২০ এপ্রিল ২০১৯

হুমায়ূন আহমেদের শেষের দিনগুলো

হুমায়ূন আহমেদ
স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের সাথে । - ছবি : বিবিসি

আমেরিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের ১৯ জুলাই মারা যান বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ । কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় দশ মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

দেশ থেকে বহু মাইল দূরের এক শহরে তার জীবনের শেষের দিনগুলো কেমন কাটছিল সে নিয়ে আগ্রহ তার অনেক পাঠক-অনুরাগীর। আজ ১৯ জুলাই তার মৃত্যুদিবসে সেই সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়েছে বিবিসি বাংলা।

কর্কট রোগের সাথে লড়াই শুরু
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরে রুটিন শারীরিক পরীক্ষা করতে গিয়ে আকস্মিকভাবেই ধরা পড়ে হুমায়ূন আহমেদের কোলনে (বৃহদান্ত্রে) ক্যান্সার তা-ও চতুর্থ পর্যায়ে।

হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা প্রক্রিয়া খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং শেষদিন পর্যন্ত নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছিলেন বিজ্ঞানী, গবেষক ও লেখক পূরবী বসু্ । 'নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ' নামে একটি বই লিখেছেন তিনি।

সেখানে পূরবী বসু লেখেন, ‘স্টেজ ফোর ক্যান্সার মানে সবচেয়ে পরিণত বা Advanced Stage-ক্যান্সার। স্টেজ ফোর-এ কর্কট কোষগুলো মূল জায়গা ছাড়াও শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। কোলন ক্যান্সারে চার নম্বর স্টেজ থেকে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা খুবই কম, (শতকরা ৭% এর মতো)। সিঙ্গাপুরের ডাক্তাররাই দুঃসংবাদটি দিয়ে হুমায়ূনকে জানিয়েছিলেন কোলন থেকে তার ক্যান্সার লিভারের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সম্ভবপর চিকিৎসার মধ্যে ছিল কেমোথেরাপি অথবা কিছু কেমোথেরাপি আর সার্জারি। কিন্তু অসুখের নামটা শুনেই হুমায়ূন মনে মনে স্থির করে ফেলেছেন ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো জায়গায় যাবেন এবং সেটা সিঙ্গাপুর নয়। আমেরিকা।’

কেমোথেরাপি-সার্জারির ‘দীর্ঘ নিঃসঙ্গ ভ্রমণ’ শুরু
নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টার ডাক্তার দেখাবার জন্যে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থাও করেছিলেন পূরবী বসু। আশি- নব্বইয়ের দশকে প্রায় এক যুগ ধরে তিনি স্লোন ক্যাটারিংয়ে গবেষণার কাজ করেছিলেন ।

‘২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সপরিবারে হুমায়ূন নিউইয়র্কে পৌঁছান আর সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ দুপুর একটায় তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক হয় স্লোন ক্যাটারিংয়ে। সেদিন সব কাগজপত্র, প্লেট দেখে, কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তার স্থির করেন প্রথম কিস্তিতে ছয়টি কেমো নিতে হবে। হুমায়ূনের ক্যান্সারের তখন যে অবস্থা (স্টেজ চতুর্থ), তাতে তখন আর সার্জারি করা সম্ভব ছিল না।’

প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম চারটি কেমো নেয়ার পর রিভিউতে যখন দেখা গেল টিউমারের সাইজ একটুও কমেনি তখন তিনি কিছুটা চিন্তিত হয়েছিলেন তবে খুব একটা তার মধ্যে প্রভাব পড়েনি। এ কিন্তু আটটি কেমো নেয়ার পর আবার রিভিউ হল এবং তখন তিনি সাময়িকভাবে কিছুটা ভেঙে পরেছিলেন।’

এমনিতেই বেড়াতে পছন্দ করতেন হুমায়ূন আহমেদ। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি ভ্রমণ করেছেন। আমেরিকায় চিকিৎসাধীন সময়েও তা বহাল ছিল। মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘একটা করে কেমোর পরে আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি। চিকিৎসকের পরামর্শও ছিল যে তোমরা ঘোরাঘুরি করো মানসিকভাবে সে যেন সুস্থ থাকে।’

এভাবে মোট ১২টি কেমো দেয়া হয় হুমায়ুন আহমেদকে।

পূরবী বসু লিখেছেন, ‘১২টা কেমোর ধাক্কা সামলানো কম কঠিন কাজ নয়। হুমায়ূন মনের জোরে একরকম সহজভাবেই তা পার করে দিল। এদিকে শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও শাওনের মা এবং কখনো কখনো ওর ছোটবোন এসে ওকে সাহায্য করে, মনে জোর দেয়। দুটো অতি শিশু সন্তান নিয়ে নিউইয়র্কের মতো বৃহৎ শহরে তা না হলে ওদের খুব অসুবিধে হতো। ১২টা কেমো দেয়ার পর নতুন করে আবার স্ক্রিনিং হওয়ার পর বেলভিউ-নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজের সার্জন ডাক্তার মিলারের সঙ্গে হুমায়ূন ও তার পরিবারের দীর্ঘ মিটিং হয়। আমি তখন ডেনভারে। প্রতিদিনই টেলিফোনে খবর পাই হুমায়ূনের শারীরিক অবস্থার। সার্জারির ব্যাপারে অঙ্কোলজি বিভাগ থেকেই উদ্যোগ নেয়া হয়। ৩০শে এপ্রিলে প্রাথমিক কথা হওয়ার পরে আবার দ্বিতীয় দফায় বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে ১২ জুন ভোরে হুমায়ূনের সার্জারি হবে কোলন ও লিভারে দুই জায়গাতে একই দিনে। কোলনে হবে প্রথাগত সার্জারি।’

অর্থাৎ বৃহদান্ত্রের যে অংশে ক্যান্সার রয়েছে সেই অংশটুকু কেটে ফেলে দিয়ে আবার সুস্থ বৃহদান্ত্রের দুই মাথা যোগ করে সেলাই করে দেয়া হবে। আর লিভারে প্রথম পুরো সার্জারি না করে টিউমার ধ্বংস করার চেষ্টা করা হবে। যদি সেটা সম্ভবপর না হয় অথবা কোন জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে লিভার থেকে প্রথাগতভাবে মানে পুরনো পদ্ধতিতে টিউমার কেটে ফেলে দেয়া হবে। দুটোর জন্যই সম্মতিপত্র রেখে দিলেন তারা। সংবাদটি শুনে আমরা সকলেই খুশি। সার্জারি-ই একমাত্র আশা যদি হুমায়ূনকে নিরাময় করে তোলা যায়। কেননা দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমোথেরাপি আর আগের মতো কাজ করছিল না। সত্যি বলতে গেলে আটিটি ও বারোটি কিমোর ভেতর লিভারে খুব যে দৃশ্যনীয় উন্নতি ঘটেছে তা নয়।

সময় কাটছিল লেখালেখি, বেড়ানো আর ছবি আঁকা নিয়ে
চিকিৎসাকালীন সময়ে সেখানে লেখালেখি করছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। সেসময় তার লেখা কলাম ‘নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ ছাপা হয় বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকে। পরে সংকলিত গ্রন্থ হিসেবে ছাপা হয় কলামগুলো। হুমায়ূন আহমেদ তার সে গ্রন্থের উৎসর্গ পাতায় লেখেন, ‘কেমোথেরাপি হল একটি দীর্ঘ বেদনাদায়ক নিঃসঙ্গ ভ্রমণ’।

তবে হুমায়ূন আহমেদের মনোবল এবং আত্মবিশ্বাস ছিল দৃঢ়, জানান তার ঘনিষ্ঠ সহচর এবং প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তার আত্মবিশ্বাস ছিল প্রচণ্ড রকম। উনি প্রথম থেকে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।’

নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদ, স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এবং মাজহারুল ইসলাম

 

প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হাসপাতালে তার পাশে ছিলেন। তিনি বলেন, “উনি কিন্তু ওখানে (আমেরিকায়) পৌঁছানোর ঠিক পরের দিন থকেই লেখালেখি শুরু করেন। উনার শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’-এর অল্প কয়টি পর্ব অন্যদিন পত্রিকায় ধারাবাহিক লিখেছিলেন। তো যাওয়ার সময় এর জন্য, কম্পিউটার কম্পোজ কপি, ৪০/৫০টি বই নেয়া হলো যেগুলো পরে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং পত্রিকার কপিসহ আলাদা একটি সুটকেস-ই নেয়া হল, যেখানে শুধু লেখালেখির সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো।”

চিকিৎসা শুরুর সাথে সাথে শুরু করেন প্রথম আলো পত্রিকার জন্য কলাম লেখাও।

যেসব পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা সেগুলো প্রথম দিকে ছিল না বলে জানান মাজহারুল ইসলাম। ১২ নম্বর কেমো শেষে এমনকি সার্জারির তিনদিন আগেও তিনি লিখেছেন, জানান তিনি। নিউইয়র্কেও তার জন্য নীচু টেবিল কেনা হয়েছিল কারণ তিনি মেঝেতে বসে লিখতেন সবসময়।

মৃত্যুর আগে শেষ তিনটি ইচ্ছা!
মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সার্জারির চার/পাঁচদিন আগে তিনি আমাদের ডেকে বললেন, উনি তো অনেক ফান করতেন, বিশেষ করে মৃত্যু নিয়ে অনেক মজা করতেন । তো উনি বললেন, দেখো আমার এত-বড় সার্জারি হবে বাঁচবো কি-না ঠিক নেই। তো ফাঁসির আসামিদের যেমন মৃত্যুর আগে দুই-তিনটা ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগ দেয়া হয় সেরকম আমিও তিনটা ইচ্ছা পূরণ করতে চাই সার্জারির আগে। এমন কথা শুনে উনার স্ত্রী (মেহের আফরোজ শাওন) রেগে গেলেন। তো যাই হোক। এরপর তিনি বললেন, প্রথম ইচ্ছা অ্যাস্টোরিয়াতে একটা সি-ফুড রেস্তোরাঁয় সবাইকে নিয়ে লাঞ্চ করবেন। আরেকটি হল- পিআর সেভেন্টিন বলে একটা ওপেন ফুডকোর্ট আছে যেখানে তিনি বাচ্চাদের নিয়ে যেতে খুব পছন্দ করতেন- সেখানে বাচ্চাদের নিয়ে যাবেন তিনি। আর তৃতীয় ইচ্ছা- তার স্ত্রীকে নিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে যাবেন এবং সেখানে থাকবেন কেবল তারা দুজন।’

তবে মাজহারুল ইসলাম জানান, তিন নম্বর ইচ্ছেটি পূরণ করার কথা ছিল সার্জারির দুদিন আগে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেদিন বাচ্চাদের রেখে আর বের হতে চাইলেন না। ফলে মাজহারুল ইসলামের ওপর দায়িত্ব পড়লো গরুর গোশত কিনে এনে রান্না করার। এভাবে পূরণ হয় তার তিন নম্বর ইচ্ছে।

‘অপারেশন সফল হয়েছে’
১২ জুন ২০১২। সকাল ৬টায় সার্জারি। ।

পূরবী বসু লেখেন, দৃঢ় মনোবল নিয়ে সার্জারির জন্য অপারেশন থিয়েটারে যান লেখক। স্ট্রেচারে নয়, পায়ে হেঁটে।

‘ভোর ৬টার দিকে কয়েকজন রোগীকে স্ট্রেচারে করে নার্স নিয়ে গেল সার্জারিতে আমাদের সামনে দিয়ে। কিন্তু হুমায়ূন কোথায়? একটু পরে দেখি গাউন পরা হুমায়ূন আমাদের সামনে দিয়ে, স্ট্রেচারে করে নয়, পায়ে হেঁটে দিব্যি নার্সের সঙ্গে হাসিমুখে চলে গেল অপারেশন থিয়েটারের দিকে।’

পূরবী বসুর বইয়ের তথ্য অনুসারে, ‘সাড়ে ৬ ঘণ্টা পরে দেখা গেল তার ( হুমায়ূনের) সার্জারি শেষ। আরও কিছুক্ষণ পরে রিকভারি রুমে জ্ঞান ফিরল তার। ততক্ষণে হুমায়ূনের সার্জিকেল টিম এসে জানায় যে অপারেশন সফল হয়েছে।’

‘সার্জন বললেন, ‘যতদূর আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার শরীরে এখন আর কোনো ক্যান্সার নেই। যদি কোন টিউমার ইতোমধ্যেই অন্য কোথাও তৈরি হতে শুরু করে থাকে যা এখনো চোখে দেখা যাচ্ছে না, অথবা আবার পরে যদি নতুন করে কোন টিউমার হয়, সেটার কথা অবশ্য বলা যাবে না এই মুহূর্তে। সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না যেহেতু স্টেজ ফোরে হুমায়ূনের ক্যান্সারের অবস্থান।’

পাঁচ দিন সার্জিকেল বিভাগের আইসিইউ-তে থাকার পর সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত করা হয় লেখককে। তারও দুদিন পর রিলিজ করে দেয় হাসপাতাল।

কুইন্সে ভাড়া করা একটি দোতলা বাড়িতে ফিরে যান লেখক। কিন্তু অপারেশন সফল হলেও শারীরিক অস্বস্তি কমছিল না মোটেই।

পূরবী বসুর গ্রন্থে যে বিবরণ তা এরকম-
‘হুমায়ূনের খোঁজ নিই প্রতিদিন। শুনি পেটে ব্যথা ও অস্বস্তি। সেটা প্রত্যাশিত, ডাক্তারও বলেছিলেন। আর সেতো হবেই! একই সঙ্গে পেটের দুই জায়গায় এত বড় সার্জারি হয়েছে। ২১শে জুন দুপুরে মাজহার আমাদের রকল্যান্ডের বাড়িতে ফোন করে জানায় হুমায়ূনের কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছে। পেটে ব্যথা তো আছেই এবং সামান্য জ্বর ৯৯.৭ ডিগ্রি। আমি তাকে বললাম হুমায়ূনের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। আমার সঙ্গে কথা বলার পর ওরা হাসপাতালে ফোন করে। কিন্তু ডাক্তার মিলার ছিলেন না। তবে তার সহকারীর সঙ্গে কথা হয়। সহকারী সার্জন জ্যোতি পরামর্শ দেন জ্বর ১০১ ডিগ্রি হলে টাইলেনল দিতে। আর ব্যথা খুব বেড়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে আসতে। এরপর খুব ভোরে মাজহারের ফোনে ঘুম ভেঙে গেল। বলল হুমায়ূনের পেটের ব্যথা বেড়ে গেছে, অস্বস্তি হচ্ছে খুব।’

এরপর হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তার পরিবার ও বন্ধুরা রওনা হন হাসপাতালের উদ্দেশে।

‘পথেই তার এত বেশি খারাপ লাগা শুরু হয় যে সে আর বসে থাকতে পারছিল না। ফলে তারা ৯১১ কল করলে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাম্বুলেন্স আসে। অ্যাম্বুলেন্স তাদের নিকটবর্তী জামাইকা হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যায়। কারণ আমেরিকায় ৯১১ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে ওরা সব সময়েই সবচেয়ে কাছের হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে যায় রোগীকে। আর জামাইকা হাসপাতাল ছিল হুমায়ূনের বাসা থেকে কাছে।’

এর আগে হুমায়ূন আহমেদ চেয়ার থেকে পড়ে যান বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর বের হয়। এ বিষয়টিও এসেছে পূরবী বসুর গ্রন্থে। তিনি লেখেন,

“জামাইকা হাসপাতালের attending সার্জন বললেন, যদিও স্ক্যানে সুনির্দিষ্ট কোন ‘লিক’ দেখা যাছে না অন্ত্রে, কিন্তু পেটে abdominal cavity তে) যথেষ্ট গ্যাস ও তরল পদার্থ জমা হয়েছে। তার মানে লিক আছে কোথাও। এর মাত্র কিছুক্ষণ আগেই আমি(পূরবী বসু) জানতে পেরেছি গতকাল হুমায়ূন তার শোবার ঘরের একটি প্লাস্টিক চেয়ারে বসে ছিল। হঠাৎ ওই প্লাস্টিকের চেয়ারটির পাগুলো বেঁকে গিয়ে মেঝের দিকে বসে যেতে থাকে। চেয়ারে উপবিষ্ট হুমায়ূন ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়তে শুরু করে। সামনেই ছিল শাওন। চেয়ার মাটি ছোবার আগেই সে তাকে দুই হাত দিয়ে ধরে তুলে খাটে নিয়ে বসায়। সেই সার্জন ডাক্তার ঘটনাটির আদ্যোপান্ত শুনে বললেন, তার এখনকার এই অবস্থার সঙ্গে ওই ঘটনার কোন যোগ আছ বলে তিনি মনে করেন না। ডাক্তার আমাদের বোঝান, পেটে (abdominal cavity তে) গ্যাস ও তরল পদার্থ থাকায় তার পেট ফুলে উঠেছে।”

‘...এরপর সে রাতেই হুমায়ূনকে এক ঘণ্টার মধ্যে ইমার্জেন্সি সার্জারি করবে বলে নিয়ে যাবে। সেখানে পেট থেকে গ্যাস ও পানি বের করবে। তা না হলে তার জীবন সংশয় হতে পারে। এছাড়া অন্ত্রের সেই লিকটাও মেরামত করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে যেখান থেকে গ্যাস ও তরল পদার্থ বেরুতে শুরু করেছে ।’

ভালোভাবেই হয় সে সার্জারি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের শারীরিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি।

বইয়ের একটা অংশে পূরবী বসু লিখেছেন, দ্বিতীয় সার্জারির আগের দিন নিউইয়র্ক শহরে একটা গুজব ওঠে যে হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন।

এরপর হুমায়ূন আহমেদ বমি করলে তা ফুসফুসে গিয়ে সংক্রমণ দেখা দেয় এবঙ তার মুখে পাইপ দেয়া হয়, কিন্তু এ নিয়ে তৈরি হয় তার মধ্যে অস্বস্তি।

পূরবী বসুর লেখায়, ‘আমি কাচের দেয়ালের বাইরে থেকে তাকে দেখে ফিরে যাব ভেবে তার ঘরের সামনে আসতেই থমকে দাঁড়াই। দেয়ালের ওপারে ঘরের ভেতর খাটে শুয়ে ছিল হুমায়ূন। হঠাৎ আমি দেখি হুমায়ূন তার দুই হাত দিয়ে তার শরীর থেকে তার সকল নল তার-টার সব খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। অথচ মাত্র কিছুক্ষণ আগে আমরা যখন এখান থেকে যাই, সে গভীরভাবে ঘুমুচ্ছিল। দুদিন আগে ঠিক একই কাজ করেছিল সে। সব কিছু খুলে-টুলে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল।’

পূরবী বসু লেখেন, সেদিনই ডাক্তার জানান, হুমায়ূন ১০০% সাপোর্ট পাচ্ছে ভেন্টিলেটর থেকে। হুমায়ূনের দুই হাতের নিচে লম্বা কাঠের পাত দিয়ে প্লাস্টারের মতো করে বেঁধে দেয়া হয় যাতে সে হাত দিয়ে নাক বা মুখের টিউব খুলে ফেলতে না পারে।

‘পরদিন দুপুরের পরে ডাক্তার মিলার আসেন এবং বর্ণনা করেন- হুমায়ূনের শারীরিক অবস্থা যখন সে প্রথম আমেরিকায় আসে তখন কেমন ছিল, এখানে আসার পর কেমোথেরাপি নিয়ে কতখানি উন্নতি হয়েছিল। তারপর যে সার্জারি করা হল, সেটাও কী রকম সফল হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার কোলন থেকে পরে `লিক' করতে শুরু করে। ফলে ইমার্জেন্সি সার্জারি করে সেই লিক ঠিক করা হয়েছে।’

হুমায়ূন আহমেদের শরীরে নানারকম সমস্যা তখন তার অবস্থা আরও জটিল করে তোলে। পূরবী বসু যেমনটা তুলে ধরেছেন-

‘এরপর একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। এমনিতে হুমায়ূনের ডায়াবেটিস, হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের সমস্যা তো ছিল-ই, ওর বাইপাস সার্জারিও পুরোটা করা সম্ভব হয়নি সিঙ্গাপুরে রক্তনালীর অবস্থা খুব ভালো না থাকায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে সিগারেট খাওয়ার ফলে ফুসফুসের ধারণ ক্ষমতাও খুব বেশি ভালো ছিল না। তার ওপর স্টেজ ফোর ক্যান্সার ও ক্যান্সারের জন্য ১২টি কিমো নেয়া। রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল তার। ফলে অতি সহজেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয় সে। একটার পর একটা জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে তার অস্ত্রোপচার পরবর্তী নাজুক শরীর। আগে তাকে ইন্ট্রাভেনাস খাবার দেয়া হতো। পরে পাইপ দিয়ে পাকস্থলীতে সরাসরি খাওয়ানো শুরু হয়। এর ভেতর হুমায়ূনের আরও একটি অস্ত্রোপচার হয়। সেটা হয়, কেননা দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের পরে তার পেটের মাঝখান দিয়ে যে কাটা হয়েছিল সেটা ঠিকমতো জোড়া লাগছিল না। জোড়া লাগবার পরিবর্তে ক্ষতের দুধারেই স্কার টিস্যু তৈরি হয়ে মাঝখানের কাটা জায়গাটাকে আস্তে আস্তে ফাঁক করে দিচ্ছিল। ফলে আরেকটি অপারেশন করে স্কার টিস্যুগুলো পরিষ্কার করে ফেলে দিয়ে চামড়ার নিচে ম্যাশ বসিয়ে দুদিক একত্র করে কাটা জায়গাটি জোড়া লাগাবার প্রচলিত পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়েছিল। এটা করার আগে পেটের ভেতরের এবসেস, পুঁজ, পানি সব পরিষ্কার করে ফেলে দেয়া হয়েছিল। হুমায়ূনের ডায়াবেটিক শরীর ঘা শুকানোর জন্য অনুকূল ছিল না। কিডনির জন্যও নয়। তারপর এন্টিবায়োটিক চলা সত্ত্বেও তার শরীরে প্রচণ্ড ইনফেকশন থাকার কারণে এক পর্যায়ে কিডনি দুটোও অকেজো হয়ে পড়ে। ডায়ালাইসিসে দিতে হয় তাকে।’

পূরবী বসু লেখেন, ‘... এভাবে হুমায়ূনের শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যেতে থাকে। তবে এরই মাঝে আবার কোন কোন দিন ভাইটাল সাইনগুলো হঠাৎ করে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। অনেক স্বাভাবিক ও সংহত মনে হয় ওর অবস্থা। যেমন হয়েছিল মৃত্যুর আগের দিনও।’

“অবশেষে এলো ১৯ জুলাই।। সেদিন খুব ভোরে ডাক্তার মিলার নিজেই আমাকে মেসেজ পাঠালেন, আমি তাকে ফোন করার আগেই। হুমায়ূনের অবস্থা ভালো নয়, ব্লাড প্রেশার ঠিক রাখা যাচ্ছে না। নিউইয়র্কে হুমায়ূনের স্বজনদের খবরটা দিলাম। পরে আস্তে আস্তে হাসপাতাল থেকে একে একে ফোন পেতে শুরু করলাম। শাওনের, মাজহারের (মাজহারুল ইসলাম), ইয়াসমিনের (লেখক, শিক্ষক জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমিন হক), ডাক্তার মিলারের। একসময় ডাক্তার মিলার লিখলেন, ‘হুমায়ূনের অবস্থা খুব খারাপ। তার স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনরা তাকে ঘিরে চারপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি ভীষণ দুঃখিত’।”

হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা নিয়ে বিতর্ক

মৃত্যুর দুদিন পর হুমায়ুন আহমেদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু একটা সময় হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক দেখা যায়।

হুমায়ূন আহমেদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়- এই অভিযোগে চট্টগ্রামের মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন একজন আইনজীবী। মামলার আবেদনে ‘তাঁর যত্নে অবহেলা করা হয়েছে’ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে বিষয়টিকে হাস্যকর বলে তখন বিবিসি বাংলার কাছে মন্তব্য করেন লেখকের ঘনিষ্ঠ সহচর ও প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, যিনি শেষদিন পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের পাশে ছিলেন।

মাজহারুল ইসলাম বলেন, স্লোন ক্যাটারিং-এ চারটি কেমো নেয়ার খরচ ছিল এক কোটি টাকার ওপরে। এরপরে স্লোন ক্যাটারিং থেকে বেলভিউ হসপিটালে চলে তার চিকিৎসা। চিকিৎসকের পরামর্শে তারা সেখানে যান বলে জানান তিনি। কারণ একই মানের কেমো অনেক কম পয়সায় সিটি হাসপাতালে পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসক।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে যে লেখকের দূরদেশে তার চিকিৎসা এবং মৃত্যু একইসঙ্গে শোকাহত এবং আবেগাপ্লুত করেছে তার অনুরাগী পাঠকদের। সে কারণেও হয়তো অনেকের মনে চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সেসময়। ফলে পূরবী বসুর বইতেও স্থান পেয়েছে কিছু প্রশ্নের যার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন তিনি নিজেও।

পূরবী বসু লিখেছেন, ‘হুমায়ূনের ক্যান্সার সার্জারি টিমের প্রধান ডাক্তারকে (ডাক্তার জর্জ মিলার) বারে বারে আমি প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছি, হুমায়ূনের পরিবার বা হাসপাতালের পক্ষ থেকে এমন কিছু করার ছিল কিনা যা করা হয়নি, করতে পারিনি, করিনি অথবা সময়মত করা হয়নি। কিংবা, এমন কিছু করা হয়েছিল কিনা যা করা ঠিক হয়নি, ভুল হয়েছে, অথবা যার জন্যে কোন ক্ষতি হয়েছে? জবাবে ডাক্তার জর্জ মিলার প্রতিবার পরিষ্কার করে জোর দিয়ে বলেছেন, লিখেছেন (এমন কি মাত্র চারদিন আগেও আমার লিখিত প্রশ্নের জবাবে টেক্সট মেসেজ করে জোর দিয়ে বলেছেন, তার জন্যে যা করা সম্ভব ছিল তার সবই করা হয়েছে। করণীয় কোন কিছু থেকেই বিরত থাকা হয়নি)।’

মাজহারুল ইসলাম জানান, ‘২৯শে জুন থেকে হুমায়ূন আহমেদের ডেলিরিয়াম দেখা দেয়। এটা এমন এক সমস্যা ডাক্তাররা আমাদের বলেছিলেন অনেকদিন হাসপাতালে থাকার ফলে ব্রেনের সেলগুলো ঠিকমতো কাজ করে না, শরীরে খিঁচুনি হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছিল তার। ফিডিং টিউব-নলগুলো খুলে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন। তখন তাকে উচ্চমাত্রার চেতনা-নাশক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। কারণ ঘুমে না থাকলে নল-টিউব তিনি খুলে ফেলতে চাইবেন। কিন্তু ডাক্তাররা বলেন, তিনি কথা শুনতে পাবেন, তাই তার সাথে বেশি বেশি কথা বলতে বলেন চিকিৎসকরা। এর মাঝে তার ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবালও এসে পৌঁছান। এভাবে তিনি ১৯ জুন পর্যন্ত ছিলেন।’

শেষ কথাটি ছিল ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ নিয়ে : মাজহার
প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন তার সাথে হুমায়ূন আহমেদের শেষ কথাটি হয়েছিল তার নির্মিত শেষ চলচ্চিত্রটি নিয়ে। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমা তখন মুক্তির অপেক্ষায়।

মাজহারুল ইসলাম বলেন, “যেদিন থকে উনার ডিলিরিয়াম হয় এবং কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়, তার আগের দিন আমার সাথে উনার শেষকথা যেটি হয়, তিনি আমাকে বলেন তুমি সাগরকে (চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর) ফোন করে বলো ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ছবিটি যেন টেলিভিশন প্রিমিয়ার না দেয়া হয়, এটা যেন সরাসরি সিনেমা হলে মুক্তি দেয়া হয়। এটা সারা বাংলাদেশে একসাথে হলে রিলিজ হবে।”

মাজহারুল ইসলাম জানান, ‘এর পর দিন ফরিদুর রেজা সাগর ভাই ফোন করে জানান, স্যারকে বলো তার ছবিটা আমরা হলে রিলিজ দেবো। কিন্তু ততক্ষণে হুমায়ূন স্যার আর কথা বলতে পারেন না। কিন্তু আমি ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে মোবাইল ফোনটা স্যারের কানে ধরলাম, হয়তো তিনি শুনেছেন।’

হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসাকালীন সময়ের প্রসঙ্গে স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের সাথে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al