১৬ নভেম্বর ২০১৮

জীবন দিয়ে ইসরাইলি বীভৎসতা তুলে ধরলেন নাজার

জীবন দিয়ে ইসরাইলি বীভৎসতা তুলে ধরলেন নাজার - ছবি : সংগৃহীত

গাজা সীমান্তে ইসরাইলি সৈন্যদের গুলিতে নিহত ফিলিস্তিনি নারী চিকিৎসাকর্মীর নামাজে জানাজা ও দাফন শেষ হয়েছে। ২১ বছর বয়সী এ তরুণীর জানাজায় অংশ নেন কয়েক হাজার মানুষ। নাজারকে হত্যার প্রতিবাদে তার লাশ নিয়ে শোক মিছিলও করেছেন তারা।

এ দিকে ইসরাইলি বিমান থেকে গাজায় হামাসের ১০টি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ফিলিস্তিন থেকে ছোড়া রকেট হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেছে ইসরাইল। এর মাধ্যমে কয়েক দিন আগে করা অস্ত্রবিরতি ভেঙে গেছে। ২০১৪ সালে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরে এখনকার পরিস্থিতিই সবচেয়ে ভয়াবহ।

গত শুক্রবার ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলায় নিহত হন নাজার। সে সময় তিনি গাজা সীমান্তে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। বিক্ষোভ চলার সময় আহত একজনকে চিকিৎসা দিতে তিনি ইসরাইল সীমান্তের কাছে ছুটে যান। সেখানেই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ঘটনার দিন নাজার পেশাদার চিকিৎসাকর্মীদের মতো সাদা পোশাক পরে ছিলেন। তার ওপর তিনি ইসরাইলি সেনাদের উদ্দেশে দুই হাত ওপরে তুলে সঙ্কেতও দিয়েছিলেন। তার পরও ইসরাইলি সেনা সদ্যসরা তার ওপর গুলি চালায়। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নাজার।

শনিবার নাজারের নামাজে জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। নাজারের লাশ ফিলিস্তিনি পতাকায় ঢেকে শোক মিছিল বের করা হয়। নাজারের শোকার্ত বাবার হাতে ছিল মেয়ের রক্তমাখা মেডিক্যাল জ্যাকেট। নামাজে জানাজায় উপস্থিত জনতা নাজার হত্যার প্রতিশোধের দাবি তোলেন। নাজার হত্যার নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে দ্য প্যালেস্টাইন মেডিক্যাল রিলিফ সোসাইটি। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চিকিৎসাকর্মীর ওপর গুলি ছোড়াকে জেনেভা কনভেনশনের আওতায় যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়।’

তার নামাজে জানাজা ও দাফনের কয়েক ঘণ্টা পর উভয়পক্ষের মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। ইসরাইলি সেনাবাহিনী রোববার ভোরে এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ইসরাইলের জঙ্গিবিমান গাজা ভূখণ্ডে হামাসের তিনটি সামরিক কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে ১০টি হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে হামাসের অস্ত্র কারখানা ও গুদাম এবং একটি সামরিক কম্পাউন্ড ছিল।’ গাজায় এ হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ইসরাইলের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, শনিবার সন্ধ্যায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে দু’টি রকেট ছোড়া হয়। ইসরাইলের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি রকেট প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অন্যটি গাজার অভ্যন্তরেই পড়ে। রোববার ভোরে ইসরাইলে আরো দু’টি রকেট ছোড়া হয়। গাজার কোনো সংগঠন এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। গত ৩০ মার্চ থেকে ফিলিস্তিনিদের ছয় সপ্তাহের মার্চ অব রিটার্ন বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এক বিবৃতিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা নাজারের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করবে। তাদের দাবি, হামাসই বেসামরিকদের জীবনকে হুমকিতে ফেলছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধারাবাহিকভাবে অভিযানসংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং তারা গাজা সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে এনেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হামাস ইচ্ছাকৃত ও পদ্ধতিগতভাবে বেসামরিকদের বিপদে ফেলছে।’

এর আগে তারা দাবি করেছিল, ইসরাইলি স্নাইপাররা শুধু তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় যারা স্পষ্টতই হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কখনো কখনো গুলি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভেদ করে তার কাছে দাঁড়ানো ব্যক্তির শরীরেও বিদ্ধ হয়।

আরো পড়ুন :
ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাবে ভেটো দিলো যুক্তরাষ্ট্র
আলজাজিরা ও এএফপি
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রক্ষার পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে দেয়া জাতিসঙ্ঘ খসড়া প্রস্তাবের ব্যাপারে শুক্রবার ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরব দেশগুলোর পক্ষে কুয়েত এ প্রস্তাব উত্থাপন করে। গাজায় সহিংসতার জন্য হামাসের নিন্দা জানাতে ওয়াশিংটন উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদ প্রত্যাখ্যান করার পর যুক্তরাষ্ট্র তার এ ভেটো ক্ষমতার অস্ত্র প্রয়োগ করে।

গাজা সীমান্ত বেষ্টনীর কাছে ইসরাইলি সৈন্যের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নারী নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তা পরিষদে আয়োজিত ভোটাভুটি দুই দফা ব্যর্থ হলো। মার্চের শেষের দিকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে কমপকে ১২৩ ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছে। এ সময় ফিলিস্তিনিদের হাতে কোনো ইসরাইলি নাগরিক প্রাণ হারায়নি।
মার্কিন দূত নিক্কি হ্যালি বলেন, এখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, জাতিসঙ্ঘ ইসরাইলের বিরুদ্ধে আশাহতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট।

কেননা, দেখা যাচ্ছে যে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা ইসরাইলকে দায়ী করতে আগ্রহী হলেও হামাসকে দায়ী করতে অনাগ্রহী। চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়াসহ ১০টি দেশ কুয়েত উত্থাপিত এ খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। চারটি দেশ ব্রিটেন, ইথিওপিয়া, নেদারল্যান্ড ও পোল্যান্ড ভোটদানে বিরত থাকে। কুয়েতের রাষ্ট্রদূত মানসুর আল-ওতাইবি বলেন, এ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি করবে। এটি সেখানের সহিংসতাকে আরো উসকে দেবে।

এর আগে সম্প্রতি গাজায় সহিংসতার ঘটনায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে সমালোচনা করে উত্থাপিত মার্কিন খসড়া প্রস্তান জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রত্যাখ্যান করেছে। গাজা উপত্যকার সহিংসতার ঘটনায় প্রস্তাবটি উত্থাপনকারী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো দেশ হামাসকে দায়ী করেনি। প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয় কেবল যুক্তরাষ্ট্র। তিনটি দেশ প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয় আর ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে হামাসের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় ইসরাইলি বাহিনী হামলার সোয়া শ’ ফিলিস্তিনি নিহত ও হাজার হাজার আহত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে কর্তব্যরত সাংবাদিক ও ডাক্তাররাও রয়েছেন।

প্রস্তাবটি তিনবার নমনীয় করতে সংশোধনের পর নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হয়। প্রথমে একে ফিলিস্তিনি জনগণের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বলে নামকরণ করা হয়। চূড়ান্ত সংশোধনীতে বলা হয়, ‘গাজা উপত্যকাসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনি অসামরিক লোকজনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তার ব্যবস্থা বিবেচনা’। ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার নির্বাহী কমিটির সদস্য হানান আশরাভি পরে এক বিবৃতিতে মার্কিন ভেটো সম্পর্কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবারো ইসরাইলের প্রতি তা অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইহুদি দেশটিকে তার সব দুষ্কৃত থেকে অব্যাহতি দেয়ার চেষ্টা চালাল। অথচ ওই দেশটি সব আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন, সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করছে।


আরো সংবাদ