২৩ অক্টোবর ২০১৮

ইরান-সৌদি ছায়াযুদ্ধ : ইয়েমেনে হোদায়দা বন্দরে ভয়াবহ হামলা

ইরান-সৌদি ছায়াযুদ্ধ : ইয়েমেনে হোদায়দা বন্দরে ভয়াবহ হামলা - ছবি : সংগৃহীত

হোদায়দা বন্দরে সৌদি জোটের হামলা ইয়েমেন যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু


ইয়েমেনের প্রধান বন্দর শহর হোদায়দায় গতকাল বুধবার থেকে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সৈন্যরা। এই ব্যাপক হামলা উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের গত তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের সূচনা করেছে। 
লোহিত সাগরের এই বন্দরটির দখল নেয়ার জন্য ইয়েমেনি সৈন্যরা হোদেইদার দেিণ অবস্থান নিয়ে অভিযান শুরু করেছে, তাদের সমর্থন জোগাতে জোট বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো ও যুদ্ধজাহাজগুলো শহরটির হাউছিদের অবস্থানগুলো ল্য করে হামলা শুরু করেছে। এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্বাসিত সরকারের গণমাধ্যম দফতর।

হোদায়দা বন্দরটি জোট বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়ার জন্য হাউছিদের একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সৌদি জোটের অন্যতম অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত; সেটি পার হওয়ার পরপর আক্রমণ শুরু করা হয়। ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় বন্দর হোদায়দা হাউছিদের এলাকার মধ্যেই অবস্থিত। ইয়েমেনের বেশির ভাগ পণ্য এই বন্দর হয়েই দেশটিতে প্রবেশ করে।

দেশটির নির্বাসিত সরকার পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী মিলিশিয়াদের কবল থেকে ইয়েমেনকে পুনরুদ্ধারে আমাদের সংগ্রামের একটি মোড় ফেরানো ঘটনা হবে হোদায়দা বন্দরকে মুক্ত করা। এই বন্দর মুক্ত করার মধ্য দিয়ে হাউছি মিলিশিয়াদের পতন শুরু হবে, এর মাধ্যমে বাবুল মানদাব প্রণালীতে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ হবে এবং ইরানের হাত কাটা পড়বে। এই দেশটি দীর্ঘ দিন ধরে ইয়েমেনকে অস্ত্রে ডুবিয়ে দিয়েছে যা ইয়েমেনিদের রক্ত ঝরাচ্ছে।’
২০১৫ সালে পশ্চিমা সমর্থিত আরব দেশগুলোর সামরিক জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে যোগ দেয়ার পর থেকে এই প্রথম দেশটির সুরতি একটি প্রধান শহরের দখল নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে রাজধানী সানা দখল করে রাখা হাউছিদের সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দিয়ে তাদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করার ল্য জোট বাহিনীর।

এর আগে জাতিসঙ্ঘ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিল, সৌদি আরব জোট ইয়েমেনের হোদায়দা বন্দর দখলের ল্েয হামলা চালালে আড়াই লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। ইয়েমেনে জাতিসঙ্ঘের মানবিক ত্রাণ বিষয়ক সমন্বয়কারী লিস গ্রান্ডে এক বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি জানান। তিনি বলেন, হোদায়দার ওপর সামরিক হামলা কিংবা অবরোধ সেখানকার লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের প্রাণকে বিপন্ন করে তুলবে। লিস গ্রান্ডে আরো বলেন, গোদাইদায় দীর্ঘ যুদ্ধ হলে সেখানকার ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ তাদের প্রাণসহ সর্বস্ব হারাবে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের মুখপাত্র গত মঙ্গলবার জানান, ওই জোটের সেনারা হোদায়দা বন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তবে ওই জোট বন্দরটি দখলে নেয়ার জন্য এখনই হামলা চালাবে কি না তা ওই মুখপাত্র বলেননি। ওই দিনই জাতিসঙ্ঘের ইয়েমেনবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী মার্টিন গ্রিফিথস হোদায়দা বন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

ইয়েমেনে সরকার-বিদ্রোহী লড়াইয়ে নিহত ৬০০
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

ইয়েমেনে সরকারি সেনা ও হাউছি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষে গত কয়েক দিনে ছয় শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তারা গত সোমবার এ কথা জানান। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হাউছি বিদ্রোহীদের সাথে লড়াই করতে করতে পশ্চিম উপকূল বরাবর এগিয়ে যাচ্ছে। 

লড়াই দেশটির হোদেয়দার রেড সি বন্দরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ বন্দরটি ইয়েমেনের খাদ্য ও ওষুধ আমদানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। দেশটির সেনা সূত্র জানায়, গত সাত দিনে লড়াই এবং অবরোধে বিদ্রোহী হাউছি গোষ্ঠীর ২০ জন ফিল্ড কমান্ডারসহ কমপক্ষে ২৫০ জন নিহত হয়েছে। এ সময় ১৪৩ জনকে আটক করা হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, লড়াইয়ের তীব্রতায় স্থানীয় বহু পরিবার পালিয়ে গেছে। 

গত সপ্তাহে হাউছিরা দাবি করেছিল, তারা আল হুদায়দা প্রদেশে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ৭০ জন ইয়েমেনি সৈন্যকে হত্যা করেছে। কিন্তু ইয়েমেনের সেনা সূত্র জানায়, সেখানে মাত্র ১৯ সেনা নিহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে লড়াইরত সব পক্ষের কাছে ইয়েমেনের সাধারণ নাগরিকদের মানবিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত সোমবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র খুব নিকট থেকে হোদেয়দার অবস্থার উন্নতি লক্ষ করছে এবং দেশটির সাধারণ নাগরিকদের কাছে মানবিক সাহায্য এবং জীবনরক্ষাকারী জিনিসপত্র আমদানির সুযোগ দিতে নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানায়।

গত শুক্রবার জাতিসঙ্ঘ সতর্ক করে দেয় যে, হোদেয়দাতে কোনো সামরিক হামলা বা অবরোধের মতো ঘটনা ঘটালে তা সেখানে বসবাসরত ৬ লাখ বেসামরিক লোকের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। ডক্টর উইদাউইট বর্ডারস গত সোমবার জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ হাজ্জার একটি কলেরা হাসপাতাল ধ্বংস করে দেয়। ইরান সমর্থিত হাউছিদের সাথে ইয়েমেন সরকারের লড়াই শুরু হয় ২০১৫ সালের মার্চে। তিন বছর ধরে এ গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বাস্তুচুত হয়েছে ত্রিশ লাখ লোক।

এ লড়াইয়ে ইয়েমেনের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। জাতিসঙ্ঘ ইয়েমেনকে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক সঙ্কটে পড়েছে। দুই কোটি বাইশ লাখ লোকের বেশির ভাগেরই সহায়তা প্রয়োজন। গত এক বছরে সেখানে অপুষ্টি, কলেরাসহ অন্যান্য রোগে হাজার হাজার লোক মারা গেছে।


আরো সংবাদ