১৭ নভেম্বর ২০১৮

সন্ত্রাসীদের কাছে রাসায়নিক গ্যাস!

সন্ত্রাসীদের কাছে রাসায়নিক গ্যাস! - সংগৃহীত

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল মুয়াল্লেম বলেছেন, ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় উগ্র সন্ত্রাসীরা রাোয়নিক গ্যাস পেয়েছে এবং সেগুলো তারা নিজেরা ব্যবহার করে সিরিয়ার সরকারের ওপর দোষ চাপাবে।

সম্প্রতি রাশিয়ার আরটি টেলিভিশনের সাথে এক সাক্ষৎকারে মুয়াল্লেম এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ইদলিব প্রদেশের যে এলাকায় কথিত হোয়াইট হেলমেট সেনাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেখানে রাসায়নিক গ্যাসের কন্টেইনার পেঁছে দিতে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা সন্ত্রাসীকে সহায়তা করেছে।

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই পদক্ষেপের অর্থ হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সামরিক অভিযান শুরুর সাথে সাথেই ইদলিবের বেসামরিক লোকজনের ওপর রাসায়নিক হামলা হবে এবং সরকারি সেনাদের ওপর দোষ চাপানো হবে। গত কয়েক মাস ধরে সিরিয়ার সরকার ইদলিব প্রদেশকে  অস্ত্রধারীদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য চূড়ান্তভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। 

এর আগে দুমা ও খান শায়খুন এলাকায় সামরিক অভিযানের সময় সিরিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক হামলার অভিযোগ তোলা হয়।  আগের সব হামলার অভিযোগ সিরিয়ার সরকার নাকচ করেছে এবং ইদলিব অভিযানের আগে থেকেই দামেস্ক ও তার মিত্ররা সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য রাসায়নিক হামলার বিষয়ে বার বার সতর্ক করে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আসছে।

ভয়ঙ্কর রাসায়নিক অস্ত্র ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট

ভয়ঙ্কর রাসায়নিক পদার্থ ‘ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট’ (এস-২ ডিসোপ্রোফিলামিনোথাইল মিথাইল-ফসফোনোথাইয়োলেট) প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সৎ ভাই কিম জং ন্যামকে। বিশেষজ্ঞরা এই বিষাক্ত তরলকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর একটি ফোঁটা কিংবা তারও কম যেকোনো মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।

ত্বকের সংস্পর্শে আসার এক মিনিটের মধ্যেই এটি মানুষের স্নায়ুকে বিকল করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথমে প্রচণ্ড খিচুনি হয়, এরপর স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। স্বচ্ছ, স্বাদ ও বর্ণহীন তৈলাক্ত এই তরল পদার্থটি চিহ্নিত করাও সহজ নয়। দেখতে অনেকটা ইঞ্জিনে ব্যবহৃত তেলের মতো। মারাত্মক বিষাক্ত এই তরল পদার্থ কিভাবে কিম জং ন্যামের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি মালয়েশিয়ার পুলিশ। 

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের বিশেষজ্ঞ ব্রুস বেনেট ধারণা করছেন, কোনো টুকরো কাপড়ে ভিএক্স এজেন্ট লাগিয়ে তা ঘষে দেয়া হতে পারে ন্যামের মুখমণ্ডলে। অথবা কোনোভাবে স্প্রে করা হতে পারে তার মুখে। কাপড়ে লাগানোর পর এই বিষাক্ত তরল ৩০ মিনিট পর্যন্ত কার্যকর থাকে। মালয়েশিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই যে নারী স্পাইকে আটক করা হয়েছে সে বারবার বমি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই স্পাই ভিক্স রাসায়নিক পদার্থ বহন করার ফলে তার এ অবস্থা হয়েছে।

১৯৯৩ সালের জাতিসঙ্ঘ রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনে এটিকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আখ্যা দিয়ে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। 
ন্যাম হত্যা শত্রুদের প্রতি বার্তা সৎ ভাই ন্যামকে হত্যায় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাসায়নিক অস্ত্র ভিএক্স ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুদের একটি শক্ত বার্তাই দিলেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা ও ন্যামের সম্ভাব্য হত্যাকারী কিম জং উন।

ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, পিয়ংইয়ংয়ের কাজ ধামাচাপা দেয়ার চেয়ে টার্গেটের মৃত্যু নিশ্চিত করাই ছিল তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রকাশ্যে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড বর্তমান ও ভবিষ্যতের যেকোনো একনায়কের জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। মার্কিন গবেষক মেলিসা হানহ্যাম বলেন, ভিএক্স রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে হত্যাকাণ্ডে কেন দুইজন আক্রমণকারীকে ব্যবহার করা হয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তারা হয়তো দুই বা ততধিকবার নিহত ব্যক্তির মুখে তরল ঘষে দিয়েছে। আক্রমণকারীরা তরল বহন করার পরও এর প্রভাবে মারা যায়নি। আর যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে রাসায়নিক বহন করাও সহজ।

অতীতে একবার এই রাসায়নিক ব্যবহারের নজির রয়েছে বিশ্বে। ১৯৯৫ সালে জাপানে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। ঘটনার সাত মাস পর প্রকাশ হয় বিষয়টি। ১৯৫০-এর দশকে ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট রাসায়নিক প্রথমবারের মতো সমৃদ্ধ করে ব্রিটেনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৮ সালে ইরাকের কুর্দিদের ওপর সাদ্দাম হোসেন এ বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদও ভিএক্সসহ বেশ কিছু রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ করেছিলেন। তবে ২০১৩ সালে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির পর তিনি তা থেকে সরে আসেন। অবশ্য পরে সিরিয়ার একটি এলাকায় এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করে প্রাণঘাতী রাসায়নিক প্রয়োগে ন্যামের হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করা যায় ব্রিটেনে নিহত রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার লিতভিনেনকোর হত্যাকাণ্ডের সাথে। ২০০৬ সালের নভেম্বরে দুর্লভ তেজস্ক্রিয় বিষ পোলোনিয়াম-২১০ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করে অজ্ঞাত আততায়ীরা। দশ বছর পর এক তদন্তে জানা গেছে, ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশে সম্ভবত রুশ গোয়েন্দারাই তাকে হত্যা করেছে। মেলিসা হানহ্যাম বলেন, দুটো তদন্তই অন্তত কঠিন। দুটো হত্যাকাণ্ডই খুব জটিল পদ্ধতির এবং প্রতিপক্ষকে বার্তা পাঠানোর জন্য।

যদিও উত্তর কোরিয়া বলছে, তাদের কোনো রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ নেই, তথাপি ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পর তৃতীয় বৃহত্তম মজুদই তাদের। যদিও রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর ১৯৯৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তাদের মজুদ কমিয়ে আনছে। জাতিসঙ্ঘের ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি উত্তর কোরিয়া। ২০১২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাঁচ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত রাসায়নিক অস্ত্র থাকতে পারে উত্তর কোরিয়ার কাছে, যার বেশির ভাগই ভিএক্স ও সারিন।

গার্ডিয়ান ও বিবিসি


আরো সংবাদ