২০ নভেম্বর ২০১৮

সৌদি-কানাডা উত্তেজনা চরমে, বৈরিতার নেপথ্যে কে?

সৌদি-কানাডা উত্তেজনা চরমে, বৈরিতার নেপথ্যে কে? - সংগৃহীত

সৌদি আরবের সাথে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে কানাডা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ব্রিটেনের সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এতে তারা জড়াবে না।  বুধবার সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে কানাডার সাথে ঘোর কূটনৈতিক বিরোধে মধ্যস্থতার কোনো সুযোগ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে বেশ কিছু বই লিখেছেন স্টিভেন কুক। স্টিভেন কুক বলেন, এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে। সৌদি আরব আসলে সতর্ক করতে চাচ্ছে যে, ক্রাউন প্রিন্স সংস্কার বললেই সংস্কার। এটা বলা যায় যে, সেখানে ভিন্নমত পোষণের কোন সুযোগ নেই। রিয়াদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সরকার কতটা আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। কানাডার সাথে সৌদির এমন বৈরিতা শুরুকে অনেকেই মনে করছেন যে, মোহাম্মদ বিন সালমান এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে বার্তা দিতে চান যে, সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশ্ন করার বিষয়ে তাদের ভাবা উচিত।

কানাডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লইড এক্সওর্থি বলেন, আমি মনে করি ক্রাউন প্রিন্স নতুন সংস্কারক, নতুন সময়ে, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দিতে এসেছেন। কিন্তু তিনি এবং তার বাবা বেশ কিছু অপব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই তাকে কারাবাস দেয়াটাও এর মধ্যে অন্তুর্ভূক্ত। অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন সৌদি আরব হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুসরণ করছে।

রোববার সৌদি সরকার ওটোয়া থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং রিয়াদে কানাডার রাষ্ট্রদূতকে ফিরতে দেয়নি। কানাডার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে সৌদি আরব। রিয়াদে আটক এক মানবাধিকারকর্মীকে মুক্তির আহ্বান জানানোর পরই দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রিয়াদের অভিযোগ, কানাডা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর উদারপন্থী সরকার মানবাধিকারের গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছে। সৌদির সাথে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে তারা আরব আমিরাতের দারস্থ হবে বলে জানা গেছে। উত্তেজনা কমাতে মিত্র ও বন্ধু দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এটি দ্রুতই ঘটতে পারে।

কানাডা ব্রিটেনেরও সহায়তা চাইতে পারে। ব্রিটিশ সরকার মঙ্গলবার দুই দেশকে সংযম অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিদার নুয়ার্ট বলেন, দুপক্ষকেই বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। আমরা এখানে কিছু করতে পারব না। তাদেরই একসাথে এর সমাধান টানতে হবে।

রিয়াদের সঙ্গে অচলাবস্থা কাটাতে কানাডা আঞ্চলিক মিত্রদেশগুলোর দিকে হাত বাড়ালেও অনড় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব। বুধবার সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে কানাডার সাথে ঘোর কূটনৈতিক বিরোধে মধ্যস্থতার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া কানাডা যে বড় ধরনের ভুল করেছে তা শুধরে নিতে কি করা প্রয়োজন তাও অটোয়া জানে বলে মন্তব্য করেছে রিয়াদ।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবাঈর রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মধ্যস্থতা করার কিছু নেই। একটি ভুল হয়েছে, তা শুধরে নেয়া উচিত। দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতির ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, সৌদি আরব এখনো কানাডার বিরুদ্ধে বাড়তি আরো পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি তিনি।

কানাডার জাস্টিন ট্রুডোর উদারপন্থী সরকার রিয়াদকে কারাবন্দি অধিকারকর্মীদের মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। আর তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে সৌদি আরব কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ এবং কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করাসহ সবশেষে কানাডায় সব ধরনের চিকিৎসাসেবাও বন্ধ করেছে। তবে ঐতিহ্যগত দিক থেকে কানাডার অন্যতম বন্ধুদেশ যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদের সঙ্গে অটোয়ার মধ্যকার বিরোধে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। জুনে জি-৭ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সমালোচনা করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সাথেই শক্ত বন্ধন গড়ে তুলেছেন।

কানাডার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে নিজেদের সব রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির সঙ্গে সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সৌদি আরবের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফাহদ বিন আব্রাহিম আল তামিমি এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার ও দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের পর এবার পরোক্ষভাবে কানাডায় নাইন-ইলেভেন স্টাইলে হামলার ‘হুমকি’ দিয়েছে সৌদি আরব। সোমবার সৌদি সরকারের এক টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এ হুমকি দেয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

সৌদি সরকারপন্থী একটি ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে কানাডার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার পর একটি ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, কানাডার একটি বিমান টরেন্টোর বিখ্যাত সিএন টাওয়ারের দিকে যাচ্ছে। সঙ্গে ছবিতে লেখা রয়েছে, ‘যারা অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে তারা এমন বিষয়ের মুখোমুখি হবে, যা সন্তোষজনক নয়।’ ছবিটিকে অনেকেই ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার ছবির সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওঠে এসেছে। তবে ছবিটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে টুইটার অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওই ছবিটি ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই অ্যাকাউন্ট থেকে পরে ছবিটি সরিয়ে ফেললেও, এর ক্যাশড ভার্সন এখনো অনলাইনে ঘুরছে। এ বিষয়টি অস্বীকার করেছে সৌদি সরকার।

দেশটির গণমাধ্যমে বলা হয়, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে সৌদি সরকার তার তদন্ত করছে। গত ১ আগস্ট হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছিল, সৌদি আরব কয়েকজন অধিকারকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন সৌদি আরবের নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রখ্যাত নেত্রী সামার বাদাউই। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শুক্রবার অধিকারকর্মীদের ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দাবি করেছিল কানাডা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব।

এরই জের ধরে কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করাসহ বেশকিছু চুক্তিও বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। চুক্তিগুলোর মধ্যে নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব, সহস্রাধিক ডলারের প্রতিরক্ষা সমঝোতা ও শিক্ষাসংক্রান্ত চুক্তি। এরপর কানাডার টরেন্টোতে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্স। এছাড়া কানাডা থেকে ৮ হাজার ৭৬ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে এনেছে সৌদি আরব। কানাডার সঙ্গে শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচিও বন্ধ করবে সৌদি আরব। এর পরিপ্রেক্ষিতে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিরিসতিয়া ফ্রিল্যান্ড বলেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে সৌদি আরবের যেসব শিক্ষার্থী এখানে পড়ার সুযোগ পাবে না, তাদের জন্য এটি লজ্জার।' গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সৌদি সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

 


আরো সংবাদ