১৭ আগস্ট ২০১৯

পোশাক খাতের মজুরি কমেছে ২৬ শতাংশ

সাড়ে ১২ শ’ কারখানা বন্ধে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুত ; ন্যূনতম মজুরি ২০২ ডলার বা ১৭ হাজার টাকা হওয়া উচিত
-

দেশে তৈরী পোশাক খাতের শ্রমিকের মজুরি নিয়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের সাথে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়েছে। ঘোষিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির কথা থাকলেও তা বাড়েনি। উল্টো ২৬ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি তাদের গবেষণায় আরো বলছে, সাড়ে ১২ শ’ কারখানা বন্ধ থাকায় তৈরী পোশাক খাতে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। যাদের মধ্যে মাত্র ছয় হাজার শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। অন্য দিকে বিজিএমইএ কর্তৃক সরকারের নির্দেশনা না মেনে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন সুবিধা ২০০ নন-কমপ্লেয়েন্ট কারখানায় অব্যাহত রাখা হয়েছে। আর শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপির তালিকায় এই খাতে ২৬ প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি ২০২ ডলার বা ১৭ হাজার টাকা হওয়া উচিত।
রাজধানীর মাইডাস ভবনে গতকাল টিআইবি তার নিজস্ব কনফারেন্স রুমে ‘তৈরী পোশাক খাতে সুশাসন : অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এইসব তথ্য প্রকাশ করেছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনে টিআইবি এই খাতের জন্য ১২টি সুপারিশ করেছে। এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সময় এপ্রিল ২০১৩ থেকে মার্চ ২০১৯ সাল পর্যন্ত। আর তথ্য সংগ্রহ হয়েছে মে ২০১৮ থেকে এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত। বেশি সংখ্যক তৈরী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে এমন এলাকা অর্থাৎ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার থেকে ৮০টি কারখানা এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত।
মজুরির বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের ঘোষিত মজুরি অনুযায়ী প্রথম গ্রেডে ছিল ৮ হাজার ৫০০ টাকা। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ঘোষিত প্রথম গ্রেডে নতুন মজুরি করা হয়েছে ১০ হাজার ৯৩৮ টাকা। কিন্তু ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসহ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে মজুরি হওয়ার কথা ছিল ১৩ হাজার ৩৪৩ টাকা। সেই হিসাবে মজুরি ২ হাজার ৪০৫ টাকা বা ২৮ শতাংশ কমেছে। এভাবে নতুন কাঠামোতে মজুরি সার্বিকভাবে ২৬ শতাংশ কমেছে। তুলনাযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি কম। বাংলাদেশে মজুরি ১০১ ডলার, কম্বোডিয়া ১৯৭ ডলার, ভারত ১৬০ ডরার, ভিয়েতনাম ১৩৬ ডরার, ফিলিপাইন ১৭০ ডলার। বাংলাদেশের এই মজুরি হার ২০২ ডলারে উন্নীত করা প্রয়োজন। বলা হয়েছে, তৈরী পোশাক খাতে বেশির ভাগ সাব-কন্ট্রাক্ট নির্ভর কারখানায় ন্যূনতম মজুরি দেয়া হয় না। গ্রেডিং বৈষ্যমের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৫ হাজার শ্রমিককে আসামি করে ৩৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ১৬৮টি কারখানায় ১০ হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
পোশাক খাতে অগ্নি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পাঞ্চলে ১১টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ না হওয়া। ৩০ মিটার উচ্চতার ঊর্ধ্বে কোনো ভবনের অগ্নি নির্বাপণে ফায়ার সার্ভিসের লজিস্টিক ঘাটতিও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স কর্তৃক অধিভুক্ত প্রায় সব কারখানায় (৪৩৪৬টি) প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ করা হয়েছে। তবে সমন্বিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্কার কাজের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ কারখানার অগ্রগতি ৫০ শতাংশের নিচে। যার বেশির ভাগ কারখানা (৭১১টি) জাতীয় উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। নতুন বা স্থানান্তরিত ৯৫০টি কারখানা এখনো পরিদর্শক কার্যক্রমে যুক্ত হয়নি। সরকারের নির্দেশনা না মেনে বিজিএমইএ কর্তৃক ২০০ নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানায় ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) সুবিধা অব্যাহত রয়েছে।
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক কারখানা সংস্কারে তহবিল গঠনের ইতিবাচক উদ্যোগ সত্ত্বেও যথাযথ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে জাইকার তহবিল দীর্ঘদিন ধরে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। আবার গ্রিন ফ্যাক্টরিতে কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে বায়ার কর্তৃক যথোপযুক্ত মূল্য প্রদান না করায় গ্রিন ফ্যাক্টরি তৈরিতে নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে, পোশাক পল্লী তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও সাব-কন্ট্রাক্টনির্ভর ও ছোট কারখানাগুলো পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পোশাক পল্লী তৈরির পরিকল্পনার অগ্রগতি হয়নি। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সাব-কন্ট্রাক্টনির্ভর কারখানার জন্য গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগেরও কোনো অগ্রগতি নেই। অন্য দিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিরোধ নিষ্পত্তি সেল গঠনের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি।
টিআইবি বলছে, খেলাপি ঋণ ছাড়াও সম্পূরক শিল্পে নীতি সহায়তায় ঘাটতি রয়েছে। যেমন, দেশী কাপড় ব্যবহারে রফতানির ৪ শতাংশ নগদ সহায়তার অর্থ প্রাপ্তিতে ৩ থেকে ৪ বছরের দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ প্রাপ্তির জন্য ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাপড় ও সুতা দেশীয় বাজারে বিক্রির ফলে সম্পূরক শিল্পের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৬৮টি কারখানায় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা, ৪০ বছর ঊর্ধ্বে শ্রমিক এবং নানা অজুহাতে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতি এবং জোর করে ইস্তাফাপত্রে সাক্ষ্য নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গবেষণার আওতাভুক্ত বেশির ভাগ কারখানায় চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার মজুরি বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেলেও বায়ারদের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে অনাগ্রহও দেখা গিয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন মজুরি কাঠামোতে মালিকপক্ষের মূল মজুরি ২৩ শতাংশ বাড়ানোর দাবি করলেও প্রকৃত হিসাবে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে প্রায় ২৬ শতাংশ কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২৬ থেকে ৩২ শতাংশও। মজুরি তো বাড়েইনি। বরং যারা আন্দোলন করেছে তাদের পাঁচ হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, পোশাক খাতে গত ৬ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও তা প্রত্যাশিত নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে গেছে। শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি পর্যাপ্ত দৃষ্টি পাচ্ছে না। মালিকদের সুবিধার জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রণোদনাও দেয়া হয়েছে। এর সাথে শ্রমিক অধিকার প্রত্যাশিত লক্ষণীয় নয়। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কম। এটা ২০২ ডলার বা ১৭ হাজার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, যারা ব্যবসা করছেন তারা মুনাফা করে যাচ্ছেন। বায়ার ও মালিকেরা সুবিধা পাচ্ছেন।


আরো সংবাদ




bedava internet