১৫ অক্টোবর ২০১৯

গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে

-

গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে বকেয়া বেতনভাতার দাবিতেই এই অসন্তোষ। অনেক এলাকাতেই বেতন-ভাতা বকেয়া রেখে কারখানা বন্ধ করে পালিয়ে যাচ্ছেন মালিকপক্ষ। গত কয়েক দিনে রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে এ অসন্তোষ লক্ষ করা যায়। এ দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিটগুলোকে এ অসন্তোষের কারণ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা বলেছেন, গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলেও শ্রমিকেরা কোনো সাড়া পাচ্ছেন না; যে কারণে অসন্তোষ আরো তীব্র হয়ে উঠছে।
বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীর মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে তৈরী পোশাক শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি করে। রাজধানী ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অচল হয়ে পড়ে। এতে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হন। গতকাল সকাল ৮টায় মিরপুর চিড়িয়াখানা রোড জারা জিন্স ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে কাঁচপুর এলাকায় সিনহা গার্মেন্টের শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনের রাস্তায় সকাল ৮টায় বিক্ষোভ শুরু করে জারা জিন্স পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে চিড়িয়াখানা রোড, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে মাজার রোডে যাওয়ার সড়ক, মিরপুর বাংলা কলেজ সড়কসহ রাজধানীর সব সড়কে যান চলাচলে অচল হয়ে পড়ে।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা জানান, তাদের চার মাসের বেতন, দুই মাসের ওভারটাইম বাকি। বেতন না দিয়ে গত বৃহস্পতিবার মালিকপক্ষ কারখানায় তালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। মালিকের মোবাইল ফোনও বন্ধ। গত ঈদের আগেও আন্দোলন করে বেতন আদায় করতে হয়েছিল। শ্রমিকেরা আরো জানান, গত বুধবার বিজিএমইএতে গিয়েছিলেন তারা। সেখান থেকে বলা হয়েছিল শনিবার বিষয়টি সমাধান হবে। শনিবার বিজিএমইএ অফিসে গেলে সেখানকার কেউ কোনো কথা বলেননি। এ জন্য বাধ্য হয়ে আজ রাস্তায় নামতে হয়েছে।
শাহ আলী থানার ওসি মো: সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, সকাল থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করছে পুলিশ। কিন্তু শ্রমিকেরা তা মানতে রাজি নন। তারা মালিকপক্ষের কাছে কারখানা খুলে দিয়ে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবি জানান। পুলিশের পক্ষ থেকে কারখানার মালিক রিয়াজুল হক রাজুর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাকে নিয়ে বিজিএমইএ ভবনে বৈঠক চলছে। বিকেলে শ্রমিকেরা ওই কারখানায় কাজ শুরু করছেন।
এ দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে কাঁচপুর এলাকায় সিনহা গার্মেন্টের শ্রমিকদের চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে জলকামান ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। কারখানাটির শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে গার্মেন্টের ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বিভিন্ন দাবিতে দুই দিন ধরে এই আন্দোলন করে আসছে ওই শ্রমিকেরা। বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে কারখানা এক দিনের ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
গতকাল রোববার সকালে থেকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় সোনারগাঁও থানা পুলিশের সাথে বিপুলসংখ্যক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ বেলা ১১টায় ওই অভিযান চালায়। পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও তাদের ওপর জলকামান ও টিয়া েেশল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের সাথে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে গোটা কাঁচপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে পুলিশসহ অর্ধশত শ্রমিক আহত হন। আহতের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বলে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে সোনারগাঁও থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘কাঁচপুরের সিনহা গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ও তার নেতৃত্বে থানা পুলিশের কয়েকটি দল ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় পুলিশ অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয় এবং শ্রমিকদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে শ্রমিকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। পুলিশ মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করছে। তবে পুলিশের অভিযানে রাস্তা থেকে সরে গেলেও মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
মাতৃত্বকালীন ছুটি, ছুটিকালে ভাতা প্রদান, মাসিক বেতন ৮ তারিখের মধ্যে পরিশোধ ও ভাতা বৃদ্ধি, বকেয়া পরিশোধ ইত্যাদি দাবিতে সম্প্রতি আরো কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা রাস্তায় নামেন। গত বুধবার রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তায় শ্রমিকেরা অবরোধ সৃষ্টি করেন। সেখানেও পুলিশ লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদেরকে রাস্তা থেকে তুলে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গার্মেন্ট শ্রমিকদের এক নেতা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, শিগগিরই তারা বড় কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামছেন। বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা হচ্ছে, ওভারটাইমের টাকা ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না। এসব নিয়ে আন্দোলনে নামবেন তারা।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum