১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

কিছু দেশে এমন নেতা রয়েছেন যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার যোগ্য নন, এরা জনগণের ক্ষতি সাধন করেন : ইরান

কিছু দেশে এমন নেতা রয়েছেন যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার যোগ্য নন, এরা জনগণের ক্ষতি সাধন করেন : ইরান - সংগৃহীত

ইরান সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মাদ বাকের নোবাখত বলেছেন,  কিছু কিছু দেশে এমন কয়েকজন নেতা রয়েছেন যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার যোগ্য নন; এরা শুধু নিজের জনগণের ক্ষতি সাধন করেন।

তিনি আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির ভাগ্য নিশ্চিত নয়। আমি জানি না উত্তর কেরিয়ার নেতা কার সঙ্গে আলোচনা করছেন। এর কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, কিম জং উন দেশে ফেরার আগেই ট্রাম্প এই চুক্তি লঙ্ঘন করবেন না।

সিঙ্গাপুরে মঙ্গলবার ট্রাম্প ও কিম শীর্ষ বৈঠকের পর একটি চুক্তিতে সই করেছেন যাতে বলা হয়েছে, দু দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। অন্যদিকে, কোরিয় উপদ্বীপকে পরিপূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য উত্তর কোরিয়া এ চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়া যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নোবাখত। ট্রাম্প মার্কিন জ্ঞানী লোকদের প্রতিনিধিত্ব করেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সে কারণে আমেরিকার জনগণের অবশ্যই উচিত হচ্ছে- আগামী নির্বাচনে ট্রাম্প থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেয়া। 

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, ২০১৫ সালে পাশ্চাত্যের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা তার দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারলে তেহরান ওই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাবে। মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এক টেলিফোনালাপে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে একতরফা ও বেআইনিভাবে বেরিয়ে যাওয়ার একমাস পর এ টেলিফোন সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। এতে রুহানি ম্যাক্রোঁকে বলেন, ইরান যদি এ সমঝোতার সুবিধাগুলো ভোগ করতে না পারে তাহলে এটি বহাল রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আমেরিকা বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ইরানের পরমাণু সমঝোতা রক্ষা করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা কাজে পরিণত করার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট রুহানি। তিনি বলেন, অন্যের একরোখা ও চুক্তি ভঙ্গকারী তৎপরতা যাতে এই মহা কূটনৈতিক সাফল্যকে ধ্বংস করতে না পারে সেজন্য আমাদের চেষ্টা চালানো উচিত।

টেলিফোনালাপে ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা রক্ষা করার জন্য প্যারিস সম্ভাব্য সব রকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আমেরিকা বেরিয়ে যাওয়ার কারণে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে দেয়ার জন্য ইউরোপ যেসব পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তার একটি ফিরিস্তি তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে গঠিত ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরান পরমাণু সমঝোতা সই করে। ওই সমঝোতায় ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে নিজের পরমাণু তৎপরতায় সীমাবদ্ধতা আনতে সম্মত হয় তেহরান।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮ মে এ সমঝোতা থেকে একতরফাভাবে তার দেশকে বের করে নেন। এরপর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি এ সমঝোতা রক্ষা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ইরানকে সমঝোতা থেকে বেরিয়ে না যাওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিজেদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো।

অন্যদিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্য যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ কারণে একাধিক বৈঠকে বসেও তারা কোনো সমাধানে আসতে পারেনি। মতপার্থক্যের জেরে আমেরিকাকে ছাড়াই জি-সেভেনের বিবৃতি প্রকাশের ব্যাপারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি বলেছেন, আমেরিকার এই একগুঁয়ে নীতি অযৌক্তিক, অগঠনমূলক এবং বাস্তবতার পরিপন্থী। তবে একই সঙ্গে তিনি বিবৃতিতে উল্লেখিত ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অযৌক্তিক দাবিকে তার দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি কয়েকটি বলদর্পী ও স্বৈরাচারী দেশের ইরানভীতি ও ইরানবিদ্বেষ ছড়ানোর ফাঁদে পা না দেয়ার জন্য জি-সেভেনের সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জি-সেভেন নেতারা যদি সত্যিই বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চিন্তিত হয়ে থাকেন তাহলে তাদেরকে এই দুশ্চিন্তার কারণ অন্যত্র খুঁজতে হবে। ইরান প্রমাণ করেছে, তারা কেবল মুখের কথা কিংবা বিবৃতিতে নয় বরং বাস্তবে ও কাজেকর্মে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সরকারের অব্যাহত স্বেচ্ছাচারী নীতিই বরং বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি সৃষ্টি করেছে।

নিঃসন্দেহে, আমেরিকা ও শিশু হত্যাকারী দখলদার ইসরাইলের মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জি-সেভেন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপমূলক বিবৃতি দিয়েছে। বৈঠককে প্রভাবিত করার জন্য অনেক আগে থেকেই ইরান বিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছিল। ইরানকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে অথচ মধ্যপ্রাচ্যের জাতিগুলো বিশেষ করে গাজা, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া, বাহরাইন ও লেবাননের জনগণ ইসরাইল ও সৌদি আরবের আগ্রাসনের শিকার। এ ছাড়া, ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হলেও আমেরিকা, ফ্রান্সসহ জি-সেভেনের অন্যান্য দেশের সাহায্য ও সমর্থন রয়েছে দখলদার এই শক্তির প্রতি।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি যে শান্তিপূর্ণ সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। পরমাণু সমঝোতার আগে আইএইএ'র ৩০টি প্রতিবেদন এবং এরপর প্রকাশিত ১১টি প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে সন্দেহ করা কিংবা একে হুমকি হিসেবে তুলে ধরারও কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে আমেরিকা এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। খ্যাতনামা মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি বলেছেন, আমেরিকা ইরানকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বিপদজনক দেশ বলে অভিহিত করেছে। অথচ ইরানের অপরাধ হচ্ছে দেশটি কখনো মার্কিন আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করেনি।

 


আরো সংবাদ