২০ অক্টোবর ২০১৯

নান্দনিক সৌন্দর্যে ঝলমল পুরান ঢাকার তারা মসজিদ অনন্য স্থাপত্য

-

রাজধানী ঢাকার প্রাচীন স্থাপনার অন্যতম হচ্ছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তারা মসজিদ। এটি ঢাকায় অন্যতম নান্দনিক মসজিদগুলোর একটি। পুরনো ঢাকার আরমানিটোলার আবুল খয়রাত রোডে অবস্থিত মসজিদটির নির্মাণকাল উল্লেখ না থাকায় এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে বাংলাপিডিয়াসহ বেশ কয়েকটি দলিল অনুসারে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এটি নির্মাণ করা হয়। তারা মসজিদটি ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান) নির্মাণ করেছিলেন বলে মসজিদটি মির্জা সাহেবের মসজিদ বলেও অভিহিত হয়ে থাকে। মির্জা গোলাম পীরের মৃত্যু হয় ১৮৬০ সালে; তাই এ মসজিদের নির্মাণকাল উনিশ শতকের প্রারম্ভে ছিল বলে স্থানীদের ধারণা।
মির্জা গোলাম পীর নির্মিত এই আদি মসজিদটির প্রথমে পরিমাপ ছিল দৈর্ঘ্য ৩৩ ফুট (১০.০৬ মিটার) এবং প্রস্থে ১২ ফুট (৪.০৪ মিটার)। মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর ভেতরে মাঝের গম্বুজটি অনেক বড় ছিল। সাদা মার্বেল পাথরের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারার নকশা যুক্ত ছিল। সেই থেকে এই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পূর্ব দিকে মসজিদে প্রবেশের জন্য তিনটি, উত্তর দিকে ১টি এবং দক্ষিণ দিকে ১টি দরজা ছিল। পরে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী, আলী জান বেপারি মসজিদটির সংস্কার করেন এবং মসজিদটির পরিসর বৃদ্ধি করা হয়। মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়। একই সময় মসজিদের মেঝে মোজাইক করা হয়। চিনিটিকরি কৌশলের এই মোজাইকে ব্যবহার করা হয় জাপানি রঙিন চীনা মাটির টুকরা এবং রঙিন কাচের টুকরা। আলী জান বেপারি চিনামাটির পেইন্ট, পেয়ালা ও ছোট-বড় নানা রঙের কাচের টুকরার সমন্বয়ে এক বিশেষ পদ্ধতিতে মসজিদটি অলঙ্কৃত করেন। কারুকার্যময় এই মসজিদের দেয়ালে ও ছাদে শোভা পেয়েছে নানা রঙের ফুল, পাতা ও চাঁদ-তারার নকশা। গম্বুজগুলো তারাখচিত নকশা দ্বারা অলঙ্কৃত। মসজিদে প্রবেশের জন্য পাঁচটি খিলানবিশিষ্ট পথ সৃষ্ট করা হয়েছে। এ খিলানগুলো বহু খাঁজবিশিষ্ট এবং চারটি অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভ হতে উত্থিত। বারান্দায় গাত্রালঙ্কারে জাপানের বিখ্যাত ‘ফুজিসান’ টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ফাসাদ’ এর কেন্দ্রে আরবি লিপিসংবলিত সূক্ষ্ম আধো চাঁদ ও তারার অলঙ্করণ স্থান পেয়েছে। বৃত্তাকার শ্বেত-শুভ্র গম্বুজগুলোতে বসানো হয়েছে নীল রঙের অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র। সমগ্র নকশায় সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়েছে তারার ‘মোটিফ’; তাই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে খ্যাত।
১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এই স্থাপনাটিকে কেন্দ্র করে ৫ থেকে ৫০০ টাকা সিরিজের ব্যাংক নোট মুদ্রণ করে। প্রচলিত ১০০ টাকা মূল্যমানের নোটেও রয়েছে পুরান ঢাকার এ নয়নাভিরাম স্থাপত্যটি। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর এই মসজিদের ডিজাইনকে খাদি কাপড়ে ফুটিয়ে তুলে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল খাদি ফ্যাশন শো।
১৯৮৭ সালে সরকারি অর্থায়নে এই মসজিদটির আবার সংস্কার করা হয়। এই সময় পুরানো একটি মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। মসজিদের বতর্মান দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার), প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)। এ ছাড়া মসজিদের দেয়ালে ফুল, চাঁদ, তারা, আরবি ক্যালিওগ্রাফিক লিপি ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে শোভাবর্ধন করা হয়েছে। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তারা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং মসজিদের সংস্কারকাজের উদ্বোধন করেন এবং এ সময় মসজিদটিকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।
পুুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি পরিদর্শনকালে কথা হয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মো: তোফাজ্জল হোসাইনের সাথে। তিনি নয়া দিগন্ত প্রতিনিধিকে জানান, দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে তিনি ওই পদে রয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা থানায় হলেও গ্রামে বেশি একটা যাতায়াত নেই তার। মসজিদ ও পুরান ঢাকার মানুষের ভালোবাসা নিয়ে থাকতে চান বাকিটা জীবন। তিনি জানালেন প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী দূর-দূরান্ত থেকে সাদা মার্বেলের ওপরে নীল তারারা ব্যতিক্রম মসজিদটি পরিদর্শন করতে আসেন। পর্যটকদের মধ্যে বিদেশী নাগরিকই বেশি। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। মসজিদটির পাশেই রয়েছে মাদরাসা, যার দেখাশোনাও মসজিদ কর্তৃপক্ষই করে থাকে। বর্তমানে মাদরাসাটির মক্তবে দুই বেলা ২৫০ জন এবং হেফজখানায় ৫৬ ছাত্র পড়াশোনা করছে। আছেন একজন প্রধান ইমাম ও পেশ ইমাম বা খতিব, একজন মুয়াজ্জিন এবং চারজন খাদেম। এ ছাড়া সকাল ও বিকেল দুই শিফটে মসজিদভিত্তিক মক্তব পরিচালনায় রয়েছেন চারজন শিক্ষক। এ মক্তব্যে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের নামাজসহ ইসলামের মূল বিষয়গুলো শেখানো হয়। বর্তমানে স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে ১১ সদস্যের গঠিত কমিটি মসজিদটি পরিচালনা করছে। কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ ওয়াকফ এস্টেটের প্রশাসক, সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন : ওয়াকফ এস্টেটের প্রধান হিসাবরক্ষক আবুল কাশেম ও সহসভাপতি তারেক-এ-আদেল। মসজিদের উন্নয়ন ও বিভিন্ন খরচ বাবদ প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করে। প্রত্যেক রমজানে প্রতিদিন মসজিদ প্রাঙ্গণে গরিব ও মুসাফিরদের জন্য এলাকাবাসী ও মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন করা হয়।
মসজিদ কমিটির নির্বাহী সদস্য ও পুরান ঢাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মো: ছাদেক উল্লাহ এ প্রতিবেদককে জানান, মসজিদের উন্নয়ন ও বিভিন্ন খরচ বাবদ প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। প্রতি বছর মসজিদটি পরিচালনায় তাদের প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। বাকি টাকা মসজিদ কমিটির স্থানীয় সদস্যরা জোগান দেন। তিনি বলেন, এর আগে মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন বিভাগীয় কমিশনার ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন ঢাকা জেলা প্রশাসক। তখন কমিটির লোকজন মসজিদটি উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তিনি মসজিদের উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য আহ্বান জানান।
যদিও পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর কোলাহলের ভিড়ে দর্শনার্থীদের তারা মসজিদ খুঁজে পেতে একটু মুশকিলই হয়। তবে এর সামনে দাঁড়ালে মনের বিরক্তি ভাব কর্পূরের মতো উবে যাবে। মসজিদের সামনেই রয়েছে একটি তারা আকৃতির ফোয়ারা। মসজিদ ও ফোয়ারা মিলেমিশে একাকার। এ দৃশ্য দেখলে দর্শনার্থীর মনে নেমে আসে প্রশান্তির শ্যামল ছায়া। মসজিদের ভেতরে প্রবেশের আগে সামনের খোলা মাঠে প্রথমেই তারা আকৃতির একটি ফোয়ারা রয়েছে। এর চার দিকে সবুজ ঘাসের ওপর মোজাইক টাইল দিয়ে মসজিদে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদের ডিজাইনগুলো দেখে মুগ্ধ না হওয়ার উপায় নেই। লতাপাতা আর বিভিন্ন ফুলের সমাহারে মন হারিয়ে যায় অন্য জগতে। প্রতিদিন ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকার অনেক দর্শনার্থী মসজিদের সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হন।


আরো সংবাদ




portugal golden visa
paykwik