১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অর্থনীতি সমিতির সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব

এবার বোরো ধানে কৃষকের লোকসান হবে ৫০০ কোটি টাকা; কালো টাকা উদ্ধার ও সম্পদ কর থেকে ৯৫ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব
-

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য প্রায় সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার একটি বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। প্রস্তাবটি করেছেন সমিতি সভাপতি ড. আবুল বারকাত।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০১৯-২০’ তুলে ধরা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ ধরনের বিকল্প বাজেটের প্রস্তাবনা দিয়ে আসছে অর্থনীতিবিদদের পেশাদার এ সংগঠন। বাজেট উপস্থাপনাকালে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জামালউদ্দিন আহমেদসহ সমিতির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা সরকারের সম্ভাব্য পাঁচ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার দ্বিগুণেরও বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ দুই হাজার ৫১০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ৬৯ শতাংশ হবে প্রত্যক্ষ কর (আয়কর) ও ৩১ শতাংশ হবে পরোক্ষ কর (ভ্যাট), অর্থাৎ মোট বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৮১ শতাংশের জোগান দেবে সরকারের রাজস্ব আয়। বাজেটটি সম্পূর্ণ বৈদেশিক ঋণমুক্ত।
ড. বারকাত বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ২০টি নতুন উৎস চিহ্নিত করেছি, যা আগে ছিল না। এর মধ্যে অর্থপাচার রোধ, কালো টাকা উদ্ধার ও সম্পদ কর এ তিনটি উৎস থেকেই সরকার মোট ৯৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারে। আর এ টাকা দিয়ে প্রতি বছর তিনটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট অর্থায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না। বাজেটে ঘাটতি দুই লাখ ৩৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, কেউ হয়তো বলবেন অনেক বড় ঘাটতি। এ ক্ষেত্রে বলতে চাই জাপানে বাজেট ঘাটতি ২৫৬ শতাংশ। ঘাটতি বাজেটে অসুবিধা হলে এক পয়সাও ঘাটতি না রেখে আমাদের প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় দিয়েও মোট বাজেট প্রস্তুত করতে পারেন।
অর্থনীতি সমিতির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাতওয়ারি সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করেছে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে। এ খাতে মোট ব্যয় দুই লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তারপর আছে জনপ্রশাসন, পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত।
কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিষয়ে আবুল বারকাত বলেন, ‘আমরা মনে করি, প্রস্তাবিত বাজেটে বছরে কৃষি ও কৃষক ভাবনার যথার্থতা বিচারে এক লাখ ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে দুই লাখ বিঘা কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া সম্ভব। পাশাপাশি ২০ হাজার জলাহীন প্রকৃত মৎস্যজীবী পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ হাজার বিঘা খাস জলাশয় বন্দোবস্ত দেয়া সম্ভব। বিষয়টি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে এ লক্ষ্যে তিন হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দসহ বাস্তবায়ন কৌশল সংশ্লিষ্ট পথনির্দেশনা দেয়া জরুরি।’
কৃষি ফসলের উৎপাদন অঞ্চল গঠন ও কৃষককে কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য দেয়ার প্রস্তাব করে বারকাত বলেন, ‘এ বছর বোরো ধানে কৃষকের প্রকৃত লোকসান হবে কমপক্ষে ৫০০ টাকা। এ নিয়ে সরকারের চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমরা মনে করি কৃষককে তার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য জরুরিভাবে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারিভাবে সংগ্রহের ক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের তুলনায় কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়াতে হবে, সে ক্ষেত্রে এ বছরের বোরো ধানের মণপ্রতি বিক্রয়মূল্য হতে হবে কমপক্ষে ১২০০ টাকা।’
দেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ মানুষেরই কর্মসংস্থান হয় না উল্লেখ করে ক্রমবর্ধমান মানব বঞ্চনা-বৈষম্য-অসমতা দূরীকরণ, শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারার অধিকহারে বৈষম্য রোধ, কর্মসংস্থান বাড়ানো ও বেকারত্ব কমাতে অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি ‘জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কোষ’ গঠন, যুবকদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হতে উৎসাহিত করতে স্টার্ট আপ পুঁজি সরবরাহ এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫% বরাদ্দের প্রস্তাব দেন আবুল বারকাত।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে আবুল বারকাত প্রস্তাব করেন, ‘অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের মোকাবেলার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাদের পূর্ণউদ্যমে চালু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। সমস্যাটি জটিল তবে সমাধান সম্ভব বলে মনে করি।’
আগামী তিন বছরের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ভ্যাট লাইসেন্সধারীকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রস্তাব করে বলা হয়, এনবিআর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের ভ্যাট লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে বড়জোর এর মধ্যে একলাখ ভ্যাট প্রদান করে।
আবুল বারকাত বলেন, ‘সরকার সিগারেট থেকে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বিড়ি থেকে এক হাজার কোটি টাকা এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য থেকে এক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আসন্ন বাজেটে বিবেচনার জন্য আমাদের সুপারিশ হলো সিগারেটের কয়েক স্তরবিশিষ্ট মূল্যস্তর বাতিল করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের ওপর কমপক্ষে ৬০ টাকা আবগারী শুল্ক, প্রতি ২৫ শলাকার বিড়ির ওপর ১৫ টাকা আবগারী শুল্ক, আর প্রতি ১০০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ওপর ১৫০ টাকা আবগারী শুল্ক আরোপ করা হোক।
সমিতির আরো কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছেÑ ব্যক্তি পর্যায়ে কর হার কমিয়ে ৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ রাখা, ৫০ শতাংশ নি¤œতর কর দেয়ার যোগ্য কমপক্ষে ৫০ লাখ টিআইএনধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, বছরে কমপক্ষে এক কোটি টাকা বা তার বেশি ব্যক্তিগত আয়কর দেয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজারে বাড়ানো, ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ কালো টাকা উদ্ধার, অর্থপাচার রোধ থেকে আগামী অর্থবছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায়, নদী দখল ও দূষণ প্রতিকার, প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট উপখাতভিত্তিক কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া, নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ ও বীমা, রেমিট্যান্স প্রবাহকে ফলপ্রদ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহার এবং প্রবাসে কর্মীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্তকরণ, সার্বজনীন পেনশন, প্রবীণদের জন্য ‘প্রবীণ নীড়’ (বৃদ্ধাশ্রম নয়) গড়ে তোলা, পেনশনভোগীদের পেনশনের অর্থ বিনিয়োগের আয় থেকে সব ধরনের আয়কর, কর, শুল্ক সম্পূর্ণ রহিত করা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বারকাত জানান, অর্থমন্ত্রী হলেও তিনি একই বাজেট দিতেন। অর্থনীতি সমিতির কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী কতটুকু সন্তুষ্ট এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কিছু কর্মকাণ্ড অপ্রিয় হলেও তিনি বাধা দেন না। অনেক কিছুই তিনি গ্রহণ করেন। ভাবনার জিনিসগুলো নেন। এগুলো তিনি ভাবেন। তবে সব সময় তা গ্রহণ করতে পারেন না। অনেকেই আমাদের সব প্রস্তাব গ্রহণ করতে দেন না।


আরো সংবাদ