১৭ নভেম্বর ২০১৯

নিউ ইয়র্কে আড্ডায় নাজমুন নাহার লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে শতাধিক দেশ ঘুরেছি

নিউ ইয়র্কে আড্ডায় বক্তৃতা করছেন নাজমুন নাহার (ইনসেটে) হনয়া দিগন্ত -

বাংলাদেশের এক সাহসী নারী নাজমুন নাহার। বিশ্বের আনাচে-কানাচে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে দেশের লাল-সবুজ পতাকা বহন করে ইতোমধ্যে ঘুরেছেন ১৩০টি দেশ। অদম্য মানসিক শক্তি পুঁজি করে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ভ্রমণে ভিসা নয়, আমি গুরুত্ব দেই লাল-সবুজের পতাকাকে। মানুষ চাঁদে গেছে পতাকা হাতে।
সাহসী এ নারীর সাথে নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় খাবার বাড়িতে এক আড্ডার আয়োজন করে অনলাইন পত্রিকা বাংলা খবর ডট নেট। ২৮ আগস্ট বুধবার আয়োজিত এ আড্ডায় নাজমুন নাহার বলেন এসব কথা। বাংলা খবর ডট নেট-এর সম্পাদক শওকত ওসমান রচির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন এ অনলাইন পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সৈয়দ মোস্তফা আল আমিন।
আড্ডায় অংশগ্রহণকারীরা শোনেন নাজমুন নাহারের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক, বিভিন্ন সপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। প্রায় এক ঘণ্টা নাজমুন নাহারের অভিজ্ঞতার বর্ণনা শেষে তারা নানা প্রশ্ন করেন তাকে। আড্ডার শুরুতে নাজমুন নাহারের বড় ভাই মরহুম আমিনুল ইসলামের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে বাংলা খবর ডট নেট-এর পক্ষ থেকে নাজমুন নাহারের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেন অতিথিরা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক মনজুর আহমেদ, সাপ্তাহিক ঠিকানার সম্পাদক ফজলুর রহমান, সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, সাপ্তাহিক বর্ণমালা সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, টাইম টেলিভিশনের সিইও এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের, সাপ্তাহিক প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ, সিনিয়র সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ, মুক্তিযোদ্ধা মুকিত চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলোর নিউ ইয়র্ক ব্যুরো চিফ ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক মুজাহিদুল আনসারী, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট কামাল হোসেন মিঠু, অধ্যাপিকা হোসনে আরা, বাংলাভিশন টেলিভিশনের নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি ও ফটো সাংবাদিক নিহার সিদ্দিক, দৈনিক সংবাদের নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি সঞ্জীবন সরকার, ফটো সাংবাদিক এ হাই স্বপন ও খোরশেদ আলম রিংকু, প্রথম আলোর সাংবাদিক মঞ্জুরুল হক, সাপ্তাহিক জনতার কণ্ঠের প্রকাশক শামসুল হক, অনলাইন ইউএস বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ হামিদ, জ্যামাইকা-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি শেখ হায়দার আলী, বাগেরহাট জেলা সোসাইটির সেক্রেটারি খোন্দকার মুরাদ হোসেন, বিএসএ অব এনওয়াই প্রেসিডেন্ট শেখ আল আমিন প্রমুখ।
নাজমুন নাহার জানান, তার এ যাত্রাপথে তিনি মধ্যরাতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে আটকা পড়েছেন, সাহারা মরুভূমিতে মরুঝড়ের মধ্যে রক্তাক্ত হয়েছেন, পোকা মাকড়ের কামড় খেয়েছেন আফ্রিকার জংলি পথে, অন্ধকারে অচেনা শহরে পথ হারিয়েছেন, আফ্রিকায় তিন মাস শুধু আলু খেয়ে থেকেছেন। বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে কখনো না খেয়ে ছিলেন, কখনো কাঠের মধ্যে, কখনো পাথরের ওপর, কখনো আদিবাসীদের সাথে জঙ্গলে থাকতে হয়েছে। কখনো রাতে বর্ডার ক্রস করতে না পেরে স্থানীয় পরিবারের সাথে ঘুমাতে হয়েছে। কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি, লাল-সবুজের পতাকা হাতে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। মৃত্যুর হাতছানি জয় করে উঠেছেন সু-উচ্চ পর্বতের চূড়ায়। গেঁথে এসেছেন লাল-সবুজের পতাকা।
নাজমুন নাহার জানান, শিশুকালে আকাশে পাখীকে উড়তে দেখে তার আকাশে উড়ার শখ জাগে। ছেঁড়া বিশ্বম্যাপ পাজেলের মতো জোড়া লাগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দেখতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবেই তিনি যত বড় হতে লাগলেন, তার বিশ্বভ্রমণের আকাক্সক্ষা আরো জোরালো হতে থাকে। একপর্যায়ে গার্লস গাইড করার সুবাদে তিনি স্কুলজীবনে ২০০০ সালে প্রথম ভারতের ভুপাল সফরে যান। ৮০টি দেশের ছেলেমেয়েদের সামনে তুলে ধরেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। তিনি জানান, তার লক্ষ্য বিশ্বের ২০০টি দেশে বাংলাদেশের পতাকা পৌঁছে দিয়ে পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল্যবোধকে তুলে ধরা।
পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নাজমুন নাহার জানান, সুইডেনে পড়তে গিয়ে সে দেশের পাসপোর্ট তিনি নিয়েছেন একটি উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে সুবিধা রয়েছে এ পাসপোর্টে। সে দেশে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করে যা আয় করেন সে টাকা দিয়েই তিনি দেশে দেশে ঘুরেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে ইয়ুথ হোস্টেল আছে, যেখানে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
নাজমুন নাহার ২০১৮ সালের ১ জুন ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক পার করেন পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতে গিয়ে। সর্বশেষ চলতি আগস্ট মাসের ২৩ তারিখে ১৩০তম দেশ ভ্রমণের রেকর্ড গড়েন কানাডায় গিয়ে। তার এ অভিযাত্রার সঙ্গী হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাকে নিয়ে ঘুরছেন ১৪টি দেশ। কখনো সাহারার মরুভূমি, কখনো আফ্রিকার জঙ্গল আবার কখনো বা সমুদ্রের তলদেশে গিয়েছেন। নাজমুন নাহার পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই ভ্রমণ করেছেন সড়ক পথে একা একা। এ তালিকার মধ্যে রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ।
২০১৮ সালের ২৩ মার্চ ‘তারুণ্যের আইকন’ উপাধি পান অনন্যা সম্মাননার মাধ্যমে। তার বিশ্ব অভিযাত্রার সম্মাননা স্বরূপ জাম্বিয়া সরকারের গভর্নর হ্যারিয়েট কায়োনার কাছ থেকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি লাভ করেন। এ ছাড়া ওই বছর অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল পান। এ ছাড়া পেয়েছেন জনটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, তিন বাংলা সম্মাননা ও রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড।
১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর সদরের গঙ্গাপুরে জন্ম নাজমুন নাহারের। ১৯৯৪ সালে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার এন কে উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক, ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০০৯ সালে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি বলেন, আমি বিশ্বের বাকি সব দেশ ভ্রমণের স্বপ্ন দেখছি এখনো।


আরো সংবাদ