১৬ অক্টোবর ২০১৯
আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বিচার বিভাগে যা হচ্ছে তা অরাজকতা

-

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে আইনজীবীদের ভূমিকা রাখার সময় এসেছে। আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার্থে আইন পেশায় সংশ্লিষ্টদেরই এগিয়ে আসতে হবে। দেশে বিচার বিভাগে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাকে অরাজকতা বলা যেতে পারে। তারা বলেন, আইনজীবীরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা না করতে পারেন, তবে সামনে বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। বেগম খালেদা জিয়াকে সরকারের ইশারায় অন্যায়ভাবে কারাবন্দী করে রাখা হয়েছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চললে তিনি অবশ্যই মুক্তি পাবেন।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, বর্তমানে দেশের আইন অঙ্গনে একটি অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমি মনে করি দলমত নির্বিশেষে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইনজীবীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হন তা হলে বিচারাঙ্গনে যে অবিচারমূলক কর্মকাণ্ড হয়, তা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, আমার দুর্ভাগ্য আমরা দলীয় রাজনীতিতে এমনভাবে আটকে গিয়েছি, যার ফলে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমিকা রাখতে পারছি না। আমি মনে করি বিচার বিভাগ আমাকে অবিচারের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এবং দেশের মানুষ যাতে দলমত নির্বিশেষে ন্যায়বিচার পান তার জন্য আইনজীবীদের এখানে ভূমিকা রাখার সময় এসেছে।

তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের প্রতি একটি জামিনযোগ্য মামলায় যেখানে তাকে মহানগর দায়রা জজ জামিন দিয়েছেন, সেই ক্ষেত্রে এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগাম জামিনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট গাইড লাইন দিয়েছেন। তার পরও তার মতো একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং সমাজের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তির জামিন বাতিল করে সিএমএম আদালত শুধু বেআইনি কাজ করেননি, আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ করেছেন। আইনজীবীরা এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এটি আমি মনে করি বর্তমান অবস্থায় আইনের শাসনের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। আমরা যদি দলমত নির্বিশেষে এই ভূমিকা সব অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজায় রাখতে পারি, তা হলে বর্তমানে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে, তা থেকে মুক্তি পাবো।

তিনি বলেন, দেশ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণতন্ত্র হত্যা করা হচ্ছে। দেশে অবৈধ সরকার চেপে বসেছে। গণতন্ত্র ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। এ জন্য আইনজীবীদের গণ-আন্দোলনে যেতে হবে। দেশের মানুষের মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করা এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মামলা তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরকার ইচ্ছা করেই বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করছে; যাতে বেগম খালেদা জিয়া জামিন না পান। আদালতও অসহায়, আদালত আমাদের বক্তব্য শোনেন। তবে দেখা যাচ্ছে অন্যের বেলায় যে রকম আদেশ দেন, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যাপারে সে রকম আদেশ দেন না। সে রকম আদেশ আমরা পাই না। তার পরও আমরা ক্লান্ত হই না। আইনজীবীদের কাজ বারবার অ্যাপ্রোচ করা। আদালতের বাইরে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য যারা আন্দোলন করছেন। আমরা আইনজীবীরা আইনগতভাবে যেটা করার, তা করছি। আমরাও চেষ্টা করব, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করব। এ ব্যাপারে শিগগিরই আমাদের জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট মিটিং করবে এবং সব আইনজীবীকে ঐক্যবদ্ধ করবে। আমরা যা কিছু করব আইনগতভাবে করব।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের টানা সাতবার নির্বাচিত সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে। এই আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলে থাকলে স্বাধীন বিচার বিভাগের কথা বলে। আর সরকারে এলে আওয়ামী লীগের অধীনে বিচারব্যবস্থা নিতে চায়। বিচার ও বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এবার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে গেছে। ছলে বলে কৌশলে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। সর্বশেষ প্রমাণ সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে কে সিনহা ১৬তম সংশোধনীর হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্টে বহাল রাখার ফলে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে সরকারের ষড়যন্ত্র এবং সরকারের কথা অনুযায়ী রায় না দেয়ার কারণে আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতারা যেভাবে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন, তা সে সময় সব পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে; তারই পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ক্যান্সারের রোগী বানিয়ে দেশ থেকে বিতাড়ন এবং সর্বশেষ তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি বর্তমানে আমেরিকা কানাডায় রিফিউজি স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার সময় একটি গেজেট অনুমোদন করে নেয়া হয়। এর ফলে বিচারব্যবস্থা এখন আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এ ছাড়া একটি মানিলন্ডারিং মামলায় একজন জজ তারেক রহমানকে খালাস দেয়ার পর তাকে গ্রেফতার করার জন্য দুদক ও পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তিনি বিদেশে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচেন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের এ অবস্থায় উচ্চ আদালত থেকে নি¤œ আদালত সরকারের পছন্দের রায় না দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন দিতে তারা ভয় পাচ্ছেন। জামিন দিতে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছে। তাকেও সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

রাষ্ট্র বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রাখতে চায় এ অবস্থায় গত বুধবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি করা তো দূরের কথা, রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেলের আপত্তির কারণে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন শুনানির জন্য বিচারপতিরা রাজি হননি। আমি মনে করি দেশের জন্য এটি অশনি সঙ্কেত। যে পর্যন্ত দেশের বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী না হবে; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না; বিচারকেরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারবেন; তত দিন দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র আসা করতে পারি না। মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা না হলে, নিয়ন্ত্রণহীন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকার তোষণ এবং অর্থনৈতিক নৈরাজ্য দেশকে হয়তো একসময় অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পেশিশক্তি দিয়ে হয়তোবা অল্প কিছু দিন আটকে রাখতে পারে। আটকে রেখে বেগম খালেদা জিয়ার ন্যায্য কারামুক্তির বাধা সৃষ্টি করতে সাময়িকভাবে পারছে। একপর্যায়ে আইনজীবী ও জনতা ধৈর্য ভাঙলে এগুলোর কিছুই না। কারণ ইতিহাস বলে কোনো জাতিকে চিরস্থায়ীভাবে শৃঙ্খলিত করা যায় না। আইনের শাসন, এবং বেগম খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার পাওয়া না পর্যন্ত আইনজীবী ও জনগণের আন্দোলন চলবে। আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধভাবে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি কামনা করছে। এবং আমি মনে করি সরকারের দমন-পীড়ন যত বাড়বে আন্দোলনের গভীরতা তত বাড়বে। বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন ইনশা আল্লাহ।

এ বিষয়ে বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার থেকে বরাবরই বঞ্চিত হচ্ছেন। এ-জাতীয় মামলায় অন্যদের আপিল গ্রহণের সময় জামিন দেয়া হলেও বেগম খালেদা জিয়া প্রথমত অসুস্থ, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন, দ্বিতীয়ত মহিলা এবং স্বল্পকালীন সাত বছরের সাজা মামলায় দুই বছর কারাগারে অতিক্রান্ত হলেও তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলত, তা হলে এরই মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেতেন। যেহেতু আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে না, সে জন্য বেগম খালেদা জিয়া জামিন পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, আইন ও সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য আইনজীবীরা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কাজ করবেন।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum