২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নন্দিত কথাশিল্পী : হুমায়ূন আহমেদ

নন্দিত কথাশিল্পী : হুমায়ূন আহমেদ - ছবি : সংগৃহীত

একজন নিবেদিত সৎ লেখক স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই নিজস্ব ধারা, স্টাইল বা বিশেষত্বে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এ স্বকীয়তা তিনি অর্জন করেন তার নির্মাণশৈলীর দক্ষতা দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ সে রকমই একজন লেখক ছিলেন। তিনি রেখে গেছেন তার বিশাল সৃষ্টিকর্ম। সেখানে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

এই কলম জাদুকরের কেন এত সুখ্যাতি ? কেন এত জনপ্রিয়তা ? তা নির্ণয় করার এখন সময় এসেছে। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। উপন্যাস, গল্প, চলচ্চিত্র, নাটক, সায়েন্স ফিকশন, গান, ছবি অঙ্কন ও সাহিত্যর বিভিন্ন শাখায় তার অবাধ বিচরণ আমাদের সত্যি অবাক করে। প্রকৃতি প্রেমিক হুমায়ূন আহমেদের বিশাল সাহিত্যেজুড়ে রয়েছে সফলতা। জীবনকে দেখেছেন তিনি প্রকৃতির মতোই সহজ-সরল। তা ছাড়া ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও তিনি অতি সহজ-সরল এবং মানবিকগুণ সম্পন্ন। এ সহজতা তার সাহিত্যে প্রতিফলন ঘটে। তিনি জীবনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে এবং গভীরভাবে। মার্কিন ঔপন্যাসিক মার্কটোয়েনের ভাষায়, ‘মানুষের জীবনে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যার যত বেশি এবং সেই সঙ্গে ভাষার ওপর যার রয়েছে সম্পূর্ণ অধিকার তার পক্ষে তত বড় ভাষা শিল্পী হওয়া সম্ভব।’ মানুষকে দেখার এবং পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা হুমায়ূন আহমেদের একটি বিশেষ গুণ ছিল।

একজন জীবন শিল্পীর কাজ জীবনের স্বরূপ চিত্রায়ণ। সে চিত্রায়ণে যে যতবড় দক্ষ সে তত দক্ষ শিল্পী। হুমায়ূন আহমেদ বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণদের চিন্তা-চেতনা, জীবন-যাপন, সংলাপ, উচ্চারণ, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রোমান্স,পরিণয়, পরস্পরে মানবিক সম্পর্ক, প্রেম-ভালোবাসা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস তুলে এনেছেন অত্যন্ত নিপুণ শিল্পীর আঁচড়ে। তাই তরুণরা তার লেখা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পাঠ করে এবং তিনি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। যেকোনো বিষয়ই তার লেখার অন্তর্ভুক্ত। শ্রেণিভিত্তিক সমাজের রূপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, অর্থনীতি, ধর্মনীতি, বিজ্ঞান, সমাজনীতি, ভালোবাসা-ঘৃণা, মানুষের অসহায়ত্ব, এমনকি ব্যক্তির মনের গোপন কথাটিও তার গল্পের বিষয়বস্তু ছিল। উপন্যাস ও গল্পে তিনি চরিত্র নির্মাণে বেশি আগ্রহী। চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি গল্পের সামগ্রিকতা তুলে আনেন। কাহিনী বর্ণনায় অপ্রয়োজনীয় বর্ণনার আশ্রয় নিতে চান না। শব্দ নিয়ে অতো টানাহেঁচড়া বা অর্থহীন প্যাঁচালে জড়াতে চাননি। উপন্যাস ও গল্পে তিনি চরিত্র নির্মাণে বেশি আগ্রহী। চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি গল্পের সামগ্রিকতা তুলে আনেন। মাহ্বুব আজীজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন,‘ লেখার সঙ্গে ইনভলবড হতে না পারলে আমি সেটা লিখি না। মিনিমাম অন্তরঙ্গতা নিজের প্রতিটি লেখার সঙ্গেই একজন লেখকের থাকতে হয় বলে আমার ধারণা।’ ছোট ছোট বাক্যে তিনি গল্প বুনেন। তারা ভাষা সম্মোহক। চরিত্রগুলো চেনা-জানা পরিবেশের। তার লেখা নিজস্ব। বইয়ের ভেতর যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো লাইন পড়লে বোঝা যায় এটা হুমায়ূন আহমেদের লেখা। তার লেখা এক ধরনের ঘোর সৃষ্টি করে।

পাঠক সেই ঘোর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খোঁজে এরপর কি হলো, এরপর কি হলো! শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। এখানে তিনি কথার জাদু সম্রাট। হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মতো যেন বাঁশি বাজিয়ে যান তার নিজস্ব গন্তব্যে। পাঠককে এভাবে ধরে রাখার শক্তি ছিল শরৎচন্দ্রের।

হুমায়ূন আহমেদ একজন স্বতঃস্ফূর্ত লেখক। লেখায় স্বতঃস্ফূর্ত না থাকলে জোর করে ভালো লেখা সম্ভব নয়। জীবন প্রবল রহস্যময়। মানুষ যেমন রহস্যময়, তার চেয়ে বেশি রহস্যময় মানুষের মন। এই রহস্যময়তা তাকে আবিষ্কার করতে হয়। সাহিত্যের প্রধান কাজ আনন্দ সৃষ্টি করা। যিনি শিল্পসাহিত্যে যত বেশি আনন্দ সৃষ্টি করতে পারবেন, তিনি তত বড় মহৎ শিল্পী। জীবনে জটিলতা থাকবেই, তাকে সহজ ছন্দে গ্রহণ করতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ আনন্দের মধ্য দিয়েই মানুষের মুক্তি খুঁজেছেন। তার জাদুর বাঁশি বাজাতে আনন্দরস ছেড়ে দিয়েছেন।

আনন্দকে পান করাবেন বলেই তিনি লিখেছেন। তিনি জটিল কথাগুলো অত্যন্ত হাস্যরস ও ব্যঙ্গরূপকের প্রকাশ করেছেন। যে চরিত্রটি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা উচিত ঠিক সেভাবেই যৌক্তিকভাবে অঙ্কিত করেছেন। হিমু, বাকের ভাই কিংবা মিসির আলীর চরিত্রটি যেমন হওয়া উচিত বলে পাঠক মনে করেন, ঠিক সেভাবে এবং শৈল্পিকভাবে ফোটাতে পেরেছেন। তার বহুব্রীহি, অয়োময় এবং কোথাও কেউ নেই এসব নাটকের কথা তো আমরা কখনো ভুলব না। কালজয়ী এ কথাশিল্পীর প্রথম দুটো উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’। মধ্যবিত্ত পরিজনের জীবন, চরিত্র ও কাহিনী নিয়ে বাংলা ভাষায় লেখা অনন্যসাধারণ গ্রন্থ। ভাষায় ব্যঞ্জনায় কখনোবা ঘটনার চমৎকারিত্বে পাঠক আবিষ্ট করে রাখেন। হুমায়ূন আহমেদ শুধু লেখার মাধ্যমে আনন্দ দান করেননি, বরং তার লেখায় আরো গভীরতা আছে। সমাজের শুদ্ধতার কথা বলেছেন, সত্যকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছেন। তার ‘শুভ্র গেছে বনে’ উপন্যাসের অংশবিশেষ তুলে ধরা যাক।

শুভ্র হঠাৎ নড়েচড়ে বসল। তার বেঞ্চের এক কোনায় অল্প বয়সী একটা মেয়ে এসে বসেছে। বাচ্চা মেয়ে। পনেরো-ষোলো বছরের বেশি বয়স হবে না। মেয়েটা এত রাতে পার্কে কী করছে কে জানে! তবে মেয়েটা বেশ সহজ-স্বাভাবিক। তার সঙ্গে লাল রঙের ভ্যানিটি ব্যাগ। সে ব্যাগ খুলে একটা লিপস্টিক বের করল। আয়না বের করল। এখন সে আয়োজন করে ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছে। এত রাতে মেয়েটা সাজগোজ শুরু করেছে কেন কে জানে। শুভ্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এখন সে কপালে একটা লাল রঙের টিপ দিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইজান দেখেন তো টিপটা মাঝখানে পড়েছে? (শুভ্র গেছে বনে; পৃষ্ঠা : ৫২।)

এখানে লক্ষ করলে দেখা যাবে, ১৫-১৬ বছরের এক গ্রাম্য কিশোরীর চিন্তাভাবনা কত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন গল্প বলার নিজস্ব ঢঙে। ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা আছে। একটার পর একটা ঘটনা জানতে কৌতূহল জাগে এবং গল্প সামনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ‘ভাইজান দেখেন তো টিপটা মাঝখানে পড়েছে?’ এই যে সহজ সম্বোধন, এর চেয়ে সারল্যতা আর কী হতে পারে!

পরের অংশটুকু,
‘শুভ্র বলল, হ্যাঁ। মেয়েটা শুভ্রর দিকে পুরোপুরি ফিরে বলল, এই পরথম টিপ মাঝখানে পড়েছে। সবসময় আমার টিপ হয় ডাইনে বেশি যায়, নয় বাঁয়ে বেশি যায়। এর ফলাফল খুব খারাপ। ফলাফল কী জানেন না?
না। ফলাফল সতিনের সংসার।’
(শুভ্র গেছে বনে; পৃষ্ঠা : ৫২।)
সামান্য একটি বিষয় ‘টিপ’ অথচ এর শিকড় কত গভীরে! আমাদের যুগ যুগ ধরে কুসংস্কার ও অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের মূলে নাড়া দিয়েছেন একটি সামান্য বিষয় টিপকে কেন্দ্র করে। টিপ মাঝখানে না পড়লে তার সতিনের সাথে সংসার করতে হয়। এই সামান্য কিশোরী ফুলকুমারীর জানার কথা নয়। মূলত তিনি আমাদের গ্রাম্য সমাজব্যবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরে আমাদের বোধকে নাড়া দিয়েছেন। একটা সামান্য বিষয়কে অসাধারণ করে তুলে ধরা এটা একমাত্র হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখকের পক্ষেই সম্ভব।

হুমায়ূন আহমেদ আধুনিক হয়ে উঠেছেন। তিনি আধুনিক কালের লেখক এবং আধুনিক সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা কিন্তু কালজয়ী। তিনি অতীতকে অতিক্রম করেছেন পুরনো প্রকরণ এবং চিন্তা-চেতনা প্রত্যাখ্যান করায়। তার সাহিত্যকর্ম ¯্রফে হালকা গল্পের বই নয়, এতে আছে আধুনিক জীবনদর্শন এবং উচ্চতর শিল্প।

কেবল প্রতিভাবানেরাই অন্যের প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারেন মানবমনের চিরন্তন আকাক্সক্ষা সে প্রেমকে যতই লুকাতে চাই কিন্তু প্রেমকে তো আর বেঁধে রাখা যায় না, তার গতিপথে চলতেই থাকে। মানুষের মনের রঙ মুহূর্তে মুহূর্তে বদলায়। সে চায় নতুনত্ব, ওখানে কী যেন আছে। এই অসীম চাওয়া তাকে ধাবিত করে অন্য নদীর খোঁজে। হুমায়ূন আহমেদ কী চমৎকারভাবে জীবনে সত্যের চেয়ে যে সমাজসত্য বড় নয়- এই বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছেন তার গল্পে। তার গল্প থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দেয়া যাক।

‘বাসার সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সবার কঠিন দৃষ্টি উপেক্ষা করে মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিলো। যে গভীর ভালোবাসার হাত বাড়াল সে ভালোবাসা উপেক্ষা করার ক্ষমতা স্রষ্টা মানুষকে দেননি। আমি তার হাত ধরলাম। এই কুড়ি বছর ধরেই আছি। মাঝে মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা বোধ করি। ভ্রান্তির এই গল্প আমার স্ত্রীকে বলতে ইচ্ছে করে। বলতে পারি না। তখন আপনার মতো অপরিচিত একজন কাউকে খুঁজে বের করি। গল্পটা বলি। কারণ, আমি জানি এই গল্পে কোন দিন আমার স্ত্রীর কানে পৌঁছবে না। আচ্ছা ভাই, উঠি। আমার ট্রেন এসে গেল।’ রূপা (প্রিয় পদরেখা ২০০৯)
জীবনে বোধ আরো গভীর আরো চিরসবুজ কথার জাদুসম্রাট হুমায়ূন আহমেদের। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন কাল থেকে কালান্তরে।

 

 


আরো সংবাদ