১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসির উত্তরপত্র জালিয়াতির নেপথ্যে

প্রেষণে এসে একই দফতরে এক যুগ অরুণ কুমার গাইন ; জালিয়াতির শীর্ষে অফিস সহকারী গোবিন্দ
-

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্র জালিয়াতি করে জিপিএ ৫ পাইয়ে দেয়া বাণিজ্যের সাথে শুধু একজন কর্মচারীই নয়, বরং এর সাথে কিছু কর্মকর্তা, এমনকি কয়েকজন পরীক্ষক জড়িত রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। জালিয়াতি ঘটনায় শিক্ষা বোর্ড তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেও ওই কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র বলছে রেকর্ড সাপ্লায়ার গোবিন্দের ওপর দোষ চাপিয়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে অন্যদের বাঁচিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান বলেছেন, যারা এ জালিয়াতির সাথে জড়িত তারা কেউ পার পাবে না।
এ দিকে গত মঙ্গলবার জালিয়াতির ঘটনায় একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা তদন্তে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো: মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কমিটির প্রধান প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, একটি চিঠি পেয়েছি। চিঠিতে সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে তদন্ত করা বোধহয় সম্ভব হবে না। আরো সময় নিতে হবে।
এ দিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্র জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জিপিএ ৫, এমনকি ফেল করাদের পাস করিয়ে দেয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। এর সাথে শুধু কর্মচারীই নয়, কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন। একই দফতরে দীর্ঘ বছর থাকার কারণে খুব সহজেই তারা এ কাজটি করছেন। এর সাথে অনেক পরীক্ষকও জড়িত আছেন।
কেন্দ্র থেকে আসা উত্তরপত্র থাকে যেখানে : জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া ১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর খাতা বাইরে নিয়ে লিখে জমা দেয়ার ঘটনায় সবার আগে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষা বোর্ডের নিরাপত্তা ও দায়িত্ব অবহেলা নিয়ে। পরীক্ষার উত্তরপত্র শিক্ষা বোর্ডেরা গোপন শাখায় রাখা হয় এবং এর দায়িত্বে থাকেন কর্মকর্তারা। সরেজমিন জানা গেছে, প্রতিদিন পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে পরীক্ষার্থীদের খাতা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অথবা তার একজন প্রতিনিধি বোর্ডে নিয়ে আসেন। খাতাগুলো রাখা হয় শিক্ষা বোর্ডের নিচ তলায় স্ক্রিপ্ট রুমে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে স্ক্রিপ্ট রুম দু’টি। এর একটিতে সিসি ক্যামেরা আছে কিন্তু অপরটিতে নেই। দু’টি কক্ষেই খাতা রিসিভ করা হয়।
স্ক্রিপ্ট রুমের দায়িত্বে যারা : স্ক্রিপ্ট রুমের সব কিছুর তদারকির দায়িত্বে ছিলেন শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অরুণ কুমার গাইন। নির্দেশনায় ছিলেন সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ কে আজাদ ফারুক। তাদের নেতৃত্বে কাজ করেছেন সেকশন অফিসার শহিদুল ইসলাম, রেকর্ড সাপ্লায়ার গোবিন্দ চন্দ্র পাল। এ বি এম মিজানুর রহমান, বাবুল হোসেন, মজিবর রহমান, ইউসুফ হোসেন, মনির হোসেন, শংকর রায়, নিতাই চন্দ্র, মিলন, সুমন। কেন্দ্র থেকে খাতা আসার পরে তা এন্ট্রি করার দায়িত্ব গোবিন্দ চন্দ্র পাল ও মজিবর রহমানের। অফিস সহকারী মিজানুর রহমান ও ইউসুফ হোসেন খাতাগুলো আলাদা করে বস্তায় ভরেন। পরীক্ষকদের মধ্যে খাতা বণ্টনের সময় খাতাগুলো তদারকি করেন সেকশন অফিসার শহিদুল ইসলাম।
জালিয়াতির শীর্ষে গোবিন্দ : ১৯৯৯ সালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে আর্মস গার্ড পদে যোগদান করেন গোবিন্দ চন্দ্র পাল। ওই সময় গোবিন্দ স্ক্রিপ্ট রুমের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে রেকর্ড সাপ্লায়ার হন গোবিন্দ। পদোন্নতি পেলেও গত ২০ বছর ধরে পরীক্ষা শাখার স্ক্রিপ্ট রুমেই দায়িত্ব পালন করছেন গোবিন্দ পাল। ফলে সব কিছুই তার নখদর্পণে। এ সুযোগে জালিয়াতি করে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। সর্বশেষ নগরীর শীতলাখোলা এলাকায় ৩৭ লাখ টাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন দ্বৈত নাগরিক গোবিন্দ। কলকাতায়ও গোবিন্দের বাড়ি রয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তিন বছরের প্রেষণে এসে ১০ বছর : অরুণ কুমার গাইন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে আছেন দীর্ঘ ১০ বছর ধরে। ২০০৯ সালে প্রেষণে তাকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে বদলি করা হয়। প্রেষণে তিন বছরের বেশি কারো থাকার নিয়ম না থাকলেও তিনি আছেন ১০ বছর ধরে। পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের তালিকা করেন অরুণ কুমার গাইন। এরপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তা অনুমোদন দেন। এবার উচ্চতর গণিতে যে ১৮ পরীক্ষার্থীর জালিয়াতি ধরা পড়েছে তাদের খাতা দেখেছেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষক মনিমোহন। নিয়মানুযায়ী তার বয়স ৫৯ বছর হওয়ায় তিনি খাতা পেতে পারেন না। কিন্তু কিভাবে তিনি খাতা পেলেন তা জানা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এ বছর যে ১৮ পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র জালিয়াতি করেছে তাদের ১৩টি বিষয়ের সব পরীক্ষকই অরুণ কুমার গাইনের আস্থাভাজন।
পরীক্ষকরাও জড়িত : বরিশাল বোর্ডের উত্তরপত্র জালিয়াতির সাথে জড়িত ১৮ পরীক্ষার্থী তাদের খাতায় কিছু না লিখেই জমা দেয়। প্রতিটি খাতায় একটি লাল কালির দাগ দেয়া ছিল। এর ফলে গোবিন্দ সহজেই খাতাগুলো বের করে বাইরে পাঠায়। এরপর পরীক্ষার্থীরা উত্তরপত্র দেখে হুবহু খাতায় তুলে জমা দেয়। যদি খাতায় লাল দাগ থাকে সেটি প্রথমে নজরে আসার কথা পরীক্ষকের। কিন্তু কোনো পরীক্ষকই বিষয়টি বোর্ড চেয়ারম্যানকে অবহিত করেননি। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষা বোর্ড থেকে পরীক্ষকদের যে উত্তরপত্র প্রদান করা হয়েছে সেই উত্তরপত্র প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর হুবহু লেখার কথা নয়। উচ্চতর গণিতের প্রধান পরীক্ষক পিরোজপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার্থীদের লেখার গঠন এক হতে পারে কিন্তু ভাষাগত দিক থেকে হুবহু একই ধরনের হওয়ার কথা নয়। পরীক্ষকদের কাছে প্রথমেই বিষয়টি ধরা পড়া উচিত ছিল।
কেন্দ্রও কি জড়িত : উত্তরপত্র জালিয়াতির ব্যাপারে সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এইচ এম বাহার উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিদিন পরীক্ষা শেষে আমাদের একজন প্রতিনিধি পুলিশ ফোর্স নিয়ে বোর্ডে খাতা জমা দিয়ে আসেন। খাতার প্যাকেটের ভেতরে একটি গোপন পিন কোর্ড থাকে। আমি মনে করি কেন্দ্র থেকে এ ধরনের জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। গলাচিপা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফোরকান কবির বলেন, আমাদের এখানে পাঁচটি কলেজের ৮৭৫ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। এখানে জালিয়াতির সাথে জড়িতরা গলাচিপা মহিলা কলেজের ছাত্রী। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে খাতাগুলো প্যাকেট করে পিন কোডের সিল মেরে ডাকে পাঠিয়ে দেই। ডাকে উপজেলা থেকে জেলায় এর পর যায় বিভাগীয় শহরে। পোস্ট অফিসের লোকজন যখন শিক্ষা বোর্ডে খাতা নিয়ে যায় তখন সহজেই জানা সম্ভব কোনো উপজেলা থেকে খাতা এলো। এ দিকে পোস্ট অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে সিলগালা করে খাতাগুলো ডাকযোগে আসে। প্যাকেটের ওপরে প্রেরকের ঠিকানায় কেন্দ্রের নামসহ বিস্তারিত ঠিকানা উল্লেখ থাকে। শিক্ষা বোর্ডে প্যাকেটগুলো রিসিভ করেন রেকর্ড সাপ্লায়ার গোবিন্দ ও মজিবর।
এসব বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডে চেয়ারম্যান প্রফেসর মো: ইউনুস বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলা ঠিক হবে না। আমরা তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছি। তারা রিপোর্ট দেয়ার পরে বিস্তারিত জানাবো। দীর্ঘ দিন ধরে একই পদে কাজ করার ব্যাপারে চেয়ারম্যান বলেন, যারা বছরের পর বছর প্রেষণে আছেন তাদের তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।
উল্লেখ্য, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসির উত্তরপত্র জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে গত ১০ আগস্ট দৈনিক নয়া দিগন্তের তৃতীয় পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।


আরো সংবাদ