২০ নভেম্বর ২০১৮

ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাব : ইরানের কঠিন শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি - ফাইল ছবি

ইরানের নেতাদের সাথে কোন পূর্ব শর্ত ছাড়াই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের প্রস্তাবে আস্থা রাখতে পারছে না তেহরান। তারা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই আকস্মিক প্রস্তাবের ওপর ভরসা করা যায় না। তাই কোন কোন কর্মকর্তা বলছেন, ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরলেই কেবল আলোচনা হবে তেহরান-ওয়াশিংটন।  কিন্তু এই কঠিন শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হবে এমনটা ভাবা কঠিন। আবার মার্কিন পরারাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেও উল্টো ইরানকেই কিছু শর্ত দিতে চান আলোচনায় বসার জন্য।

হুমকি দেয়ার এক সপ্তাহের মাথায় গত সোমবার সবাইকে অবাক করে দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাথে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর তিন মাস আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন ইরানের সাথে ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাশেমি পরদিন মঙ্গলবার বলেছেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের সাথে তার প্রস্তাবের কোন মিল নেই। ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি একথা বলেন। এছাড়া ইরানের সাথে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রক্ষা করছে যেসব দেশ তাদেরকেও চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

বাহরাম কাশেমি বলেন, ‘একদিকে নিষেধাজ্ঞা ও চাপ দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সংলাপের প্রস্তাব। দুটি বিষয় এক সাথে হতে পারে না। গতরাতে দেয়া তার প্রস্তাব প্রকৃতপক্ষেই আলোচনার জন্য দেয়া হয়েছে সেটি তিনি ইরানিদের কিভাবে বিশ্বাস করাবেন। এটি যে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে করেননি তার প্রমাণ কী’।

ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী মোতাহারি বলেছন, ট্রাম্প ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আবার আলোচনার এই প্রস্তাব আমাদের জন্য অপমানকর। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যদি পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে না যেতেন এবং ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতেন তাহলে তার সাথে আলোচনায় বসতে কোন সমস্যা ছিলো না।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির প্রধান হাশমতুল্লাহ ফালাহতাপিশেহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরে আসলেই কেবল ইরান তার সাথে আলোচনায় বসতে পারে। আর ইরানের পররাষ্ট্র বিষয়ক কৌশন নির্ধরণী পরিষদের প্রধান কামাল খারাজি মনে করেন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব অর্থহীন।

অন্যদিকে দেশটির প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আলী আকবর নাতেঘ নুরি মনে করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা উচিত নয় ইরানের। তিনি বলেন, তার উদ্দেশ্য কী সেটি নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। এই প্রস্তাবে খুশি হওয়া বা উত্তেজিত হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।

পম্পেওর উল্টো সুর
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিঃশর্ত আলোচনার প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর কণ্ঠে ভিন্ন সুর। তিনি বলেছেন, এ ধরনের কোন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে গেলে অবশ্যেই আমদের কিছু দাবি পূরণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রর টিভি চ্যানেল সিএনবিসি নিউজ জানিয়েছে, ইরানের সাথে নতুন একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে পম্পেও হয়তো নতুন করে ১২টি শর্ত দিয়ে বসতে পারেন।

পম্পেও বলেন, ‘ইরান তার নিজ দেশের জনগনের সাথে যে আচরণ করে তাতে পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার না করলে, আগ্রাসী আচরণ পরিবর্তন না করলে, প্রকৃত পারমাণবিক নিরস্ত্রকরণে সক্ষম একটি চুক্তিকে সম্মত হলেই কেবল প্রেসিডেন্ট তাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন’।

আরো পড়ুন : তেলের বিনিময়ে সোনা নেবে ইরান!

আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে সোনার বিনিময়ে জ্বালানি তেল ও তেলজাত পণ্য বিক্রি করবে ইরান। তেহরানের বিরুদ্ধে যখন মার্কিন সরকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে তখন অন্য দেশের সঙ্গে ইরান নিজের বাণিজ্য ঠিক রাখার জন্য এমন চিন্তা করছে।

ইরান-আফ্রিকা কাউন্সিল ফর ইকনোমিক কোঅপারেশনের সভাপতি হাসান খোশরুজেরদির বরাত দিয়ে ইরানের গণমাধ্যম এ খবর দিয়েছে। তিনি মনে করেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে; সেই চ্যালেঞ্জ এড়ানোর জন্য পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এমন বিনিময় হতে পারে বলে তিনি জানান।


রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত একটি ফোরামে খোশরুজেরদি এসব কথা বলেন। ওই ফোরামে যোগ দিয়েছে কেনিয়া, আলজেরিয়া, আইভরিকোস্ট, মৌরিতানিয়া ও ঘানা। তিনি বলেন, যখন নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসছে তখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো সমাধান।

খোশরুজেরদি বলেন, আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ইরান সোনা নেয়ার বিষয়ে আগ্রহী। এছাড়া, গোশত ও কৃষিজাত পণ্য নিতেও আগ্রহী ইরান। তবে পণ্যের বিনিময়ে বাণিজ্য করার জন্য তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। ঘানা হচ্ছে আফ্রিকার দ্বিতীয় প্রধান স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ এবং এটা হতে পারে ইরানের প্রধান টার্গেট। এর আগের রিপোর্ট অনুসারে ঘানাতে বিপুল পরিমাণ তেল ও তেলজাত পণ্য রপ্তানি করছে ইরান।

আরো পড়ুন : ইরানকে ঠেকাতে ‘আরব ন্যাটো’ গড়ছে যুক্তরাষ্ট্র

উপসাগরীয় ছয় দেশ এবং মিসর ও জর্দানকে নিয়ে নতুন একটি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধিতাসহ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর সহযোগিতা বাড়াতে চাচ্ছে হোয়াইট হাউজ। চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল শনিবার এ তথ্য জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন কর্মকর্তারা সুন্নি মুসলমানদের দেশগুলোর এই পরিকল্পনাকে আপাতত আরব ন্যাটো নামে ডাকছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর দুই দেশের মধ্য উত্তেজনা বেড়েই চলছে। পরীক্ষামূলক এর নাম দেয়া হয়েছে মিডলইস্ট স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স (এমইএসএ)। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা, আরব ন্যাটো নিয়ে আলোচনা করতে আগামী ১২ ও ১৩ অক্টোবর ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলনেরও আয়োজন হতে পারে। জোটের এ ধারণাটি কাজ করছে উল্লেখ করে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, এর জন্য মাত্র কয়েকটি মাস বাকি আছে।

গত বছরে সৌদি আরবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরকে সামনে রেখে দেশটির কর্মকর্তারা একটি নিরাপত্তা চুক্তির কথা বলেছিল। সেখানে ট্রাম্প একটি বড় ধরনের অস্ত্র চুক্তির কথা বলেছিলেন। তবে সেখানে এ ধারণার যাত্রা হয়নি বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র বলেন, ইরানি আগ্রাসন, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এমইএসএ ইস্পাত কঠিন দেয়াল হিসেবে কাজ করবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতাও নিয়ে আসবে। তিনি বলেন, মধ্য অক্টোবর নাগাদ বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। 

আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা

এর আগের মার্কিন প্রশাসনগুলোও এ ধরনের জোট গঠন করতে চেয়েছিল। তবে নানা কারণে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। 
ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও আবু ধাবি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জন্য সব সময়ই ইরানকে দায়ী করে থাকে। তাদের অভিযোগ নিজেদের সৈন্য পাঠানো অথবা কখনো সমর্থন দান বা প্রক্সি গ্রুপের মাধ্যমে এবং ইসরাইলকে অবিরাম হুমকি দেয়ার মাধ্যমে তারা আরবে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রেখেছে। 

মূলত এ জোট গড়ে উঠবে উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরবের জোরপ্রচেষ্টার ভিত্তিতেই। আর সে ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। ইরানের মোকাবেলায় এ জোট কিভাবে কাজ করবে তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে সুন্নি মুসলিমদের এ মিত্রদের সাথে একই সাথে কাজ করেছে ইয়েমেন ও সিরিয়ায়। এমনিভাবে উপসাগরীয় বাণিজ্য রুটেও তারা একসাথে কাজ করেছে। 
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বাড়ানোর এ প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা এ অঞ্চলে আরো উত্তেজনাই বৃদ্ধি করবে। তিনি বলেন, নতুন এ প্রচেষ্টা কোনো সফলতাই বয়ে নিয়ে আনবে না। কেননা, ইরান ও তার মিত্রদের মধ্যকার সম্পর্কে যে গভীরতা, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আর রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের মতো নয়। 

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার আশঙ্কা 
এ দিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ অস্ট্রেলিয়া। এমনকি এই হামলা আগামী মাসেও হতে পারে বলে অস্ট্রেলিয়া সরকার ধারণা করছে। দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তাদের বরাতে এ খবর দিয়েছে এবিসি নিউজ। খবরে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়া সরকার ইরানে হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ভূমিকা থাকতে পারে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও।

তবে অস্ট্রেলিয়ার একজন সিনিয়র নিরাপত্তা সূত্র বলেছেন, এর মানে এই নয় যে সংক্ষিপ্ত এই মিশনে অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় সম্পৃক্ততা থাকবে। সঠিক গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্লেষণ সরবরাহ করা আর মিশনে অংশ নেয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে এবিসি নিউজের এ খবর অস্বীকার করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টার্নবুল ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস। এবিসি নিউজরে খবর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে টার্নবুল বলেন, এ ধরনের হামলা হবে বলে বিশ্বাস করার কোনো যুক্তি নেই। তেমনি এ সম্পর্কে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। এবং সত্যি কথা বলতে এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও কল্পকাহিনী।’


আরো সংবাদ