১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ইসরাইলকে দমানোর পরিকল্পনা তৈরিতে জাতিসঙ্ঘ বিশেষজ্ঞ

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে দখলের যেকোনো চেষ্টা ও পশ্চিম তীরে অবৈধভাবে বসতি নির্মাণে ইসরাইলকে নিবৃত্ত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে তার একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞ দূত মাইকেল লিংক।

লিংক বলেন, স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণে ফিলিস্তিনিদের অভীষ্ট লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বের ক্ষমতাধরদের উচিত ইসরাইলের সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। ‘ইসরাইলের বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সেটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভেবে দেখতে পারে’। ‘এক্ষেত্রে যেসব দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি লজ্জাজনক সেসব দেশে সাধারণভাবে যে পদক্ষেপ প্রয়োগ করা হয় তা বিবেচনায় আনা যেতে পারে’। ‘এটা তাদেরকেই ভেবে দেখতে হবে যে, কোন পদক্ষেপ নিলে কাজ হবে’। আলজাজিরাকে এ কথা বলে লিংক।

লিংকের দাবি, ইসরাইলকে শায়েস্তা করার মতো অনেক ধরনের পথই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে রয়েছে। যেমন, তারা ইসরাইলকে বলতে পারে যদি তুমি দখলদারিত্ব বজায় রাখা বন্ধ না কর তাহলে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় যে সম্পর্ক ও চুক্তি রয়েছে তা বজায় রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।

অধিকৃত অঞ্চলে ইসরাইল যদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখে তাহলে তা ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পথে বড় বাধা। ফিলিস্তিনিরা বলেছে, ইসরাইলের সাথে শান্তি স্থাপন তখন সম্ভব যখন তারা অধিকৃত পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

লিংক একটি গবেষণাপত্র তৈরি করতে জর্দানের রাজধানী আম্মানে সপ্তাহব্যাপী অবস্থান করেন। এ সময় তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আগামী অক্টোবরে লিংক তার গবেষণাপত্র জাতিসঙ্ঘের জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার পরিষদে জমা দেবেন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে জর্দানে ওই কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন লিংক।

লিংক জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফিলিস্তিনের মানবাধিক ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তার কাজ হলো, এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা। এর আগে তার প্রকাশিত একটি তদন্তের কড়া সমালোচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। লিংক ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইউরোপের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ, ইসরাইলের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৪০ শতাংশের বাজার ইউরোপে। এ ক্ষেত্রে ইইউভুক্ত ২৮টি দেশ যদি ইসরাইলি পণ্যের ওপর শর্তারোপ করে তবে সেটি ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়ক হবে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত দু’টি পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন লিংক। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি চাপে ওই দু’টি পরিকল্পনা আটকে আছে। প্রথমত, জেনেভায় জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থা প্রণীত কালো তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা। এ তালিকায় ওই সব ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি নির্মাণ প্রকল্প থেকে লভ্যাংশ পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সাল থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল ও হামাস কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতেরূপ্রতি আহ্বান জানান লিংক। ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগ না করা হলে তারা দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখবে বলে আলজাজিরাকে বলেন লিংক।

তিনি বলেন, আমি জানি না কী করলে আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায় উপলব্ধি করবে যে ইসরাইল তার দখলদারিত্ব থেকে সরে আসবে না।

আর আগে গত মাসে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে লিংক বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর বাইরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত তথাকথিত শতাব্দীর সেরা চুক্তি ব্যর্থ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ প্রকাশের পর এ মন্তব্য করেন তিনি।

বাহরাইনে কুশনার ‘শান্তির জন্য সমৃদ্ধি’ শীর্ষক এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্র একে ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ ঘোষণা করে। এর আওতায় ফিলিস্তিনি অঞ্চল ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোতে পরবর্তী ১০ বছরে পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে শর্ত হলো, ফিলিস্তিনকে এই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে। ট্রাম্পের এ শান্তি পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনিরা।

আন্তর্জাতিক আইন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘মধ্যপ্রাচ্যে শতাব্দীর সেরা শান্তি পরিকল্পনা’ ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন লিংক। লিংক আরো বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক ঐক্যমত একটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান সমর্থন করে। এজন্য ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুসারে পূর্ব জেরুসালেম হবে এর রাজধানী। গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে একটি অর্থপূর্ণ পরিবহন সংযোগের ভিত্তিতে একটি কার্যকর, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


আরো সংবাদ