১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

‘বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশে পঞ্চম’

-

বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। বাস্তুচ্যুত মানুষের কারণে ঢাকার পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে, কমছে সেবার মান। পাশপাশি নগর অর্থনীতিতে বাস্তুচ্যুতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গবেষক দল কর্তৃক পরিচালিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক এক গবেষণার ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার ঢাবির আরআইখান মিলনায়তনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নগর সমস্যা ও
বাস্তুচ্যুত মানুষের নগরে অভিগমন ও অভিযোজন : ঢাকা মহানগরের উপর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ’ শীর্ষক সেমিনারে এই গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ’গোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষণা প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম নাজেম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের নজরুল ইসলাম আরবান স্টুডিও এবং বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনার আয়োজন করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়- নদী ভাঙ্গন, বন্যা, সাইক্লোন, জলাবদ্ধতা ও খরার কারণে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা মহানগরের ২০ শতাংশ এলাকাকে জলবায়ু বিপদাপন্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী। প্রতিবেদনে ঢাকামুখী অভিবাসনের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, গ্রামে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়।

সেমিনারে জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর সমস্যা সমাধানে ৯ টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এগুলো হলো- নগরে দরিদ্র ও বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীও যাতে ভূমি মালিকানার পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা করা; ঢাকা মহানগরকে জলবায়ু সহিষ্ণু করার জন্যে শহরের অর্থনৈতিক শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা, এজন্য শিল্পদক্ষতা, কর্মসংস্থান ও যথাযথ বিনিয়োগ বাড়ানো; নগরের সকল স্টেকহোল্ডার-সরকার ও সুশীল সমাজের মধ্যে যথেষ্ট অর্থবহ সমন্বয় সাধন করে নগর উন্নয়নের কাজ করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর বিশেষ জোর দিয়ে ঢাকার নদীগুলোর সংস্কার, খাল পুনরুদ্ধার এবং নতুন ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি, সংরক্ষণ ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সচল রাখতে হবে; অভিবাসন ব্যবস্থাপনার উপর বিশেষ জোর দিয়ে ঢাকামুখী অভিবাসীদের জন্যে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে যাতে অভিগমণ কম হয়।

সেজন্যে মাঝারি ও ছোট শহরে অবকাঠামো নির্মাণ ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা; জলবায়ু বিপন্ন গ্রামীণ এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে যাতে করে বিপন্নতা কমে আসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নিজ এলাকায় পুনর্বাসিত হতে পারে; গ্রাম-শহর সংযোগ বৃদ্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে বিশেষ করে কমিউনিটিং সুবিধা বাড়াতে হবে যাতে মানুষ শহরে এসে কাজ করে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। এজন্য প্রতিটি জেলাকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে; জরুরি ভিত্তিতে স্বেচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত অভিবাসন নীতিমালা তৈরি করা; এবং সর্বোপরি সুশাসন নিশ্চিত করার সুপারিশ প্রদান করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ ও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপক কান্তি পাল। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি বেশি। গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিসমূহ চিহ্নিত করতে হবে এবং সমাধানের উপায় বের করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিশ্বের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত দেশসমূহের কর্ম-পরিকল্পনাও এক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশ বিষয়ক সার্বিক গবেষণা গতিশীল করতে শিগ্গিরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্রীন হাউজ’ নির্মাণ করা হবে বলে তিনি জানান।


আরো সংবাদ