২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভুল চিকিৎসার প্রতিকার পেতে যেখানে যাবেন

চিকিৎসা
বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ অনেক, কিন্তু প্রতিকারের ব্যবস্থা কী? - ছবি : বিবিসি

চিকিৎসকদের অবহেলায় চট্টগ্রামে আড়াই বছর বয়সী একটি শিশু মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছে গত কয়েকদিন ধরে।

গত এক সপ্তাহে এরকম অন্তত তিনটি ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ নিয়ে প্রতিকার পাওয়া আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আসলে কী?

গত বছরের অক্টোবর মাসে রক্তবমি হয়েছিলো ভোলার এক স্কুল শিক্ষকের।

চিকিৎসার জন্য পরিবার তাকে ঢাকায় খুব নামকরা একটি হাসপাতালে নিয়ে আসে।

রক্ত বন্ধ করা হলেও চিকিৎসকেরা জানান তার লিভার সিরোসিস হয়েছে। আর তাই লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।

পরিবার তাকে দেশের বাইরে নিয়ে গেলে সেখানে পাওয়া গেলো ভিন্ন ধারণা, বলছিলেন তার ছেলে সৌমিত্র শুভ্র।

‘ওখানে গিয়ে একজন সার্জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি, কারণ বাংলাদেশে লিভার ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট হয় না। তিনি আমাকে বললেন, আমার কাছে কেন এসেছেন? তিনি বললেন, ওনার লিভার সিরোসিস আছে, তবে যে ধরনের জটিলতা থাকলে লিভার ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করা লাগে তা ওনার নেই। এবং উনি আমাদের একজন মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে আমাদের রেফার করেন।’

সৌমিত্র শুভ্র আরো বলছেন, ‘বাবা আর মোটে ৬ মাস বাঁচবেন বলে সময় দিয়েছিলেন বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং অপারেশনের জন্য ৬০ লাখ টাকা লাগবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু ঐ মেডিসিনের ডাক্তার মাত্র ৫৮৫ টাকার ওষুধ লিখে দেন ছয় মাসের জন্য। বাবা এখন ভালো আছেন এবং তার যতটুকু সমস্যা সেটি শক্তভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছেন।’

তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দেশে ফিরে তিনি অভিযোগ করার ব্যাপারে চিন্তা করেছিলেন কিনা। অথবা কিভাবে সেটি করতে হয় সে বিষয়ে কিছু জানেন কিনা।

তিনি বলছিলেন, ‘ডাক্তাররা আসলে তৎক্ষণাৎ রক্তক্ষরণটা বন্ধ করেছিলেন। আমরা তাতেই কৃতজ্ঞ ছিলাম। ডাক্তার বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে যাওয়া সে বিষয়ে নিজেরাই এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারি না। আর আমাদের দেশে কাঠামোটা দুর্বল।’

বাংলাদেশে চিকিৎসকদের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে প্রায়ই রোগীর আত্মীয়স্বজন ও ডাক্তারদের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করার পদ্ধতি রোগীদের জানাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেরা কি করছেন?

জিজ্ঞেস করেছিলাম চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ডা: ইকবাল আরসালানের কাছে।

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশে হাসপাতালে অবহেলার অভিযোগ হলেই লোকজন ডাক্তার বা চিকিৎসার সাথে জড়িত অন্যদের ওপর চড়াও হয়। কারণ মানুষ জানে না তারা বিচারের জন্য কোথায় যাবে। এটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষগুলো নিজেরাই ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে জানাতে পারে।’

কিন্তু অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছে বলে মনে হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আসলে কোথায় যাবেন?

বাংলাদেশে এমন ঘটনার অভিযোগ করার একমাত্র জায়গা সংসদে আইন করে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি। কিন্তু সেই তথ্য সাধারণ মানুষজনের অনেকেরই অজানা।

ডা: আরসালান বলছেন, ‘বিএমডিসির উচিৎ হাসপাতালগুলোতেই এ তথ্য রোগীদের দেয়ার ব্যবস্থা করা। তবে অভিযোগ করার একমাত্র জায়গা হল বিএমডিসির ঢাকা কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশে বহু দরিদ্র মানুষে এতটাই কম আয় যে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা পর্যন্ত যাওয়ার চিন্তাও করেন না।

বিএমডিসির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলছেন, ‘বিএমডিসির কোনো আঞ্চলিক অফিস নেই। আমাদের কাছে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা তার বৈধ প্রতিনিধিও যদি লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসে আমরা তা আমলে নিয়ে বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটি তদন্ত করে ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়।’

কিন্তু জেলা পর্যায়ের ঘটনাগুলো যাতে স্থানীয়ভাবেই তদন্ত করা যায় সেজন্যে কী করা হচ্ছে? সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখবো কি পদ্ধতিতে যেকোনো জায়গা থেকে অভিযোগ করার ব্যবস্থা করা যায়।’

তবে তিনি বলছেন, চিকিৎসকদের ত্রুটি দেখার জন্য সম্প্রতি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে কমিটি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন : শাহনাজ পারভীন, বিবিসি বাংলা

আরো পড়ুন :

ভুল চিকিৎসায় প্রতিবন্ধী হয়েছেন ৪৪ হাজার মানুষ
নয়া দিগন্ত অনলাইন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে দেশে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ প্রতিবন্ধী হয়েছেন। তাদের প্রতিবন্ধী জীবনযাপনের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো সময়ে কোনো চিকিৎসকের হাতে ভুল চিকিৎসা। ভুল চিকিৎসার কারণে প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় নারীর বেশি।

‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, ভুল চিকিৎসার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ প্রতিবন্ধী জীবনযাপন করছে। দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ১৪ লাখ ৫৫ হাজারের কিছু বেশি। এদেরই ৩ শতাংশ ভুল চিকিৎসার কারণে প্রতিবন্ধী। সূত্র : বিবিএস

চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিকের শিশুকন্যার মৃত্যুর অভিযোগ
চট্টগ্রাম ব্যুরো, ৩০ জুন ২০১৮
চট্টগ্রাম নগরের মেহেদিবাগে অবস্থিত ‘ম্যাক্স হাসপাতাল’-এ ভুল চিকিৎসায় শুক্রবার রাতে আড়াই বছরের শিশু রাফিদা খান রাইফার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। রাইফা দৈনিক সমকাল পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর ক্রাইম রিপোর্টার রুবেল খানের একমাত্র মেয়ে।

রুবেল খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘গলাব্যথার কারণে মেয়েটি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। খুবই কষ্ট পাচ্ছিল। শুক্রবার রাতে ব্যথা আরও বেড়ে গেলে পার্শ্ববর্তী বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ভুল চিকিৎসায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অস্বাভাবিক খিঁচুনি দিয়ে আমার রাইফা মারা গেছে।’

অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়ে রুবেল খান বলেন, ভুল চিকিৎসায় যাতে আর কারো বুক এভাবে খালি না হয়।

চকবাজার থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাতে নগরের ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিকের শিশুকন্যার মৃত্যুর অভিযোগ পেয়ে অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করি। ভুল ইনজেকশন পুশ করার কারণে শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তা স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্স।

তিনি বলেন, এরপরই চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা থানায় এসে হুমকি দেয় এই মুহূর্তে আটকদের ছাড়া না হলে চট্টগ্রামের সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়া হবে।

ওসি জানান, তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে আটকদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান ওসি।

এদিকে রাইফার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে রাতভর চকবাজার থানায় অবস্থান করেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। শনিবার ভোরে সাংবাদিক এবং বিএমএ নেতাদের মধ্যে পুলিশের উপস্থিতিতে বৈঠকে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

এই বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মারা যাবে- এটা মেনে নেয়া যায় না। এই ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে আজ শনিবার সকালে সাংবাদিক রুবেল খানের লাভ লেইনস্থ বাসায় গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। রুবেল খান ও তার স্বজনদের কান্নায় সংবাদকর্মীরাও চোখে পানি ধরে রাখতে পারেনি।

ধামইরহাটে অদক্ষ চিকিৎসকের কারণে ৮ গরুর মৃত্যু
ধামইরহাট (নওগাঁ) সংবাদদাতা, ২৭ অক্টোবর ২০১৬
নওগাঁর ধামইরহাটে ভুল চিকিৎসার কারণে কৃষকের আটটি গরু মারা গেছে। আনাড়ি ও অদক্ষ চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে ১১ জন চিকিৎসকের স্থলে মাত্র চারজন দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে প্রাণিচিকিৎসার কাজ চলায় পশু মালিকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে বর্তমানে জনবল সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ১১টি পদ থাকলেও মাত্র চারজন দিয়ে পুরো উপজেলায় পশু চিকিৎসা চলছে। বর্তমানে একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, একজন ভিএফএ, একজন এফএএআই ও একজন পিয়ন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে ভেটেরিনারি সার্জনের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে আনাড়ি চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ১৫ দিনের ব্যবধানে আটটি গরু মারা গেছে। এর মধ্যে চারটি বাছুর ও চারটি গর্ভবতী গাভী রয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০ জন তরুণকে যুব উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাণী সেবার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় লাইন্সেস দেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে উমার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মণ্ডল বলেন, অদক্ষ ও আনাড়ি পশু চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণে কৃষকের অনেক গরু মারা যাওয়ায় তাদের চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মোশারফ হোসেন বলেন, ১১ জনের স্থলে মাত্র চারজন দিয়ে এ উপজেলায় প্রাণী সেবা প্রদান অত্যন্ত দুরূহ কাজ। লোকবলসঙ্কটের সুযোগে অদক্ষ চিকিৎসকরা অনেক সময় ভুল চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং গরু-বাছুর মারা যাচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।


আরো সংবাদ