২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জিনজিয়াংয়ে মুসলিম নিপীড়নের সাফাই চীনা পত্রিকায়

জিনজিয়াংয়ের রাস্তায় চীনা আধা সামরিক বাহিনীর টহল - ছবি : সংগ্রহ

এবার চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সাফাই গাওয়া হলো দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশে ‍উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমন পীড়নের।চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ‘দ্য গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা লিখেছে, মুসলিমদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কারণে জিংজিয়াং ‘চীনের সিরিয়া’  বা ‘চীনের লিবিয়া’ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

জিনজিয়াংয়ে মুসলিমদে গণহারে বন্দী করে রাখার খবর প্রকাশের এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে গত শুক্রবার বিবৃতি দিয়েছে জাতিসঙ্ঘের বৈষম্যবিরোধী কমিটি। আর এই কমিটির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দ্য গ্লোবাল টাইমসের সোমবারের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে চীনের এই বক্তব্য।

জাতিসঙ্ঘের বৈষম্যবিরোধী কমিটি ভাইস চেয়ারপারসন গে ম্যাকডুগাল বলেছেন, উগ্রবাদবিরোধী কেন্দ্রের নাম দিয়ে চীন ১০ লাখের বেশি মুসলিমকে বন্দী করে রেখেছে।

বিচ্ছিনতাবাদীদের একটি হামলার সূত্র ধরে এই গণগ্রেফতার করা হয়। বন্দীশালায় এসব মুসলিমকে বাধ্য করা হয় ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করতে ও কমিউনিস্ট পার্টির আনুগত্য স্বীকার করতে।

গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাটি বলছে, জিনজিয়াংয়ে যেসব কর্মকাণ্ড চলছে তা অঞ্চলটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনার জন্য করা হচ্ছে। পশ্চিমাদের সমালোচনাকে ‘ধ্বংসাত্মক পশ্চিমা মন্তব্য’ আখ্যা দিয়ে তারা বলছেন, সব কিছুর আগে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে হবে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিশালী নেতৃত্ব ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভুমিকার কারণে জিনজিয়াং প্রদেশটি অশান্তির কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। চীনের সিরিয়া বা চীনের লিবিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে’।

চীন জিনজিয়াং প্রদেশটি মুসলিম অধ্যুষিত। প্রায় এক কোটি মুসলিম বসবাস করে অঞ্চলটিতে। কমিউনিস্ট পার্টির শাসনে দেশটিতে ধর্ম  পালনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনেকদিন ধরেই জিনজিয়াংয়ে মুসলিম নাগরিকদের ওপর চলছে চীনা শাসকদের নিপীড়ন।  এমনকি অনেক জায়গায় নামাজ, রোজার মত মৌলিক ইবাদতগুলোও করতে বাধার সম্মুখীন হতে হয় মুসলিমদের।

আরো পড়ুন : গোপন ক্যাম্পে অাটক ১২ লাখ উইঘুর মুসলিম
চীন কমপক্ষে ১০ লাখ উইঘুর মুসলমানকে বড় বড় বিভিন্ন শিবিরে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক একটি প্যানল। শুক্রবার তারা বলছে, বিভিন্ন শিবির দেখে আটক কেন্দ্র বলেই মনে হয়েছে তাদের।

জানা গেছে, সেই শিবিরগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছে চীন। তাৎক্ষণিকভাবে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫০ জন চীনা কর্মকর্তার কেউই এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।


জাতিসঙ্ঘের বর্ণবাদ নির্মূল কমিটির সদস্য গে ম্যাকডোগাল। তিনি জানান, আটক ১০ লাখের বাইরেও আরো ২ লাখ উইঘুর মুসলমানকে রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নামে অন্য শিবিরে আটকে রাখা হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস জানিয়েছে, বন্দিদের কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হয় এবং তাদের কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। তারা জানাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বন্দিদের ঠিকমতো খাবার খেতে দেয়া হয় না এবং তাদের ওপর নির্যাতনও চালানো হয়। অধিকাংশ বন্দির ক্ষেত্রেই যেহেতু কোনো অভিযোগ গঠন করা হয় না তাই তারা কোনো আইনি সহায়তাও পান না। অভিযোগ রয়েছে, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে এ ধরনের বন্দি শিবির চালাচ্ছে চীন।

জাতিগত সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলমানরা সাধারণত চীনের জিনজিয়াং প্রদেশেই বসবাস করেন। সেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ ভাগই উইঘুর মুসলিম। তিব্বতের মতো জিনজিয়াং প্রদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের ভেতর অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। গেল কয়েক মাস ধরেই এমন খবর শোনা যাচ্ছে যে, জিনজিয়াংয়ে উইঘুর সম্প্রদায় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনকে আটক করছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ জাতিসঙ্ঘের কমিটির কাছে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে দেখা গেছে কর্তৃপক্ষ সংখ্যালঘু মুসলিমদের ব্যাপকভাবে বন্দি বানাচ্ছে। তারা বলছে, এইসব শিবিরে বন্দি ব্যক্তিদের জোর করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি বিশ্বস্ত হতে শপথ করানো হয়।

মুসলিমদের বংশানুক্রমিক ধারা ভেঙে দিতে জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিম নারীদের জোরপূর্বক বিয়ে করছে চীনা পুরুষরা। যুদ্ধে ধর্ষণের মতো মূলত জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এমনটা করা হচ্ছে। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের এমনই একটি বিয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক ভিত্তিক উইঘুর স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপ ‘টক টু ইস্ট তুর্কিস্তান’ জোরপূর্বক বিয়ের এ দাবি করেছে। ‘টক টু ইস্ট তুর্কিস্তান’ গ্রুপটির মতে, জিনজিয়াংয়ে উইঘুর জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার অংশ হিসেবেই এ ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট সরকার।

ভিডিওতে দেখা যায়, বিয়ের অনুষ্ঠানের একজন আয়োজক চীনা পাত্রকে জিজ্ঞেস করছেন- কতদিন যাবৎ তিনি পাত্রীকে চেনেন। জবাবে পাত্র বলেন, তিনি দুই মাস যাবৎ পাত্রীর সাথে পরিচিত। অন্যদিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে উইঘুর ওই মুসলিম পাত্রী ছিলেন দুঃখ ভারাক্রান্ত ও বিমর্ষ। ভিডিও আপলোডকারী জানান, জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিম-বিরোধী বিভিন্ন চীনা অপতৎপরতার অংশ হিসেবে উইঘুর নারীদের জোর করে চীনা পুরুষদের সাথে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটি তার একটি উদাহরণ মাত্র।

ভিডিও ক্যাপশনে বলা হয়, উইঘুর পুরুষদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রেখে চীন উইঘুর নারীদের বাধ্য করছে চীনা পুরুষদের বিয়ে করতে। এত খোলামেলা একটি গণহত্যা সংগঠিত হচ্ছে কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমনকি অন্যান্য তুর্কি ও মুসলিম দেশগুলো তাদের উইঘুর ভাইবোনদের কান্নাকে অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করে যাচ্ছে।

এর পূর্বে অপর একটি পোস্টে ১৯৪৯ সালে চীনা বিপ্লবের পর থেকে ঝিংজিয়াংয়ে উইঘুরদের দমনের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়াসমূহের থেকে আটটি কর্মসূচী তুলে ধরা হয়। যথা: ১. উইঘুর বর্ণমালাকে চৈনিকীকরণ ২. উইঘুর বই-পুস্তকের উপর সেন্সরশীপ ৩. উইঘুর বুদ্ধিজীবি মহলকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অনুগত করতে বাধ্য করা ৪. ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিষিদ্ধকরণ ৫. হালাল বস্তুকে নিষিদ্ধকরণ ৬. উইঘুর পরিবারগুলোকে হান কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আনয়ন ৭. ইসলামী নামকরণ নিষিদ্ধকরণ ৮. কাশগরের ঐতিহাসিক ভবনসমূহ ধ্বংস করা

চীনের পুলিশ দেশটির মুসলিম নারীদের ওপর নতুন ধরনের নির্যাতন শুরু করেছে। দেশটির উইঘুর শহরে রাস্তায় কোনো নারীর পরনে বোরকা বা এ সদৃশ পোশাক দেখলেই কেটে ফেলছে তারা। রমজান মাসে চীনে মুসলমানদের রোজা রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর পর থেকেই রাস্তায় কোনো নারীকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় দেখলেই তা কেটে ফেলছে দেশটির পুলিশ।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির উইঘুরে মুসলিমদের উপর নির্যাতন করে আসছে পুলিশ। রোজা রাখার পাশাপাশি শহরে মুসলিম প্রথা অনুযায়ী শিশুদের নাম রাখতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। ডকুমেন্টিং এগেইনিস্ট মুসলিম (ডিওএম) নামক একটি সংগঠন জানিয়েছে, উইঘুরে রাস্তার মাঝখানে শত শত পুরুষের সামনে মুসলিম নারীদের বোরকা কেটে দেওয়া হচ্ছে। ছোট করে দেওয়া হচ্ছে পোশাক। একটি ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত ব্যতীত কিছু নয়।

চীন সরকারের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘অস্বাভাবিক’ লম্বা দাড়ি রাখা যাবে না এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় মুখ ঢাকা পোশাক পরা নিষিদ্ধ। সেই সাথে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।


আরো সংবাদ