১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা - ছবি : সংগৃহীত

ঈদের আগে তৈরী পোশাক শিল্প খাতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে চলমান বিক্ষোভ যেকোনো সময় ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকার এবং পোশাক শিল্প মালিকদের এমন আগাম তথ্য দিয়েছে। পূর্বাভাস আমলে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ সক্রিয় করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছরের মতো এবারো ঈদের আগে রাজধানীর আশপাশেসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। সমস্যা হতে পারে এমন প্রায় দেড় হাজার কারখানার তালিকাও তৈরি করেছে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি। সতর্কতা হিসেবে তৈরী পোশাক কারখানা অধ্যুষিত ঢাকার আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে শ্রমিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

জানা যায়, ঘন ঘন চাকরি বদলের প্রবণতা থেকে শ্রমিকদের বিরত রাখতে অধিকাংশ তৈরী পোশাক কারখানায় এক মাসের বেতন দেয়া হয় পরের মাসের ১০ তারিখে। কোনো কোনো কারখানায় এ তারিখ ১২ থেকে ১৫ পর্যন্ত গড়ায়। এ বছর মাসের মাঝামাঝিতে ঈদ হওয়ায় একই সময়ে ঈদ বোনাস পরিশোধের চাপও পড়েছে মালিকপক্ষের ওপর। একই সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে যেসব কারখানা উৎপাদনে নেই তাদের জন্য এবারের পরিস্থিতি অনেক জটিল।

সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতা ও উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অতীতের যেকোনো বছরের তুলনায় এবার বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা বেশি। কারণ এবার ঈদ হচ্ছে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। বেতন-বোনাসের দাবিতে প্রতি বছরই ঈদের আগে পোশাক শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামেন। এবার ঈদের বেশ কিছুদিন আগেই বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে পৃথক মানববন্ধন ও মিছিল-সমাবেশ করে রমজানের ২০ তারিখের (আজ) মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের ঈদের বোনাস ও বকেয়া বেতনভাতা পরিশোধের দাবি অব্যাহত রেখেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন ও টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন। 

সূত্র মতে, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর নিয়মিত উৎপাদনে না থাকাসহ অন্যান্য কারণে ৫৫০ কারখানার সদস্যপদ বাতিল করেছে বিজিএমইএ। আয়-ব্যয়ের সাথে তাল মেলাতে না পারায় ৩০০ কারখানা মালিক পক্ষ নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে। নিয়মিত উৎপাদনে না থাকার কারণে ১৮০ কারখানার সদস্যপদ বাতিল করেছে উদ্যোক্তাদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ। মালিকেরা নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছেন বিকেএমইএভুক্ত ২০০ কারখানা। সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এ পর্যন্ত ২৩২ কারখানা নিজেদের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। এসব কারখানার সাথে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন ক্রেতারা। এ কারখানাগুলো দুই জোটের কোনো ক্রেতারই রফতানি আদেশ পাচ্ছে না। কার্যত এসব কারখানা এখন বন্ধ।
শ্রমিকেরা যাতে ঈদের আগে বেতন-বোনাস পান সে লক্ষ্যে সক্রিয় রয়েছেন উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলোর নেতারা। উদ্যোক্তাদের সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ নেতারা সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সাথে বৈঠক করে নিজেদের উদ্যোগের কথা জানান। বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা বাণিজ্যমন্ত্রীকে নিশ্চয়তা দেন যে, পোশাক খাত শ্রমিকদের মে মাসের বেতন আগামী ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। ১৪ জুনের মধ্যে পরিশোধ করা হবে ঈদের বোনাস। বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকবে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করব। আশা করি শ্রমিকেরা হাসিমুখে বাড়ি যাবেন।

এ দিকে উদ্যোক্তাদের এ ঘোষণা মানতে নারাজ শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, ২০ রোজার মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি আগামী জুলাইয়ের মধ্যে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার টাকা ঘোষণার দাবিও তুলেছেন তারা। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন এ প্রসঙ্গে বলেন, শ্রমিকদের জন্য ঈদ কখনো আনন্দের হয়ে আসে না, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত তাদের কাজ করতে হয়। ২০ রোজার মধ্যে বোনাসটা দেয়া হলে ঈদটা তাদের আনন্দের না হোক অন্তত স্বস্তির হবে। এমতাবস্থায় আমরা শ্রমিকদের বেতন-বোনাস আজ বুধবারের মধ্যে দেয়ার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।


আরো সংবাদ