রীরা পড়ছেন আরো বিপাকে। প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বাস পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। 

জানা গেছে, যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘব করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালায় ও অধিদফতর থেকে ৩৩টি পদক্ষেপ হাতে নেয়া হয়েছিল। এসবের মধ্যে রয়েছে সড়ক মেরামত, টার্মিনালগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্ঘটনার পর সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক থেকে অবৈধ বাজার অপসারণ, বিকল্প সড়ক ব্যবহার কিংবা মহাসড়কের অপব্যবহার বন্ধ করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, মহসড়কে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ, নসিমন-করিমন, ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার বন্ধ করা, টোল প্লাজার সব বুথ খোলা রাখা, সিএনজি স্টেশন চালু রাখা, যাত্রীদের জন্য বিআরটিসির স্পেশাল সার্ভিস চালু করা, নৌরুটে ফেরি সংখ্যা বৃদ্ধি করা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাস, ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান বন্ধ রাখা, ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন দিনে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ দেয়া ও খোলা রাখা, বড় ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবেলায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করা, অনভিজ্ঞ চালক দিয়ে মহাসড়কে মোটরযান না চালানো, টয়লেটগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখা, সড়কের পাশে পশুর হাট ইজারা না দেয়া, কোরবানির পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, কোরবানি পশুর বর্জ্য সড়কের পাশে না ফেলা, ট্রাকে যাত্রী পরিবহন না করা এবং কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম চালু করা। এ ছাড়াও ঈদুল আজহার দিন ও তার আগে-পরে দেশজুড়ে দুই সপ্তাহের নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে র্যাব। দেশজুড়ে এ বাহিনীর ২৪৫টি পেট্রোল টিম কাজ করবে এবং ৫৬টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। রাস্তার প্রতি মুহূর্তের আপডেট দেয়া হবে র্যাবের ফেসবুকে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা থেকেই শুরু হয়েছে যাত্রী হয়রানি। সিটি সার্ভিস বাসের সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীদের বাসা থেকে বের হয়ে বাস, লঞ্চ, ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সুযোগে সিএনজি অটোরিকশাগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েক গুণ বেশি টাকা। কম যাচ্ছে না অ্যাপস-ভিত্তিক রাইড উবার এবং পাঠাও। তারাও অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। 

এ দিকে রোববার রাত থেকেই মহাসড়কে শুরু হয়েছে ভোগান্তি। হানিফ পরিবহনের উত্তরবঙ্গগামী বাসের চালক মো: আলী হোসেন গতকাল ভোরে টাঙ্গাইল থেকে নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে ফোনে জানান, রোববার রাতে গাবতলী থেকে বাস নিয়ে তিনি রংপুরের দিকে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু মাঝ রাত থেকেই টাঙ্গাইলে বসে আছেন। তিন থেকে চার ঘণ্টা পর হলেও গাড়ির চাকা সামনে এগোচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ সময় গাড়ি জ্যামে পড়ে থাকায় যাত্রীদের নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, কত যে যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তার হিসাব নেই। 

আমাদের শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা শহিদুল ইসলাম জানান, গতকালও ছিল পাটুরিয়া ফেরিঘাটে তীব্র যানজট। পারের অপেক্ষায় রয়েছে শত শত যানবাহন। ২-৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফেরির দেখা মিলছে না। অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন গাড়ির হাজার হাজার যাত্রী। এর মধ্যেই কিছু কিছু যানবাহন পুলিশ ও ঘাট কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে আগেভাগে ফেরি পার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

জানা গেছে, ঈদসহ বিশেষ দিনগুলোতে গাড়ির চাপ বেশি থাকায় পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানজট হয়ে থাকে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। অন্যান্য মহাসড়কের পাশে বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্ট থাকায় সেখানে বাসগুলো যাত্রাবিরতি করে এবং ফ্রেশ হন যাত্রীরা। কিন্তু উত্তর-দক্ষিণ বঙ্গগামী যাত্রীদের এই সুবিধা নেই বললেই চলে। যার কারণে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে পড়া যাত্রী ও পরিবহন কর্মীরা অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। এর মধ্যে কেউ কেউ রাস্তার ধারে ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে সাময়িক কাজ সারলেও বিশেষ করে মহিলা যাত্রীদের এ ক্ষেত্রে নাভিশ্বাস হয়ে ওঠে। তবে এ বছর যাত্রীদের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু অস্থায়ী টয়লেট। মানিকগঞ্জ প্রশাসনের উদ্যোগে সড়কের দুই ধারে নির্মিত হয়েছে প্রায় ২০টি টয়লেট। ঘাট এলাকার বাইরে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ীভাবে টয়লেটগুলো নির্মাণ করায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন যাত্রীরা। তবে টয়লেটগুলোর মান ততটা ভালো না হওয়ায় অনেক যাত্রীই তা ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানা গেছে। 

মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, শিমুলিয়া ফেরিঘাটে রয়েছে যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ। সকালে কিছুটা কম হলেও বেলা বাড়ার সাথে এই এলাকায় পারাপারের গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে। যেসব যাত্রী লঞ্চ ও সিবোট দিয়ে নদী পার হচ্ছেন তাদের ভোগান্তি কিছুটা কম হলেও দুর্ভোগে পড়ছে ফেরি পারের অপেক্ষায় থাকা বাস, প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য পরিবহন। 

গাবতলী বাস টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক যাত্রী বাসের অপেক্ষায় বসে আছেন। যথাসময়ে বাস না আসায় তারা গন্তব্যে যেতে পারছেন না। কাউন্টারগুলো থেকে বলা হচ্ছে, রোববার রাতে যেসব বাস ঢাকা ছেড়ে গেছে, রাস্তায় যানজট থাকায় সেগুলো যথাসময়ে ফিরে আসতে পারছে না। একে ট্র্যাভেলসের কাউন্টার থেকে জানানো হয়েছে, সাতক্ষীরা থেকে তাদের বাস ঢাকায় পৌঁছতে সাধারণত ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু এখন যানজট থাকায় তাদের একটি বাস ফিরে আসতে সময় লাগছে ১৮ ঘণ্টা। একই কথা বলা হয়েছে ঈগল, শ্যামলী এসপি গোল্ডেন লাইনসহ বিভিন্ন বাস কোম্পানির কাউন্টার থেকে।


আরো সংবাদ