২২ নভেম্বর ২০১৯

ভোলায় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ অব্যাহত

বায়তুল মোকাররম মসজিদে বিক্ষোভ সমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ : নয়া দিগন্ত -

ভোলায় তৌহিদী জনতার সমাবেশে গুলি করে চারজন হত্যা ও বহু লোককে আহত করার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, ঘটনা তদন্তের আগেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা একপেশে। তারা অবিলম্বে হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং আল্লাহ, রাসূল ও মা ফাতেমার বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার দাবি জানান। একই সাথে তৌহিদী জনতার নামে মামলা দায়েরের প্রতিবাদ করে তারা এ মামলা প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছেন। এ দিকে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে আজ মঙ্গলবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়েছে। ঢাকায় বায়তুল মোকাররম থেকে বাদ জোহর এ বিক্ষোভ মিছিল বের হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে গতকাল বিকেলে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে পল্টন মোড়ে মুনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, ভোলায় রাসূলপ্রেমিক তৌহিদী জনতার সমাবেশে পুলিশের নির্বিচারে গুলি বর্ষণের ঘটনা তদন্ত না করে প্রধানমন্ত্রী একপেশে বক্তব্য দিয়ে একটি মহল ও ভারতকে খুশি করেছেন। এ ঘটনায় দেশের মানুষ হতবাক ও বিস্মিত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার ক্ষত না শুকাতেই ভোলায় নবীপ্রেমিক জনতাকে হত্যা করে সরকার ভারতবিরোধী মুভমেন্টকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। তিনি আগামী ২৫ অক্টোবর শুক্রবার সারা দেশের মসজিদগুলোতে শহীদদের স্মরণে দোয়া এবং জেলা জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি প্রিন্সিপাল মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী, মহাসচিব প্রিন্সিপাল মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সভাপতি মাওলানা ইমতিয়াজ আলম, মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম, যুবনেতা কে এম আতিকুর রহমান, ছাত্রনেতা শেখ ফজলুল করীম মারূফ প্রমুখ।
ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া মোহাম্মদপুর ঢাকা : মহানবী সা: ও আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে কটূক্তিকারী ইসকন সদস্যের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া মোহাম্মদপুর ঢাকার উদ্যোগে এক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও জামিআ রাহমানিয়া আরবীয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, যখন আল্লাহ, রাসূল সা:, সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বায়াতের বিরুদ্ধে কটূক্তি করা হয়, তখন দেশের মসনদে অবস্থানকারী লোকদের মধ্যে কোনো পেরেশানি দেখা যায় না। উল্টো কটূক্তিকারীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়। একজন মুসলমান হিসেবে কটূক্তিকারীর পক্ষে অবস্থান নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা ঈমানের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং আল্লাহ, রাসূল সা:, সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বায়াতের বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন জাতীয় সংসদে পাস করতে হবে। এ আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত তৌহিদী জনতার আন্দোলন চলবে। তিনি বলেন, আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর বিরুদ্ধে কটূক্তি করা হবে আর মুসলমানরা এর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে পারবে না। এটি মেনে নেয়া যায় না। অবিলম্বে আল্লাহ, রাসূল ও মা ফাতেমার বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে; অন্যথায় আন্দোলনের দাবানলে ক্ষমতার মসনদ টিকে থাকবে না। তিনি বোরহান উদ্দীনে মিছিলে হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বায়তুল জান্নাত মাদরাসার মুহতামিম মুফতি উমর ফারুকের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, আদাবর বায়তুল আমান মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মাহমুদুর রহমান, জামিআ মুহাম্মদিয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল, জামিআ ওহিদিয়ার মুহতামিম মাওলানা জুবায়ের, মারকাজুল কুরআনের মুহতামিম মাওলানা ইলিয়াছ হামিদী প্রমুখ। সমাবেশে শেষে বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মোহাম্মদপুর চৌরাস্তায় শেষ হয়।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম : জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে গতকাল বাদ জোহর রাজধানীতে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগর জমিয়তের সভাপতি প্রিন্সিপাল মাওলানা বেলায়েত হোসাইন আল ফিরোজীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুফতি আতাউর রহমান খানের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তৃতা করেন, মুফতি জাকির হোসাইন খান, মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান, মুফতি রেজাউল করীম, মুফতি আবু সাঈদ, ছাত্র জমিয়ত সভাপতি তোফায়েল গাজালি, সুহাইল আহমদ, নিজাম উদ্দীন আল আদনান প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের প্রতিবাদী নবীপ্রেমী মানুষের রক্তে সরকারের হাত রঞ্জিত। জালেম সরকার কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। দেশে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজের অপকর্ম, দুর্নীতি ঢাকার মরণপ্রাণ যে প্রচেষ্টা করছে সরকার তারই একটি অংশ হিসেবে এ ঘটনা। তারা বলেন, সরকার আবার নতুন করে ভোলার নির্যাতিত পাঁচ হাজার মুসলমানদের ওপর মিথ্যা মামলা দিয়েছে। অবিলম্বে এ মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। একই সাথে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করে তৌহিদী জনতার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে পরিণতি শুভ হবে না। সমাবেশে ভোলায় নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন দোয়া ও মুনাজাত করা হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন : বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা আতাউল্লাহ বলেছেন, ভোলায় রাসূল সা:-কে অবমাননাকারী এবং নবীপ্রেমিক মসুল্লিদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যাকারী পুলিশদের বিচার করতে হবে। নিরস্ত্র-নিরীহ প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে পুলিশ অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। অভিযুক্ত অপরাধীদের শনাক্ত করে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে, অন্যথায় সারা দেশে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়বে। তিনি আরো বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য কতিপয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি অপরাধীদের আড়াল করতে উঠে পড়ে লেগেছে। অপরাধীদের আড়াল করার অপচেষ্টার পরিণাম শুভ হবে না। অবিলম্বে মুহাম্মদ সা:-কে কটূক্তিকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে এবং প্রতিবাদী তৌহিদী জনতাকে গুলি করে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। শহীদ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। গতকাল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন দলের মহাসচিব মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সুলতান মহিউদ্দিন, মাওলানা সানাউল্লাহ, মাওলানা সাইফুল ইসলাম সুনামগঞ্জী ও মুফতি আ ফ ম আকরাম হুসাইন প্রমুখ। সভায় হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত জেলায় জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানানো হয়।
ভোলা নাগরিক ঐক্য ফোরাম : ভোলায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নিরাপরাধ মানুষের প্রাণহানির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ভোলা নাগরিক ঐক্য ফোরামের উদ্যোগে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ শাহ আলম। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফা, মাকসুদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আক্কাস আলী, দফতর সম্পাদক মহসিন রানা প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দ্বীপজেলা ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ-জনতা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন নিহতসহ শতাধিক নিরপরাধ মানুষ হতাহত হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সাথে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। এ ঘটনার তদন্তের নামে কোনো সাধারণ নিরপরাধ মানুষ যাতে গ্রেফতার-হয়রানির শিকার না হয়ে সে বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ ছাড়া গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
ভোলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ। দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুদ্দোজা সুজা ও মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের ভোলার বোরহানুদ্দীনে জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় হতাহতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি বাহিনীর কাছে এ রকম নিষ্ঠুরতা স্বাধীন একটি দেশের জনগণ প্রত্যাশা করেনি। এ ঘটনায় মনে হচ্ছে না যে আমরা একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিক, আমাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির তদন্তের মাধ্যমে, এই নিষ্ঠুরতার পেছনে দায়ী ব্যক্তিবর্গকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানান। নেতৃবৃন্দ নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। সরকারের কাছে আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়ে তাদের আশু রোগমুক্তি কামনা করেন।


আরো সংবাদ