২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী তিন ধারায় বিভক্ত বিএনপি

মাদারীপুর-১ আসন
মাদারীপুর-১ - ছবি : সংগৃহীত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও মাদারীপুর জেলায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। তবে এ জেলায় জামায়াতে ইসলামীর কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে। নানা উৎসব উপলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগ শুরু করেছেন। বড় বড় হাট-বাজারে পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে। তবে প্রচার-প্রচারণায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে।

জেলার তিনটি আসনের মধ্যে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে আছে। এখানে দলটির একক প্রার্থী নুর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী)। অপর দিকে, শিবচর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা তিন ধারায় বিভক্ত। দলীয় পদ পাওয়া না পাওয়াকেই কেন্দ্র করে এ বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সব কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করেন তিন গ্রুপের নেতাকর্মীরা। ফলে এখানে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নামই শোনা যাচ্ছে।

শিবচর পৌরসভাসহ ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-১ আসন। পৌরসভা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের পরিসংখ্যানে বড় দল দু’টি সমানে সমান হলেও মূলত এটিতে আওয়ামী লীগের প্রভাব বেশি। আসনটিতে ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ৮২৫ জন।

আওয়ামী লীগ : মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে আওয়ামী লীগে দলীয় কোনো গ্রুপিং নেই। দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটি। তাই নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য একক প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য নুর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী)। তিনি এ আসনে টানা ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর-১ আসনকে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক বলা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় লাভ করে আসছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এলেও আওয়ামী লীগ খুবই বড় ব্যবধানে জয় লাভ করবে বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা দাবি করছেন।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর বড় বোনের বাড়ি শিবচরের দত্তপাড়ায়। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর বিচরণ ছিল এ এলাকায়। এ জন্য আওয়ামী লীগ গঠিত হওয়ার পর থেকে এ আসনে দীর্ঘ সময় থেকে তৃর্ণমূল পর্যায়ে দল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মাদারীপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় বোনের ছেলে মরহুম ইলিয়াছ আহম্মেদ চৌধুরী। তিনি সবার কাছে দাদাভাই হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি মারা যাওয়ার পর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিজয়ী হন তার বড় ছেলে নুর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী)। বর্তমান সংসদে তিনি আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সেক্রেটারি ও অনুমিত হিসেবে কমিটির সভাপতি।

নুর-ই-আলম চৌধুরী আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে হওয়ায় এ আসনে দলের অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন চাননি। যে কারণে নুর-ই-আলম চৌধুরীর একক নেতৃত্বে শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজাতে সম হয়েছেন। এ আসনে উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও সকল সহযোগী সংগঠনের প্রতিটি ইউনিটের শক্তিশালী কমিটি রয়েছে।

পদ্মাসেতুর এপারে শিবচর উপজেলার অবস্থান হওয়ায় এখানে চলছে নানা উন্নয়নকাজ। এলাকায় রাস্তা ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। শিবচর এখন একটি উপশহরে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার আত্মীয় হওয়ায় উন্নয়নকাজের জন্য নুর-ই-আলম চৌধুরীকে কারো কাছে হাত পাততে হচ্ছে না। তাই দীর্ঘদিন ধরে এখানে নুর-ই-আলম চৌধুরীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে তিনি বিশাল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেন।
শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামসুদ্দিন খান বলেন, এ উপজেলায় আমাদের এমপি নুর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) ছাড়া দলের অন্য কোনো প্রার্থী নেই। তিনি বারবারই এখানে একক প্রার্থী। তার বিকল্প কেউ নেই। তার হাত ধরেই এই উপজেলার সকল উন্নয়ন হয়েছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহদফতর সম্পাদক শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এখানে আওয়ামী লীগ বলতে আমরা নুর-ই-আলম চৌধুরীকে (লিটন চৌধুরী) বুঝি। তার সফল নেতৃত্বের কারণে শিবচরে আওয়ামী লীগে কোনো গ্রুপিং নেই। এই আসনে তিনিই দলের একক প্রার্থী।
বিএনপি : এ আসনে বিগত দিনগুলোতে বিএনপির অবস্থান ভালো থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে নেতৃত্ব শূন্যতার কারণে দল অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। শিবচর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন তিন ধারায় বিভক্ত। দলীয় পদ পাওয়া না পাওয়াকে কেন্দ্র করে এ বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সব কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করেন তিন গ্রুপের নেতাকর্মীরা।

শিবচর উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে প্রকাশ্যে গ্রুপিংয়ের সূত্রপাত হয়। এ সময় সাবেক উপজেলা সভাপতি নাজমল হুদা মিঠু চৌধুরী ও কেন্দ্র ঘোষিত উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লার বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলো।

নাজমল হুদা মিঠু চৌধুরীর মৃত্যুতে সভাপতি পদ শূন্য হওয়ায় দলীয় স্বার্থ বিবেচনা না করে এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আ: খালেক মৃধাকে ডিঙ্গিয়ে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। ফলে বিএনপি হঠাৎ করে দুই থেকে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সব কর্মসূচি পৃথক পৃথকভাবে পালন করা শুরু করে। সম্প্রতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিও পৃথকভাবে পালন করা হয়।

ত্রি-ধারায় বিভক্ত উপজেলা বিএনপির একপরে নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও মাদারীপুর-১ আসনের নবম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লা। তার সাথে বিএনপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের রয়েছে সুসম্পর্ক। তবে তার নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটির ১ম যুগ্ম আহ্বায়ক আ: মান্নান খানসহ তিনজন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং কয়েকজন বিএনপি সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। অপর দিকে, নাজমুল হুদা মিঠু চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী নাদিরা মিঠু চৌধুরী একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নেতৃত্বাধীন এ গ্রুপ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সব কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করে আসছে।

শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো: মতিয়ার রহমান খান জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এবং তিন বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ: খালেক মৃধাকে ডিঙ্গিয়ে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান নিজেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি চট্টগ্রামে নিজ ব্যবসায় বেশি মনোনিবেশ করে থাকেন। তার কারণেই শিবচর উপজেলা বিএনপি আজ তিন ধারায় বিভক্ত। দিন দিন এ বিরোধ বাড়ছে এবং আগামীতে তা সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের আশঙ্কা। এ বিভক্তির কারণে এ আসনে বিএনপির একাধিক নেতা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।

এ আসনে কেন্দ্র ঘোষিত শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লা, নাদিরা মিঠু চৌধুরী, শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি আব্দুল হান্নান মিয়া এবং সাংবাদিক মরহুম মোতাহার হোসেন সিদ্দিকীর ছেলে বিএনপি নেতা সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকী সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হতে চান বলে শোনা যাচ্ছে। তবে জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লা, আব্দুল হান্নান মিয়া ও সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকীকে নির্বাচনী মাঠে দেখা যাচ্ছে না। জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লা ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। নাদিরা মিঠু চৌধুরী উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

শিবচর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো: ইমতিয়ার চৌধুরী বলেন, শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি, চরজানাজাতসহ পদ্মা নদী বেষ্টিত কয়েকটি ইউনিয়নের নদী ভাঙনকবলিত মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে থেকেই উপজেলা বিএনপি নেত্রী নাদিরা মিঠু চৌধুরী তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে সাহায্য করেন। কেন্দ্র ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচি তার নেতৃত্বে আমরা সফল করছি। নাদিরা মিঠু চৌধুরীকে মনোনয়ন দিলে আমরা শতভাগ আশাবাদী বিএনপি তথা ধানের শীষের বিজয় হবে।

এ ব্যাপারে নাদিরা মিঠু চৌধুরী বলেন, রাজনীতির কারণে জীবনে অনেক ত্যাগ শিকার করতে হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছি। এলাকার মানুষও এ কারণে আমাকে ভালোবাসে। তাই যদি দল আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি নির্বাচন করব। সুষ্ঠু ভোট হলে আর দল আমাকে মনোনয়ন দিলে ইনশা আল্লাহ নির্বাচিত হবো।

মাদারীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য এখনো প্রার্থীর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সময় হলে দল থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন : এ আসনে জাতীয় পার্টির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। তবুও জাতীয় পার্টির প থেকে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পার্টির সদস্য ও মাদারীপুর জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম মিন্টুর নামও শোনা যাচ্ছে। তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও পরে হাইকমান্ডের নির্দেশে তা প্রত্যাহার করেন।

এ ছাড়া এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের নেতা হাফেজ মোহাম্মদ জাফর দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী। তার মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।


আরো সংবাদ