২০ নভেম্বর ২০১৮

সন্তানের পরীক্ষা নিয়ে মা-বাবার যুদ্ধ

-

আলু সেদ্ধ করে রেখেছি। কিন্তু পেঁয়াজ ও মরিচ কেটে ভর্তা করার সময় পায়নি। মেয়েকে কোচিং থেকে নিয়ে আসার পথে হোটেল থেকে তরকারি কিনে এনে ভাত খেয়েছি। অনেক দিন ধরে সকালে বাসায় রান্নাও বন্ধ। হোটেল থেকে ডাল-পরোটা কিনে খাই। অনেক সময় এক সপ্তাহও পার হয়ে যায় গোসল করতে পারি না।
কথাগুলো বললেন রাজধানীর মধ্য বাডডার বাসিন্দা লিমা রহমান। লিমা বলেন, তার এক ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আরেক মেয়ের ১৮ নভেম্বর থেকে সমাপনী পরীক্ষা শুরু হবে। আরেক সন্তান ছোট, এখনো স্কুলে যায় না।
লিমা রহমান বলেন, সন্তানদের পরীক্ষায় পরীক্ষায় আমাদের জীবন ছারখার হয়ে গেল। এই সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা না থাকলে জীবনটা এভাবে দুর্বিষহ হতো না। সন্তানদের পড়াতে পড়াতে আমাদেরও মাথা নষ্ট হওয়ার পথে। জীবনে কোনো দিন নিজের পরীক্ষা নিয়েও এত দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। এত অস্থির হতে হয়নি। কিন্তু এখন সন্তানের পড়ালেখা আর ঘন ঘন পরীক্ষার কারণে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ। জীবনটা শেষ হয়ে গেল সন্তানদের পড়া আর পরীক্ষার পেছনে।
রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার অধিবাসী হামিদুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলেকে যদি এখন প্রশ্ন করা হয় তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ কে? আমার মনে হয় সে বলবে আমার বাবা। এর কারণ কয়েক মাস ধরে আমি তাকে নিয়মিত পড়াই। আগামী ১৮ তারিখ সে সমাপনী পরীক্ষা দেবে। তাকে পড়াতে গিয়ে প্রতিদিন পেটাতে হচ্ছে। পড়া এত কঠিন আর এত বেশি যে, না পেটালে এ পড়া তাকে দিয়ে আদায় করা সম্ভব নয়। পড়া বেশি ও কঠিন হওয়ায় তারা এতে কোনো আনন্দ পায় না। মনোযোগ দিতে পারে না। ফলে পেটানো ছাড়া আর কোনো গতি নেই। না পেটালে ভালো ফল তো দূরের কথা, ঠিকমতো পাস করবে কি না সন্দেহ। বিশেষ করে গণিত। তিনি বলেন, আমার ছেলের বয়স ১১ বছর পার হয়েছে। গণিতে সে সবচেয়ে দুর্বল। গণিতে তার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমি তাকে অনেক সময় দিয়েছি। প্রায় প্রতিটি বিষয় তাকে অনেক ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়েছি। কিন্তু এক দিন দুই দিন পার হলেই সে আর তা মনে রাখতে পারে না। মনে হয় কোনো দিন তাকে এ গণিত করানোই হয়নি এমন অবস্থা। যতই চেষ্টা করা হচ্ছে সে উন্নতি করতে পারছে না। আসলে গণিত এত কঠিন আর বিস্তারিত যে, এটি ধারণ করার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। তাই বুঝিয়ে বললেও কাজ হচ্ছে না। গণিতে অনেক সময় দেয়ার পরও স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষায় সে মাত্র ৩৯ পেয়েছে। আমরা ভীষণ চিন্তায় আছি সমাপনী পরীক্ষায় সে কেমন করবে। তাকে গণিত পড়াতে গেলে মেজাজ ঠিক রাখতে পারি না। একই অবস্থা ইংরেজিতে। কোথায় ডু আর কোথায় ডাস বসবে এবং কোথায় এস বা ইএস যোগ হবে, তাকে সেটি অনেক বুঝিয়ে দেয়ার পরও মনে রাখতে পারে না। তাই পড়াতে বসলে প্রতিদিনই সে মার খাচ্ছে। এসব কারণে আমার ছেলে এখন আমাকে আর সহ্য করতে পারে না। আমাকে সে পছন্দ করে না। আমার প্রতি তার যে ভালোবাসা আকর্ষণ ছিল বাবা হিসেবে তা মনে হয় তার মন থেকে চলে গেছে। পড়ানোর কারণে আমারও মন ত্যক্তবিরক্ত। সমাপনী পরীক্ষা আমাদেরকে এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
হামিদুল আফসোস করে বলেন, অথচ তাকে আমি পড়ানোর আগে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সালাম দিয়ে বিদায় জানাত। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দৌড়ে আসত। আমি বাসায় প্রবেশ করলে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বাসায় থাকলে আমার কাছে কাছে থাকতে চাইত। মন খুলে আমার সাথে কথা বলতে চাইত। কিন্তু সেই ছেলে এখন আর আমার ধারে কাছেও ঘেঁষতে চায় না। বরং দূরে দূরে থাকে এবং আমি বাসায় না থাকলেই সে খুশি। একমাত্র সমাপনী পরীক্ষাই এর জন্য দায়ী।
হামিদুল বলেন, সন্তানের পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে মা-বাবার যেমন আছে সামাজিক প্রতিযোগিতা, তেমনি আছে পরে তার ভালো স্কুলে ভর্তি না হতে পারার সমস্যা। সে কারণে বাধ্য হয়ে আমরা তাদের নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আর এর নির্মম শিকার হচ্ছে তারা। সব কিছু বুঝেও আমরা এসব খুব একটা এড়াতে পারছি না। মনে হচ্ছে লেখাপড়ার নামে আমরা আমাদের প্রিয় সন্তানদের হত্যা করছি। সুস্থভাবে জন্ম নিয়েও আমরা তাদের নির্যাতন করতে করতে প্রতিবন্ধী করে তুলছি। তাদের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিচ্ছি।
শাহজাহানপুরের গৃহিণী ফেরদৌসী জানান, তার তিন সন্তান। এর মধ্যে দু’জনের পরীক্ষা। এক সন্তান কোলে। বড় সন্তানের সমাপনী পরীক্ষা, দ্বিতীয় সন্তান প্রথম শ্রেণীতে স্কুলের পরীক্ষা। সংসারের সব কাজ, ছোট সন্তান দেখাশোনা ও বড় দু’জনকে পড়ানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হচ্ছে। আমাদের অবস্থা পাগল হওয়ার মতো। সংসারের সব কাজের পাশাপাশি সারা দিন সন্তানদের পড়া নিয়ে চিৎকার ও চেঁচামেচিতে দিন পার হয়। পাশে বসে না থাকলে কেউ পড়তে চায় না। পড়ার কারণে প্রতিদিন তাদের মারতে হয়। এ ছাড়া উপায় নেই।
ফেরদৌসী জানান, সমাপনী পরীক্ষাটা না থাকলে জীবনটা আরেকটু সহজ হতো। আমাদের জীবন খুবই কঠিন আর জটিল হয়ে গেছে ঘন ঘন পরীক্ষার কারণে।
সারা দেশের প্রায় সব অভিভাবকের অবস্থা আজ কমবেশি এভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষার কারণে। শুধু সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা ঘিরে প্রায় কোটি অভিভাবকের জীবনে নেমে এসেছে বহুমাত্রিক অস্থিরতা আর হতাশা। পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় অনেক অভিভাবকের অবস্থা পাগলপ্রায়। পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়া ঘিরে ঘরে ঘরে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুরা। অন্য দিকে এ পরীক্ষা ঘিরে অনেকে লিপ্ত নানা ধরনের বাণিজ্যে। শিশুদের সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা ও পড়া নিয়ে যত অভিভাবকের সাথে এখন পর্যন্ত কথা হয়েছে তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সবাই বাতিল চেয়েছেন এ পরীক্ষা।


আরো সংবাদ