১৪ নভেম্বর ২০১৮

বিলুপ্তির পথে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান

ঢেউয়ের ঝাপটায় শত শত গাছ উপড়ে গেছে
-

পর্যটননগরী কুয়াকাটার সৌন্দর্যমণ্ডিত নারিকেল বাগানের পর এবার বিলুপ্তির পথে ‘কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান’। আগত পর্যটকদের বিনোদনকেন্দ্র জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ ঝাউবাগান। চলতি বর্ষায় এ বাগানের ৭০ শতাংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। আগামী জোতে বাকি অংশটুকুও সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন স্থানীয় জেলেরা। ঢেউয়ের ঝাপটায় ঝাউবাগানের শত শত গাছ উপড়ে পড়ে আছে সমুদ্রসৈকতে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে মোটরসাইকেলে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা। এক কথায় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় পর্যটকদের বিনোদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তৈরি বন বিভাগের এ প্রকল্পটি প্রায় সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। রক্ষার কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানটি অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, পর্যটকের বিনোদনকেন্দ্র কুয়াকাটার জাতীয় উদ্যান দাঁড়িয়ে আছে শুধু নাম নিয়ে। সৌন্দর্যমণ্ডিত এ উদ্যানটি প্রকৃতির ভয়াল ছোবলে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রে জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে কূলে। প্রচণ্ড ঢেউয়ের ঝাপটায় জাতীয় উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ ঝাউবাগানের অসংখ্য গাছ সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে মোটরসাইকেলে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার পথে পর্যটকেরা প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন। ভোর রাতের দিকে গঙ্গামতি যাওয়ার পথে সৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঝাউগাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এত কিছুর পরেও এগুলো সরানো কিংবা জাতীয় উদ্যানটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এ ছাড়াও নজরকাড়া আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন লেকটি পরিণত হয়েছে কচুরিপানায় ভর্তি বদ্ধ-জলাশয়ে। চার দিকের বর্ণিল পাতাবাহার গাছগুলো নেই, পরিণত হয়েছে জঙ্গলে। লেকটির মাঝখানের কাঠের ব্রিজটি ভাঙাচোরা কঙ্কালের মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। ছয়টি প্যাডেল বোটের হদিস নেই। বাঁধানো ঘাটগুলোয় পুরো শ্যাওলার আস্তরণ, বিশেষ করে পিকনিক স্পটের টিনের ছাউনির ঘরগুলো। লেকটি ভ্রমণের মূল সড়কটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। পর্যটক দর্শনার্থী এখন আর এ পথে এগোয় না। কয়েক বছর আগের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যমণ্ডিত ইকোপার্কটি এখন দেখলে সবাই আশাহত হয়। প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে ক্ষরণ হয়। বন বিভাগের চরম উদাসীনতায় জাতীয় উদ্যানের ইকোপার্কটির এ হাল হয়েছে। কুয়াকাটা পর্যটন এলাকার সবচেয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত স্পট ছিল জাতীয় উদ্যানটি, যা এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। সিডর আইলার মতো সুপার সাইক্লোন কিংবা মহাসেনের মতো জলোচ্ছ্বাসে কয়েক দফা বিধ্বস্ত হয়েছে। তারপরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে স্বমহিমায় পর্যটক দর্শনার্থী বিমোহিত হয়ে এখানে যেত। খুঁজে পেত কুয়াকাটায় বেড়ানোর সার্থকতা। নিত্যদিন শত শত পর্যটক-দর্শনার্থী উদ্যানে দিনভর ঘুরে বেড়াত। খুঁজে ফিরত প্রকৃতির না দেখা বর্ণিল সুন্দরকে।
কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে সৈকত লাগোয়া জাতীয় উদ্যানের অবস্থান। চার দিকে ঝাউবাগানে ঘেরা ছিল। মাঝে মধ্যে দেয়া আছে একটু বিশ্রামের জন্য বেঞ্চি। লেকটির দুইপাড়ের সীমাহীন সুন্দরের বিভিন্ন প্রজাতির বনজ, ফলদ, সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছের সমাহার ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে কুয়াকাটায় জাতীয় উদ্যান করা হয়। যার মধ্যে কুয়াকাটার ইকোপার্ক ছাড়াও রয়েছে ফাতড়ার বিশাল বনাঞ্চল। বনাঞ্চল ছাড়াও বিশাল বনভূমি ইকোপার্কের এরিয়ায় রয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদফতরের উদ্যোগে প্রাথমিক পর্যায়ে দুই কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করা হয়।
এ ছাড়া ওই সময় প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইকোপার্ক এলাকায় ম্যানগ্রোভ এবং শোভাবর্ধনকারী বাগান, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়নে বাগান সৃজনসহ ৪৭ হেক্টর বাগানে নারিকেল, ঝাউ, আমলকী, অর্জুন, জারুল, হিজল, চালিতা, পেয়ারা, জাম, হরিতকি, কাঠবাদাম, মহুয়া, কামিনি, লালকরমচা, পলাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির লক্ষাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়। এর বাইরে এক হাজার ৬৬৭টি নারিকেল চারাও লাগানো হয়েছে। কিন্তু এসবের ৭০ শতাংশ নেই। সেগুলো বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের তাণ্ডবে ইকোপার্ক সংলগ্ন নারিকেল বাগান, ঝাউবনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ইতোমধ্যেই সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু মূল ফটকে একটি গেট রয়েছে। অরক্ষিত একটি বাউন্ডারি রয়েছে। গেটে কোনো নিরাপত্তারক্ষী নেই। ভেতরে একটি পাকা টংঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। যেন কুয়াকাটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় একটি স্পটের জীবন সায়াহ্নে এসে গেছে।
কুয়াকাটায় আসা একাধিক পর্যটকের সাথে আলাপ করলে তারা জানান, ইকোপার্কের মধ্যে কাঠের ব্রিজগুলো একেবারেই ভাঙাচোরা। এ ছাড়া সামান্য বৃষ্টি হলে রাস্তাকর্দমাক্ত হয়ে যায়। ফলে পর্যটকদের চলাফেরায় বিঘœ ঘটে।
বন বিভাগের এক বিট কর্মকর্তা জানান, সাগরের শাসন না থাকায় প্রাকৃতিক কারণে ঢেউয়ের তাণ্ডবে সৈকতের বালু সরে গিয়ে বিভিন্ন গাছ নষ্ট হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মহিপুর বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতীয় উদ্যানের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। সৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছগুলো আগামী সপ্তাহে সরানো হবে। এগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে অপসারণ করা হয়নি। কারণ ঢেউয়ের প্রাথমিক চাপটা এ গাছগুলো ঠেকায়।

 


আরো সংবাদ