২৪ জুন ২০১৮

আল-আকসায় একসাথে নামাজ পড়লেন তিন লাখ ফিলিস্তিনি

আল-আকসায় একসাথে নামাজ পড়লেন তিন লাখ ফিলিস্তিনি - সংগৃহীত

একসাথে প্রায় তিন লাখ ফিলিস্তিনি নামাজ আদায় করলেন পবিত্র নগরী জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদে। রমজানের শেষ শুক্রবার আল-আকসায় জুমার নামাজ আদায় করেন এই বিপুল সংখ্যক মানুষ।জর্ডান পরিচালিত ইসলামী ওয়াকফ মসজিদটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার নামাজে প্রায় তিন লাখ লোক উপস্থিত ছিলেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরুসালেমে ৪০ বছরের কম বয়সী ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরাইল। গত টানা চার সপ্তাহ ধরে ফিলিস্তিনিদের সেখানে ইসরাইলি বাহিনী প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

এমনকি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে কোনো ফিলিস্তিনিকে শুক্রবারের নামাজে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। পুরো জেরুসালেমে ইসরাইলি নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। শুক্রবারের নামাজ আদায়কে কেন্দ্র করে ওল্ড সিটিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে ইসরাইল।

খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম এই তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত জেরুসালেম। ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থাপনাও জেরুসালেমে। গত কয়েকদশক ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পবিত্র এই নগরী।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলে নেয় ইসরাইল। তবে ইসরাইলের এই দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর পবিত্র এ নগরীকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ ঘোষণার দেয়ার পর ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়।

চলতি বছরের ১৪ মে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে গাজায় নিহত হয়েছিল অর্ধশতাধিক। এছাড়া আহত হয়েছিলেন দেড়হাজারের বেশি মানুষ। 

আল-আকসা মসজিদ গুড়িয়ে দেবে ইসরাইল!
মিডল ইস্ট মনিটর, আল জাজিরা ও আল মানার ডটকম

বেপরোয়া হয়ে পড়েছে ইসরাইল। একর পর এক স্বপ্ন পূরণের দিকে ছুটছে দেশটি। ইতোমধ্যেই জেরুসালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদবিহীন একটি পোস্টার নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রাইডম্যান। 

তেল আবিবের কাছেই অবস্থিত ইসরাইলি শহরে ডেভিড ফ্রিডম্যানের সফরে তার হাতে ছবিটি তুলে দেন আচিয়ার এক কর্মকর্তা। সমালোচকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদকে গুড়িয়ে দেয়ার ইসরাইলি পরিকল্পনা সামনে আসলো।

অথচ ফিলিস্তিনের আল আকসাকে মুসলমানদের পবিত্র স্থান বলে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কোও। ১৩ অক্টোবর পাসকৃত এক প্রস্তাবনায় বলা হয়, জেরুসালেমের আল আকসা মসজিদের ওপর ইসরাইলের কোনো অধিকার নেই, আল আকসা মুসলমানদের পবিত্র স্থান।

এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য ও বিশ্বসমাজে সর্বজনবিদিত বিষয়ও। যদিও এটিকে সিনাগগ বা ইহুদি মন্দির দাবি করে ইসরাইল অন্যায় আগ্রাসন ও মানবতাবিরোধী আচরণ করে যাচ্ছে। মুসলিমদের কাছে আল আকসা মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত।

আল আকসা হচ্ছে- ইসলামের প্রথম কেবলা এবং মক্কা ও মদিনার পর তৃতীয় পবিত্র স্থান। হজরত রাসূলে করিম (সা.) মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদুন্নবী ও আল আকসা মসজিদের উদ্দেশে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা অন্য কোনো মসজিদ সম্পর্কে করেননি।

আল আকসা মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। এ পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সঙ্গে জড়িত নয় বরং এ নাম সব মুসলমানের ঈমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলের মাজার।

আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরো একটি বড় কারণ হলো প্রথম থেকে হিজরত পরবর্তী ১৭ মাস পর্যন্ত মুসলমানরা আল আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কেবলা মক্কার দিকে পরিবর্তিত হয়।

মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিসেবে পরিচিত এ মসজিদটি পূর্ব জেরুসালেমে অবস্থিত। আল আকসা মসজিদের অর্থ হচ্ছে- দূরবর্তী মসজিদ। মসজিদটির অপর নাম বায়তুল মুকাদ্দাস। এ পবিত্র মসজিদ থেকেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) উর্ধাকাশে তথা মেরাজ গমন করেছিলেন। নবী করীম (সা.) মিরাজ গমনের সময় এই মসজিদে অতীতের সব নবী-রাসূলের জামাতে ইমাম হয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন।

মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘সকল মহীমা তার- যিনি তার বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চতুর্পার্শ্বকে আমি বরকতময় করেছি। (আর এই ভ্রমণ করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে) যাতে আমি আমার নিদর্শন তাকে প্রদর্শন করি।’ -সূরা বনী ইসরাইল: ১

একদল ইতিহাসবিদ মনে করেন, আল আকসা মসজিদ মূলত হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমেই তৈরি হয়, যা পরবর্তী নবীরা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক কাবা গৃহ নির্মাণের ৪০ বছর পর হজরত ইয়াকুব (আ.) আল আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ১০০৪ সালে হজরত সোলায়মান (আ.) এই মসজিদটির পূণর্নির্মাণ করেন। বিভিন্ন শাসকের সময় মসজিদে অতিরিক্ত অংশ যোগ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গম্বুজ, আঙ্গিনা, মিম্বর, মেহরাব ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো।

৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র মুসলমানদের দখলে আসার পর মুসলমান শাসকরা কয়েকবার এ মসজিদের সংস্কার করেন। কিন্তু ১০৯৬ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার পর আল আকসা মসজিদের ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গীর্জায় পরিণত করে। তারা মসজিদের গম্বুজের উপরে ক্রুশ স্থাপন করে এর নাম রাখে- ‘সুলাইমানি উপাসনালয়।’

এরপর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম অধিকার করার পর পূর্বের নকশা অনুযায়ী আল আকসা মসজিদের পুণর্নির্মাণ করেন। মসজিদটিতে ২টি বড় এবং ১০টি ছোট গম্বুজ রয়েছে। এ মসজিদ নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বর্ণ, সিসা বা লিড এবং মার্বেলসহ বিভিন্ন প্রকার পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির আয়তন সাড়ে ৩ হাজার বর্গমিটার। এ মসজিদে ৫ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন।

বর্তমানে ইসরাইল ঐতিহাসিক মসজিদটি দখল করে রেখেছে। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভের পর মসজিদটি মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে তারা একবার আল আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগও করেছিল।

কবর গুড়িয়ে পার্ক বানাচ্ছে ইসরাইল, আল-আকসা থেকে কোরআন পড়ায় আটক ১২
মিডল ইস্ট মনিটর ও আনাদোলু এজেন্সি

ইসরাইলের নেচার অ্যান্ড পার্ক অথরিটি (আইএনপিএ) এর কর্মকর্তারা জেরুসালেমে আবারো ফিলিস্তিনিদের বাব আল-রাহমা কবরস্থান খনন শুরু করেছে। ফিলিস্তিনের বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটির দেয়ালে বাইরে অবস্থিত ওই কবরস্থানটি রোববার থেকে খনন শুরু করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। 

ওয়াফা বলছে, আইএনপিএ কর্মকর্তারা প্রায় ২০ দিন আগে কবরস্থানে কবর ও জমি খনন শুরু করে। তবে রোববার কর্মকর্তারা আবারো কবর ও সেখানকার জমি খনন শুরু করে। ফিলিস্তিনি এই বার্তা সংস্থাটি বলছে, ‘কবরস্থানের জমিতে একটি জাতীয় পার্ক’ বানানোর লক্ষ্যে এ ধরনের কাজ করছে ইসরাইল।

গেলো মাসে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ওই কবরস্থানের আশপাশের কিছু অংশে লোহার বেড়া দেয়। ওয়াফা বলছে, পার্কের অংশ হিসেবে কবরস্থানের যে অংশ জব্দ করা হয়েছে এবং ধ্বংস করা হচ্ছে সেখানে কয়েক শতক পুরনো মুসলিম নেতাদের কবরও রয়েছে।

ইসরাইলের কর্তৃপক্ষ জাতীয় পার্কের জন্য কবরস্থানের কিছু অংশ জব্দ করার ঘোষণা দিলে ২০১৫ সালে বাব আল-রাহমা কবরস্থান ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জাতিসঙ্ঘের অসংখ্য রেজুলেসন অনুযায়ী পূর্ব জেরুসালেম একটি অধিকৃত এলাকা। তাই এটি সংযুক্ত করার কোনো আইনি অধিকার ইসরাইলের।

অন্যদিকে কোরআন পড়ার সময় পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ চত্বর থেকে ১২ ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। একজন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এটি নিশ্চিত করেছেন। 

জেরুসালেম ইসলামিক ওয়াকফের একজন মুখপাত্র ফিরাস আল-দিবস বলেছেন, কয়েক ডজন ইসরাইলি পুলিশ অফিসার মসজিদের ভেতর থেকে ১২ ফিলিস্তিনিকে আটক করে। এসময় তারা মসজিদের আঙিনায় কোরআন পড়ছিলেন।

তবে ওই ১২ ফিলিস্তিনিকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

আল-দিবস বলছেন, এর আগে সকাল থেকে বিরোধপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদের ভেতর প্রায় ৫৩ জন ইহুদি জোর করে ঢুকে পড়ে।মসজিদের ভেতর আরো বেশি সংখ্যায়  ইহুদি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

মুসলমানদের কাছে আল-আকসা বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত। তবে ইহুদিদের দাবি এটি 'টেম্পল মাউন্ট' এলাকা। তাদের দাবি, প্রাচীনকালে দুটি ইহুদি মন্দিরের স্থান ছিল এটি।

১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। ১৯৮০ সাল থেকে ইসরাইল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মতি ছাড়াই পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে।


আরো সংবাদ