২২ আগস্ট ২০১৯

জাল আকামার কর্মীদের ফেরত পাঠাচ্ছে ইরাকি পুলিশ

জালিয়াতির হোতা ডাক্তার লিটন ধরাছোঁয়ার বাইরে ; বাগদাদে এখনো বন্দী ৫০ হতভাগ্য চলছে নির্যাতন
নির্যাতনের শিকার প্রবাসীরা -

ইরাকে বৈধভাবে পাড়ি জমানো ৫০ জন কর্মীকে এখনো টাকার দাবিতে ‘ডাক্তার নামধারী লিটন’ তার ভাড়া ফ্ল্যাটেই জিম্মি রেখে নির্যাতন চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরও তাদের দেয়া হচ্ছে না কোনো চিকিৎসা। গুরুতর এ বিষয়টি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছে।
এ দিকে কর্মীদের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে ঢাকা থেকে নগদ টাকা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে দেয়ার পাশাপাশি আকামা লাগানো বাবদ আরো ৩৪ হাজার ২০০ ডলার দেয়া হয়। তারপরও লিটন তার নিজস্ব কারখানায় তৈরি করা ‘জাল আকামা’ কর্মীদের ধরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি ইরাকের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া কর্মী ও তাদের স্বজনেরা নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, লিটনের হেফাজত থেকে তারা (শ্রমিক) ছাড়া পেলেও তাদের সবার পাসপোর্টে জাল আকামা লাগানোর কারণে এখন তারা পুলিশের ভয়ে ঘর থেকেই বের হতে পারছেন না। কোনো কোম্পানি তাদের কাজেও রাখছে না। ইরাক থেকে তাদের জানানো হয়েছে, যদি পুুলিশি অভিযানে তারা ধরা পড়ে যায় তাহলে তাদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হবে কারাগারে। এরপর জাল আকামা ব্যবহারের অভিযোগে জেল জরিমানা শেষে সরাসরি ঢাকার ফ্লাইটে তুলে দেশে পাঠিয়ে দেবে। ইতোমধ্যে ১৫-২০ শ্রমিককে পাসপোর্টে জাল আকামা লাগানোর অভিযোগে পুলিশ ধরে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। অনেকে এখনো ইরাকের জেলে রয়েছেন।
ক্ষুব্ধ স্বজনেরা বলছেন, এত কিছুর পরও ইরাকে জিম্মি নাটকের খলনায়ক লিটন কখনো নিজেকে ডাক্তার আবার কখনো ঢাকার প্রভাবশালীদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ইরাকে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছেন। শুধু তাই নয়, ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ্যে ব্যবহার করে জাল জালিয়াতি ও জিম্মি ব্যবসা চালাচ্ছে। ভুক্তভোগী রিক্রুটিং এজেন্সি ও প্রতারিত শ্রমিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, দূতাবাসের প্রশ্রয় পেয়েই লিটন ইরাকে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
লিটনের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল নয়া দিগন্তকে টেলিফোনে বলেন, আমরা লিটনের আস্তানা থেকে মুক্তি পেলেও ইরাকি পুলিশের অভিযান থেকে মুক্তি পাচ্ছি না। কারণ কথিত ডাক্তার লিটন আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আকামা বাবদ ২০০ ডলার নিলেও সবার পাসপোর্টে জাল আকামা লাগিয়ে দিয়েছে। এখন জাল আকামার (পাসপোর্টে স্টিকার) কারণে আমাদের কোথাও চাকরি হচ্ছে না। উপায় না পেয়ে ৫ দিনারের নামমাত্র একটি হোটেলে রাত কাটাচ্ছি। বলতে পারেন আত্মগোপনে আছি। মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেক চলছে। কী আর করব। তবে যতক্ষণ টিকতে পারি থাকব। এরপরও যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাই, তাহলে জেল খেটে দেশে চলে যাবো।
তিনি বলেন, আমরা যখন লিটনের বন্দিশালায় আটক ছিলাম, তখন তার লোকজন ঢাকা থেকে টাকা পাঠানোর জন্য শুধু আমাদের চাবুক দিয়ে পেটাত। ঠিকমতো খাবার দিতো না। এখনো তার হেফাজতে ৪০-৫০ জন আটক আছে। লিটন মাঝে মধ্যে ফ্ল্যাটে এসে বলে যেত, ‘দূতাবাস আমার হাতের মুঠোয়। তোদের বিষয়ে কেউ কথা বলতে আসবে না।’ এখানকার ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের পুলিশও আমার লোক। বাংলাদেশ কমিউনিটিও আমার নিয়ন্ত্রণে। আর দেশে ওমুক-তমুক আমার লোক বলে ভয় দেখাত। লিটন তাদের বলেছিল, যতক্ষণ টাকা না পাবো ততক্ষণ কেউ জিম্মিদশা থেকে তোদের ছাড়াতে পারবে না। মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার পরও গাইবান্ধার বাসিন্দা লিটন কিভাবে ভিনদেশে অপকর্ম করে বেড়ানোর সাহস পাচ্ছে? তাকে কি দূতাবাসের লোকজন আইনগতভাবে ধরতে পারে না? তিনি কিভাবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন? শুধু তাই নয়, লিটন একাধিক পাসপোর্টও ব্যবহার করছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে গত কয়েক দিন ধরে ‘ডাক্তার লিটন’ এর ইরাকে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, ওয়াটসআপ, ইমুতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
তবে লিটনের এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে ইরাকে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত রেজাউল কবির নয়া দিগন্তকে বলেছেন, লিটনের হেফাজতে বাংলাদেশী কর্মীদের জিম্মি রাখা, জাল আকামা তৈরি করে কর্মীদের দেয়া এবং একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়গুলো দূতাবাসের নজরে এসেছে। তার বিরুদ্ধে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। আমরা শুধু লিটন নয়, যে চক্র এসব জাল আকামা তৈরি করে কর্মীদের দিচ্ছে তাদের শনাক্তে এ দেশের পুলিশের হস্তক্ষেপ চেয়েছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত যা যা পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা নেবো আমরা।
গতকাল ইরাক থেকে বাংলাদেশ কমিউনিটির একাধিক নেতা নয়া দিগন্তকে জানান, ইরাকে বাংলাদেশীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায়ে দীর্ঘ দিন ধরে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রে লিটন ছাড়াও মোতাহার, মতিন ভাইসহ ২০-২৫ জন রয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে, দেশ থেকে শ্রমিকদের ভালো বেতন, থাকা খাওয়া ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে ইরাকে আনা। তারপর সিন্ডিকেটের সদস্যদের দিয়ে ভাড়া ফ্ল্যাটে তুলে আটকে রাখা। সেখান থেকেই তারা ঢাকায় কর্মীর স্বজনদের কাছে মোবাইল, বিকাশ ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলে। না দিলে শ্রমিকদের ওপর চাবুক দিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। পরে ওই ছবি স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে ভয় দেখায়। এভাবেই তারা ইরাকে জিম্মি ব্যবসা করে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের শ্রমবাজারটিকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে তুলছে। তারা এসব ক্রিমিনালকে অবিলম্বে দূতাবাসের কালো তালিকাভুক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানোর জোর দাবি জানান। উল্লেখ্য, লিটনের বন্দিদশায় আটক ছিলেন শতাধিক বন্দী। পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেককে দূতাবাস কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেন।
এ দিকে গতকাল নাজ অ্যাসোসিয়েটস থেকে পাঠানো এক প্রতিবাদে দাবি করা হয়েছে, গত ১৭ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে নয়া দিগন্তে ইরাক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আক্তার হোসেন নামে এক কর্মী ইরাক থেকে নাজ অ্যাসোসিয়েটস অফিস থেকে বিদেশ যাওয়ার যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আক্তার হোসেনকে বিদেশে পাঠানোর সাথে নাজ অ্যাসোসিয়েটসের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

 


আরো সংবাদ

৭৫-এর পরিকল্পনাকারীদের বিচারে জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি রাজধানীতে জেএমবির চার সদস্য গ্রেফতার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে ফিরে না গেলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ সচিবালয়ের আবাসন সমস্যা দূর করতে আরো ৫০০ ফ্যাট কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে ভেলায় সবজি চাষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান অবশেষে রোহিঙ্গারা ফিরছেন আজ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা : কাদের কাশ্মির নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে পাকিস্তান

সকল




mp3 indir bedava internet