১৭ জুন ২০১৯

সিদ্ধিরগঞ্জ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়নি ১১ বছরেও

ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণ
-

উন্নয়ন কর্মসূচির সব প্রকল্পের বাস্তবায়ন একই ধাঁচে চলছে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্পেরও একই দশা। ঢিমেতালে চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ।। সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ১১ বছরেও শেষ হলো না। অথচ প্রকল্পটি তিন বছরে সমাপ্ত করার কথা ছিল। এখনো প্রকল্পের কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সরকারকে প্রকল্পের পেছনে বাড়তি অর্থজোগান দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনা থেকে এসব বেরিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের প্রকল্প প্রণয়নের দক্ষতা নেই। যার কারণে প্রকল্প অনুমোদনের সময় এক ধরনের ডিপিপি করে তা তৈরি করা হয়। একনেকে পাশ করিয়ে নেয়ার পর তা আবার পরিবর্তন করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা স্থায়ীভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে মেটানোর জন্য সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। দুই হাজার ৭৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। প্রকল্প অনুমোদন নিয়েই তার ধরনে পরিবর্তন করে বাস্তবায়নকাল চার বছর বাড়িয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর পার করে দিয়ে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। সেখানে ব্যয় বাড়ানো হয় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। এটিতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল একনেকে প্রথম সংশোধনী এনে ‘সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ’ শিরোনামে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। তখন প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৩৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এরপর ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনামন্ত্রী প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করেন। সেখানে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ১৪৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ২০১৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা বলা হয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে প্রকল্পের কর্মপরিধির কিছুটা পরিবর্তন হওয়ায় ব্যয় বাড়ানো হয়। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ করার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সংশোধিত প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপির ওপর পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগে ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সুপারিশের জন্য পুনর্গঠিত আরডিপিপি-২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। বিদ্যমান পরিপত্র অনুসারে প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধন প্রক্রিয়াকরণের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে আবারো অনুমোদন নেয়া হয়েছে। এদিকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পিইসি সভার সুপারিশের ভিত্তিতে ১৭২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় কমিয়ে মোট তিন হাজার ৯৭১ কোটি ২৯ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়নে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রথম পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক ৩৫ কোটি ডলার দিয়েছিল। এখন আবার নতুন করে ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছে। এই ঋণের অর্থ ৩৮ বছরে পরিশোধ করতে হবে। যাতে বাংলাদেশকে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ০.৭৫ শতাংশ হারে বছরে প্রদান করতে হবে।
প্রকল্পের কার্যক্রমগুলোর মধ্যে আছে গ্যাস টারবাইন জেনারেটর, গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, স্টিম টারবাইন জেনারেটর, কুলিং টাওয়ার, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ইমার্জেন্সি ডিজেল জেনারেটর, স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার, কন্ট্রোল ইক্যুইপমেন্ট, ম্যান্ডেটরি স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদি সংগ্রহ করা। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নির্মাণ, যন্ত্রপাতির সাথে সংশ্লিষ্ট সিভিল ওয়ার্কস, যন্ত্রপাতি স্থাপন, টেস্টিং ও কমিশনিং, গ্যাস সংযোগের জন্য আর এম এস নির্মাণ, স্কুল বিল্ডিং নির্মাণ ও অনাবাসিক পূর্তকাজ, ও অ্যান্ড এম অপারেটর সার্ভিস এবং যানবাহন সংগ্রহ করা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে মেয়াদ বাড়লেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়বেই। কারণ বাস্তবায়ন না হলেও প্রকল্পের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বাড়ি ভাড়া, গাড়ির জ্বালানি, বিদ্যুতের ব্যবহারসহ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ব্যয়গুলো কিন্তু চলতেই থাকে। অন্য দিকে সময়মতো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ওই প্রকল্পটি থেকে যে সুফল প্রাপ্তির কথা তা থেকে দেশ ও দেশের মানুষ বঞ্চিত হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের প্রকল্প প্রণয়নের দক্ষতা নেই। যার কারণে প্রকল্প অনুমোদনের সময় এক ধরনের ডিপিপি করে তা তৈরি করা হয়। একনেকে পাস করিয়ে নেয়ার পর তা আবার পরিবর্তন করা হয়। বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তায় নিতে ডিপিপি তৈরি করা উচিত। তা না হলে এভাবে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে আর প্রকল্প শেষ করতে বছরের পর বছর পার হয়ে যাবে। দেশ এ থেকে কোনো ধরনের লাভবান হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থউপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, যখন কোনো মন্ত্রণালয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে তখন ভবিষ্যতে প্রকল্প সম্পর্কিত জিনিসের দাম বাড়বে জেনেই নিয়েই প্রকল্প করে। খুব কমসংখ্যক প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশোধনের সময় দাম বাড়েনি। তিনি বলেন, মন্ত্রণায়গুলো প্রকল্প একনেক থেকে পাস করিয়ে নেয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যয় কম দেখায়। প্রকল্প অনুমোদন পেলে কিছু দিন পর আসে ব্যয় সংশোধনের জন্য। ব্যয় বড় আকারের হলে পাস করানো কঠিন হবে, তাই এ ধরনের একটা চালাকি তারা করে থাকে।


আরো সংবাদ