২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনী লড়াইয়ে নেমেছে ইরান

হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত মোহসেন মোহেবি (বামে) - সংগৃহীত

ইরানের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে লড়াইয়ে নেমেছে দেশটি।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জুলাইয়ের শেষে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করে। গতকাল সোমবার থেকে নেদারল্যান্ডের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিজেতে যুক্তিতর্কে অংশ নিচ্ছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আজ মঙ্গলবার দেশটির পক্ষ থেকে যুক্তিতর্ক পেশ শুরু হবে।

অনুমান করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবীরা এ মর্মে যুক্তি পেশ করবেন যে, এ বিরোধে জাতিসঙ্ঘ আদালতের হস্তক্ষেপের কোনো এখতিয়ার নেই। কেননা দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত বন্ধুত্ব চুক্তি আর বহাল নেই। তা ছাড়া তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা আরোপে ওই চুক্তির লঙ্ঘন হয়নি।

চার দিন ধরে মৌখিক যুক্তিতর্ক পেশ করা হতে থাকবে এবং এক মাসের মধ্যে একটি রায় হবে বলে আশা করা যায়। আইসিজে জাতিসঙ্ঘের একটি ট্রাইব্যুনাল, যা আন্তর্জাতিক বিরোধের নিষ্পত্তি করে। এই ট্রাইব্যুনালের রায় মেনে চলা সদস্য দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। তবে রায় কার্যকর করার ক্ষমতা নেই ট্রাইব্যুনালের। তা ছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক উপেক্ষা করার নজির রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশটির ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিল করে। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি বাতিল করে ইরানের ওপর আবারো কঠোর অবরোধ আরোপ করে। নভেম্বরের প্রথম দিকে দ্বিতীয়বারের মতো আরোপিত এ অবরোধ কার্যকর হতে যাচ্ছে। আর এ অবরোধের লক্ষ্য ইরানের তেলসম্পদ ও জ্বালানি খাত। আইসিজেতে মামলাটি দায়েরের সময় তেহরান বিচারকদের প্রতি অবিলম্বে অবরোধ তুলে নিতে নির্দেশ দেয়ার আহ্বান জানায়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদপে নেয়ার অধিকার নেই উল্লেখ করে তেহরান এর জন্য তিপূরণও দাবি করে।

তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন। দেশটি ১৯৫৫ সালে স্বারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

উল্লেখ্য, চুক্তিটি ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের আগে স্বাক্ষরিত হলেও আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এখনো চুক্তিটি টেনে আনা হয়।

এদিকে গত ৬ আগস্ট আরেক দফায় ইরানের ওপর পারমাণবিক কার্যক্রমসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। ইউরোপীয় ও অন্য বিদেশী কোম্পানিগুলো যাতে ইরানের সাথে ব্যবসা করতে না পারে এবং তেহরানের তেল বিক্রি বন্ধ করার লক্ষ্যে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)। ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। ২০১৫ সালের ওই পরমাণু চুক্তির অংশ হিসেবে থাকা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এ মার্কিন সিদ্ধান্তে ‘গভীর দুঃখ প্রকাশ’ করে। সব পকে চুক্তির প্রতিশ্রুতি মেনে পদপে নেয়ার অনুরোধ করে তারা।

ট্রাম্পের সই করা এক নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী নিম্নোক্ত খাতে পুনর্বহাল হবে নিষেধাজ্ঞা : ইরান সরকারের মার্কিন ডলার কেনা বা সংগ্রহ, স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু কেনাবেচার ক্ষেত্রে, গ্রাফাইট, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, কয়লা ও শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের আমদানি, ইরানি রিয়ালসংক্রান্ত লেনদেন, ইরানের সার্বভৌম ঋণ খাত, মোটরযান খাত, বন্দরকার্যক্রম, জ্বালানি, জাহাজ ও জাহাজ নির্মাণসংক্রান্ত খাত, পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেলসংক্রান্ত লেনদেন এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে বিদেশী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক লেনদেন।

৬ আগস্ট সোমবার রাত থেকে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হয়। এ নিষেধাজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু ইরানের তেলশিল্প, যেটি দেশটির অর্থনীতির প্রাণ। দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর সামগ্রিক একটি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে নভেম্বর থেকে।

এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেছেন, এ নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের কঠোর পরিণতি বইতে হবে বলেও সতর্ক করেন।

সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করে যাওয়া এ চুক্তি ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প পুরোপুরি স্থবির করতে যথেষ্ট ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের আক্রমণাত্মক আচরণ বন্ধ করতেও এ চুক্তি ভূমিকা রাখেনি।

এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আশা করব সব রাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নেবে, যার ফলে ইরানের সামনে যেকোনো একটি পথ খোলা থাকে, হয় তারা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করা ও বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ কার্যক্রম বন্ধে করে বিশ্বের অর্থনীতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবে, অথবা সারা বিশ্ব থেকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র আপত্তি দেখিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)। সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা এমনকি ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনার সাথে সাংঘর্ষিক বলেও আখ্যা দিয়েছেন। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করতে ও ইরান পারমাণবিক চুক্তি অক্ষুন্ন রাখতে পদপে বৃদ্ধি করারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ইইউ।

ইইউ ও ইউরোপের তিন শক্তিধর দেশ জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইরান পারমাণবিক চুক্তি অক্ষুন্ন রাখতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজের শক্তিশালী ন্যাটো তিন মিত্রের সাথে সরাসরি বিরোধে জড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়েই বিরোধ দেখা গেছে। তবে ইরান চুক্তি নিয়ে মতদ্বৈততা ছাড়িয়ে গেছে সব কিছুকে। মে মাসে ট্রাম্প যখন এককভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন, তখন ইউরোপের তিন দেশসহ চুক্তির অবশিষ্ট দুই অংশীদার রাশিয়া ও চীন বারবার চুক্তি অক্ষুন্ন রাখতে স্ব-অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। দেশগুলো বলেছিল, আন্তর্জাতিক আণবিক জ্বালানি সংস্থা বারবার পরিদর্শন করে জানিয়েছে ইরান চুক্তি মেনে চলছে।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme