২৪ জুন ২০১৮

আইন প্রণয়নে গতি নেই, তবুও চলছে বিচারক নিয়োগ

সুপ্রিম কোর্ট - সংগৃহীত

উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নে গতি নেই। মন্থর গতিতে চলছে আইন প্রণয়নের কার্যক্রম। কিন্তু এরই মধ্যে নিয়োগ করা হয়েছে হাইকোর্ট বিভাগে ১৮ জন বিচারক। আইন বা নীতিমালা ছাড়া বিচারক নিয়োগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন গত বৃহস্পতিবার সমিতি ভবনে এক ব্রিফিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, হাইকোর্ট বিভাগে ১৮ জন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও তার এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, বিচারপতি নিয়োগে আইন করার কথা। ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্টের দেওয়া এক রায়ের গাইডলাইনের আলোকে আমরাও বিচারপতি নিয়োগের কথা বলেছিলাম। কিন্তু সেই গাইডলাইন অনুসারে ১৮ বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন কিনা তা পর্যবেক্ষণ করছি।

তিনি বলেন, এই ১৮ জন বিচারপতি নিয়োগে সরকারের কোনও যোগসাজশ আছে কিনা খুঁজে দেখবো। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অটল আছি, বিচারপতি নিয়োগে আইন করতে হবে। যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়ের গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা আমরা পরীক্ষা করছেন করছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নে গতি মন্থর হলেও নিয়োগ থেমে নেই। গত ৩০ মে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টে বিভাগে ১৮ বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বিতর্কের অভিযোগ এড়াতে সরকারের নীতিনির্ধারণের একটি অংশ চায় আইনটি প্রণয়ন হোক। আর অপর অংশ চায় না এ আইন হোক। ফলে এ আইন করার উদ্যোগ নিলেও এর কার্যক্রম চলছে মন্থর গতিতে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইনজীবী সহ বিভিন্ন মহলের দাবীর প্রেক্ষিতে দীর্ঘ প্রায় এক বছরেরও অধিক সময়ে আইনটির খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রম হাতে নেয়। বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইন তৈরীর কাজ দেয়া হয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগকে। গত বছরের মে মাসের মধ্যে আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করার টার্গেটও দেয়া হয়েছিল। ওই টার্গেট নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ আইন প্রণয়নের কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে তা স্থবির হয়ে পড়ে।

তবে এ প্রসঙ্গে গত এপ্রিল মাসে রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে আইনের খসড়া প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিচারপতি নিয়োগে আইন প্রণয়নে সরকার সম্পূর্ণ একমত। শুধু আইন প্রনয়ণের প্রস্তুতি নয়, খসড়াও প্রায় তৈরি হয়ে গেছে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে এটা মন্ত্রিপরিষদে নিয়ে যেতে পারবো।

এদিকে আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জুডিশিয়াল অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ আইন প্রণয়ন হচ্ছে। নতুন এই আইনের খসড়া তৈরীর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চূড়ান্ত করার পরপরই অনুমোদনের জন্য মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হবে।

সূত্র জানিয়েছে, নতুন এই আইনের খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রমে বলা হয়েছে, বিচারক নিয়োগের জন্য গঠন হবে একটি কমিশন। এ কমিশনে রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, সরকার, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুশীল সমাজের একজন করে প্রতিনিধি রাখার বিধানটি সংযোজন করা হতে পারে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশন প্রার্থীর মাপকাঠি নির্ধারণ করবে। নিয়োগ পাওয়ার জন্য যারা প্রার্থী হবেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি জুডিশিয়াল বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই প্রাধান্য দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা আছে, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ দেবেন। সংবিধান অনুযায়ী আইন পেশায় ১০ বছর মেয়াদ বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার পদে ১০ বছর অতিবাহিত হলেই হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়।

উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন বা নীতিমালা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আইনজ্ঞ সুশীল সমাজসহ নানা মহলে আইন করার দাবী উঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন কমিশনও ২০১৫ সালের ১৮ আগষ্ট উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রেরণ করে।

কমিশনের সুপারিশেও বলা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটির মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি পদে নিয়োগ দিতে। উচ্চ আদালতে বিচারপতি পদে নিয়োগে কমপক্ষে ৫০ বছর বয়স এবং অবসর গ্রহণের বয়স ৭৫ বছর নির্ধারণ করলে অভিজ্ঞ বিচারক দক্ষতার সঙ্গে অধিক সময় বিচারিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। সুপারিশে আরো বলা হয়, বিচারকদের যোগ্যতা হিসেবে সুপ্রীম কোর্টে অন্যূন বিশ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে প্রকৃত কার্যকাল, অথবা বিচার বিভাগে অন্যূন বিশ বছর প্রকৃত বিচারিক দায়িত্ব পালন এবং তন্মধ্যে অন্তত তিন বছর জেলা জজের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়।

 


আরো সংবাদ