১৮ নভেম্বর ২০১৮

শৈশবের ছবি হাতে স্বজনের খোঁজে ডেনমার্ক থেকে ৪১ বছর পর পাবনা

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক মিন্টো ও তার স্ত্রী এনিটি ; ছেলেবেলার মিন্টো : নয়া দিগন্ত - ছবি : নয়া দিগন্ত

পরিবার থেকে ছিটকে পড়েছিল ছয় বছর বয়সী শিশু মিন্টো। ৪১ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল পাবনার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে। শুধু এটুকুই স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে তার মনে। সাথে আছে শৈশবের কয়েকটি ছবি আর শৈশবের সেই পাসপোর্ট। বলতে পারেন না বাংলা। এখন তিনি ডেনমার্কের নাগরিক।

সেই ছবি হাতে নিয়ে ৪১ বছর পর পাবনায় ফিরে এসে নিজের হারানো স্বজনদের খোঁজে পথে পথে ঘুরছেন মিন্টো কার্স্টেন সনিকসং তার স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে। বাবা-মাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় বুধবার পাবনা প্রেস কাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

মিন্টো পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। চিকিৎসক স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে সাথে নিয়ে দিন দশেক আগে পাবনায় এসেছেন। সেই থেকে আছেন একটি হোটেলে। এই ক’দিন ধরে এ দম্পতি পাবনা শহর আর নগরবাড়ি এলাকায় ঘুরছেন, যাচ্ছেন এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম, নদীনালা পথঘাট ঘুরে ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে চাইছেন- কেউ সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির বিষয়ে কোনো তথ্য জানে কি না।

মিন্টোর শৈশবের ছবিসহ বাংলায় লেখা একটি লিফলেট তারা বিলি করছেন। সেখানে লেখা- ‘১৯৭৭ সালের দিকে, প্রায় ৪০ বছর আগে, আপনি কি আপনার পরিবারের কোনো সদস্যকে হারিয়েছেন?’

সংবাদ সম্মেলনে মিন্টো বলেন, শৈশবের আসল নাম তার আর মনে নেই। একটি শিশু সদন থেকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি। তাদের স্নেহে ডেনমার্কেই বড় হয়েছেন, বিয়ে করে সংসারি হয়েছেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে তাদের।
সেই শিশু সদন থেকে মিন্টো জানতে পেরেছেন, তার নাম মিন্টু। পাবনার নগরবাড়ি ঘাটে অভিভাবকহীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন ঢাকার ঠাঁটারিবাজার এলাকার চৌধুরী কামরুল হুসাইন। তিনিই ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল তাকে শিশু সদনে রেখে যান। পরে পালক বাবা-মায়ের সাথে মিন্টো চলে যান ডেনমার্কে।

মিন্টো বলেন, ছোটবেলায় বিষয়গুলো তেমনভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে আত্মপরিচয়ের সঙ্কট দানা বাঁধতে থাকে মনের ভেতরে। কারণ ডেনমার্কে আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন আমার শেকড়ের খবর। মানসিক কষ্ট আর যন্ত্রণা আমাকে উইপোকার মতো কুরে কুরে খেতে থাকে। ডেনমার্কের কোনো কিছুর অভাব হয়নি কখনো, কিন্তু একটি শূন্যতা সব সময় বুকের গভীরে ত তৈরি করে বাসা বাঁধে। আমি ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগত না। পরিবারের লোকজনের সাথে দুর্ব্যবহারও করেছি কখনো কখনো। তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র হাতে ছিল না। তারপরও প্রাণের টানে নিজের বাবা-মা, স্বজনদের খোঁজে আমার পাবনায় আসা।

গত ১০ দিনের সন্ধানে আশা জাগার মতো কোনো তথ্য মিন্টো পাননি। সকাল বেলায় স্ত্রীকে সাথে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পথে পথে চলে খোঁজ নেয়ার কাজ। বাংলা বলতেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না। কিন্তু বুকে হাত রেখে বাবা-মায়ের কথা বোঝাতে চান এবং তাদের সন্ধান চান। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে আসার পর চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলেই মনে হয় আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি। ছোটবেলায় বাংলায় হয়তো কথা বলতে পারতাম, পরে ভুলে গেছি। কিন্তু এখন বাংলা কথা কানে এলেও অন্যরকম এক অনুভূতি হয় আমার, আমি বলে বোঝাতে পারব না।’ নাড়ির টানে শেকড়ের খোঁজে প্রায় অসম্ভব এই চেষ্টায় মিন্টোকে সহযোগিতা করছেন পাবনার বাসিন্দা স্বাধীন বিশ্বাস। ফেসবুকে পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব।

স্বাধীন বিশ্বাস বলেন, ‘ফেসবুকে কথা হলে ওকে দেশে আসতে বলেছিলাম আমি। ও চলে এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি ওর স্বজনদের খুঁজে বের করার।’ তিনি জানান, অনেকেই স্বজন সেজে এসেছে, কিন্তু মিলাতে পারছে না মিন্টো।

স্বজনের সন্ধানে ইতোমধ্যে পাবনার পুলিশের সাথেও যোগাযোগ করেছেন মিন্টো। সদর থানায় একটি জিডি করেছেন তিনি।
পুলিশ মিন্টোকে সহযোগিতা করছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শামিমা আকতার বলেন, ‘পুলিশের প থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব তা করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোও হয়তো তাকে সহযোগিতা করতে পারে।’ ভাগ্যে থাকলে তিনি ফিরে পেতেও পারেন তার স্বজনদের।


আরো সংবাদ