২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিদেশে নির্যাতিত নারী অভিযোগ তদন্তে ‘ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন

-

সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো নারী কর্মীদের ওপর যে ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে, সেগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করেছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।
তদন্তে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগের সত্যতা মিলছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের দেশে থাকা স্বজনদের দেয়া লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব তদন্ত করা হয়।
গতকাল জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর যুগ্মসচিব (পরিচালক প্রশাসন) মো: আতাউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ব্যুরোর কর্মসংস্থান উইংয়ের পরিচালক মো: মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি ‘নারী কর্মী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল’ খোলা হয়েছে। এতে ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মাসুদ রানাসহ আরো কয়েকজন রয়েছেন। মাস দেড়েক আগে এই সেল খোলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই সেলে বিদেশে যাওয়া যেসব নারী কর্মী রয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা সমস্যায় আছেন, তাদের বিষয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনেরা এখানে এসে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগ আসার পরই যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির নাম আসছে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রথমে সেই অফিস সরেজমিন পরিদর্শন করতে যাচ্ছেন। সবার সাথে কথা বলছেন। সবকিছু তদন্তের পর যেসব এজেন্সির দোষ খুঁজে পাওয়া যায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনোটার সার্ভার বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আবার কোনোটার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হচ্ছে।
এ দিকে বিদেশে যাওয়ার পর কিছুদিন না যেতেই কথিত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তাদের স্বজন অথবা দালালেরা রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করছেন বলে ভুক্তভোগী রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের পক্ষ থেকে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকার আরামবাগের সৌদিয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক গোলাম নবীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার অফিস থেকে দুই বছর আগে সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা রতœা বেগম নামের এক নারী কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। ওই নারী কর্মী সম্প্রতি ছুটিতে দেশে এসেছেন। তার দেশে ফেরার ডকুমেন্ট আমরা পেয়েছি। ছুটিতে এসেই তিনি নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ তুলে আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যুরোতে মিথ্যা অভিযোগ দেন বলে শুনেছি। এখন আমি এই মিথ্যা অভিযোগের ব্যাপারে কার কাছে প্রতিকার চাইবো? পরে তিনি রতœার পাঠানো দালাল মান্নানের সাথে যোগাযোগ করলে মান্নান তাকে জানান, রতœা জনশক্তি ব্যুরোতে যে অভিযোগ করেছে সেটি তাকে আমি প্রত্যাহার করে নিতে বলবো। এর জন্য তাকে দিয়ে আরেকটি চিঠি দিয়ে দেবো বলে মান্নান জানান। কিন্তু তার আগেই গৃহকর্মী সুমা আক্তারের সাত মাসের বকেয়া পাওনা প্রসঙ্গে অভিযোগকারীর একটি চিঠি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা স্বাক্ষরিত চিঠি সৌদিয়া রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সুমা আক্তারকে বেতন ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে বিএমইটিকে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এ প্রসঙ্গে সৌদিয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক আক্ষেপ করে বলেন, একজন নারী শ্রমিক দুই বছর বিদেশে অবস্থান করে সুস্থভাবে ছুটিতে দেশে ফিরে এলেন। চুক্তির মেয়াদ থাকে দুই বছর। আর দেশে এসেই তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেন? বলেন, এটা কী করে সম্ভব?
জনশক্তি ব্যুরোর তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে জানান, এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে তা হাতেগোনা। আর এসবের সাথে বেশির ভাগ সময় নারী কর্মীদের পাঠানো দালাল জড়িত থাকে। এটিও তাদের তদন্তের মধ্যে থাকে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
জনশক্তি ব্যুরোর বহির্গমন শাখা সূত্রে জানা গেছে, নারী শ্রমিক যাওয়া দেশগুলো থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪-৫ হাজার নির্যাতিত কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন। যা দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকের শতকরা ১ ভাগ বলে দাবি করছেন কর্মকর্তারা। তারপরও নির্যাতিতদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যুরোতে নারী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল খোলা হয়েছে। একই সাথে যেসব নারী কর্মী বিদেশে যেতে এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের ট্রেনিং নিশ্চিতের পাশাপাশি সাক্ষাৎকার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যুরোর বহির্গমন শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, সাক্ষাৎকার ছাড়া একজন নারী শ্রমিকও বিদেশে যাওয়ার বাহির্গমন ছাড়পত্র পাচ্ছেন না। এর আগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৭ম তলায় সহকারী পরিচালক এনামুল হকের দফতরে প্রতিদিন নারী কর্মীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে। সেখানে কেউ আনফিট হলে তাকে বাদ দেয়া হচ্ছে।


আরো সংবাদ