২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নিয়মের ঊর্ধ্বে ১৪ লাখ রিকশা 

নিয়মের ঊর্ধ্বে ১৪ লাখ রিকশা  - ছবি : সংগৃহীত

ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যেও নিয়ম মানানো যায়নি রিকশা ও অটোরিকশা চালকদের। যান্ত্রিক গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব হলেও রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিধান নেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে। ফলে রাজধানীর প্রায় ১৪ লাখ রিকশা যেভাবে খুশি চলছে। নিষিদ্ধ সড়কেও তারা সরব। আর ভাড়া আদায়েও নেই নিয়মনীতি। 

কখনো কখনো পুরো শহরটাকে মনে হয় ‘যেন রিকশার শহর’। কোনো কোনো এলাকায় রিকশাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ট্রাফিকব্যবস্থার ক্ষেত্রে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর রাস্তায় চলাচলকারী সব যানবাহন ও চালকের জন্য আইন থাকলেও রিকশার ব্যাপারে কোনো আইন নেই। ফলে তারা ফ্রি স্টাইলে চলছে। রাজধানীর বেশির ভাগ মার্কেট আর বিপণিবিতানের সামনে যে যানজট তার মূলে রয়েছে রিকশা।

রাজধানীর অলিগলি থেকে ভিআইপি সড়ক সবই এখন রিকশার দখলে। ১২-১৪ বছরের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত এসব রিকশারচালক। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না রিকশাচালকেরা। যেভাবে পারছে, যে জায়গা থেকে পারছে রিকশা চালাচ্ছে। রিকশার গ্যারেজ মালিক ও রিকশাচালকদের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে এখন ১৪ লাখের ওপর রিকশা চলছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে কোনো তথ্য নেই। কোনো গলিতে ১০ মিনিট দাঁড়ালেই বোঝা যাবে কত সংখ্যক রিকশা রাস্তায় চলছে।
গত ৫ আগস্ট থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ চলার কারণে এই সময়ে রাজধানীতে গণপরিবহনের সঙ্কট সৃষ্টি হয়। যেসব গাড়ির কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে, চালকদের লাইসেন্সে ত্রুটি রয়েছে সেসব যানবাহন ও চালক রাস্তায় বের হয়নি। বের হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে রিকশা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব রিকশা চলাচলে বৈধ কোনো অনুমতি না থাকলেও তা চলছে বছরের পর বছর। 

রাজধানীর ভিআইপি সড়কসহ কিছু কিছু সড়কে রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না চালকেরা। যাদের দায়িত্ব রয়েছে এগুলো নিয়ন্ত্রণের সেই ট্রাফিক পুলিশও এ ব্যাপারে নির্বিকার। পুলিশের সামনে দিয়েই ভিআইপি সড়ক দিয়ে রিকশার অবাধ যাতায়াত। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন নতুন করে রিকশা নামছে রাজধানীর পথে। একটি রিকশা রাস্তায় নামলেই মালিকের লাভ। একটি রিকশা নির্মাণে খরচা হয় ১২-১৫ হাজার টাকা। মাসে আয় হয় কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার টাকা। রিকশার কোনো লাইসেন্স লাগে না। চালকেরও কোন লাইসেন্স বা প্রশিক্ষণ লাগে না। শুধু প্যাডেল ঘোরাতে পারলেই চলে। অভিযোগ রয়েছে এই রিকশা এখন প্রশাসন থেকে শুরু করে একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকার উপার্জনের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ বছরে অন্তত শত কোটি টাকা হাতিয়েছে রিকশার ভুয়া নম্বর প্লেট বিক্রি করে। আর ওই নম্বর প্লেটকেই বৈধ গণ্য করছে পুলিশ প্রশাসন। ওই নম্বর প্লেট যেসব রিকশার রয়েছে তা অবাধে চলতে পারছে রাজধানীতে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবৈধ এই বাণিজ্য চলছে রিকশা-ভ্যান মালিক ও শ্রমিক নামধারী কিছু সংগঠনের ব্যানারে। সহায়তা করছে সিটি করপোরেশন এবং মহানগর পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য। বানানো ওই নম্বর প্লেট দিয়েই চলছে অন্তত ১৪ লাখ রিকশা ও ভ্যান। তবে এর নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই ঢাকা সিটি করপোরেশন বা ট্রাফিক পুলিশের কাছে। এখন রাজধানীর সব পথঘাট উন্মুক্ত পেয়ে রিকশা ও ভ্যানের সংখ্যা আরো বেড়ে চলছে। সূত্র জানায়, সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও রাজধানীতে রিকশাচালকের সংখ্যা ১৫ লাখের কম হবে না। সূত্র জানায়, যারা এক সময় রিকশার নম্বর প্লেট বিক্রি করতেন তাদের অনেকেই এখন রাজনৈতিক দলের বড় নেতা। 
রিকশা-ভ্যান মালিক-শ্রমিক সংগঠন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে কমপক্ষে ১৪ লাখ রিকশা-ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। কিন্তু বৈধ লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৮৭ হাজার। এই লাইসেন্সও অনেক পুরনো। এর মধ্যে রিকশা ৭৯ হাজার ৫৫৪টি, ভ্যান ৮ হাজার। বাদবাকি ঠেলাগাড়ি ও ঘোড়ার গাড়িসহ অন্যান্য অযান্ত্রিক বাহন। ১৯৮৬ সালে শেষ লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। অজ্ঞাত কারণে ৩২ বছর ধরে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো বৈধ লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে না। আর পুরনো লাইসেন্স নবায়নও করা হচ্ছে না। আর এই সুযোগে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন সংগঠনের নামে রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স দিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ঢাকা মহানগর এলাকায় রিকশা মালিক ও শ্রমিকদের নামে অন্তত ৩০টি সংগঠন রয়েছে। এরাই মূলত রাজধানীর রিকশা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কোনো এলাকায় মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে রিকশা নিষিদ্ধ করা হয়।

ওই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে। কিন্তু তা কার্যকর নেই। এই সুযোগে ভিআইপি রোডেও চলছে রিকশা ভ্যান। মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হলে তারা বলেন, রিকশার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। চালকেরও কোনো লাইসেন্স লাগে না। ব্যবস্থা নেবেন কিভাবে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হয়। সেখানে কিছু রিকশা ভ্যান আটক করা হয়। এর বাইরে কিছুই করার নেই।


আরো সংবাদ

সকল