২০ নভেম্বর ২০১৮
আজ ইউজিসিতে এ ব্যাপারে কর্মশালা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা হচ্ছে

-

উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষাপটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সলর এবং শিক্ষক সমিতিসহ রাজনৈতিক চাপÑএ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের মেয়াদের অন্তিম মুহূর্তে এসে এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামীতে এ সরকার ক্ষমতায় এলে এ নীতিমালাকেই অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। অন্য কোনো দল এলেও তাদের জন্য এটি একটি গাইড লাইন হিসেবে কাজ করবে।
ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবদুল মান্নানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিনের সর্বোচ্চ চেষ্টার পর এ অভিন্ন নীতিমালা আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার মান বজায় রাখতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। এটা হলে শিক্ষার মানই উন্নত হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্যও দূর হবে।
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক নিয়োগের অভিন্ন নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১১ বছরেই অধ্যাপক হয়ে যান। কোথাও প্রভাষক পদে যোগ দিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রথম শ্রেণী বাধ্যতামূলক। আবার কোথাও যেকোনো একটিতে প্রথম শ্রেণী থাকলেই চলে। স্বায়ত্তশাসিত চারটি বড় ও পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে। অভিন্ন নীতিমালা হলে তা বন্ধ হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা এবং ইউজিসি।
নীতিমালার খসড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, থিসিসসহ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদোন্নতি পদে ন্যূন্যতম ১০ বছরসহ মোট ২২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে সাত বছরসহ মোট ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্রিুয় থাকতে হবে। পিএইচডিপ্রাপ্তদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ন্যূনতম ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিতে একজন শিক্ষককে কমপক্ষে সাত বছরের ক্লাসরুম শিক্ষকতাসহ ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম ছয় বছরসহ মোট ৯ বছরের সত্রিুয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর পিএইডিধারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম চার বছর মোট ন্যূনতম সাত বছরের বছরের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্বীকৃত জার্নালে কমপক্ষে সাতটি গবেষণা প্রবন্ধ থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চারটি প্রকাশনা থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতি পেতে একজন শিক্ষককে ন্যূনতম তিন বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল ডিগ্রিধারীদের জন্য দুই বছর এবং পিএইচডি থাকলে এক বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর স্বীকৃত কোনো জার্নালে ন্যূনতম চারটি প্রকাশনা থাকতে হবে। এ ছাড়া বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক, বিজনেস স্টাডিজ, চারুকলা ও আইন অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোর জন্য প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী এবং সহযোগী থেকে অধ্যাপক নিয়োগে একটি অভিন্ন শর্তাবলি যোগ করা হয়েছে নীতিমালায়। একই ভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়, মেডিসিন, কৃষি ও কৃষি প্রাধান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা নিয়োগ শর্তাবলি করা হয়েছে।
সিনিয়র অধ্যাপক থেকে গ্রেড-৩ থেকে গ্রেড-২ পেতে হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে অধ্যাপক পদে ন্যূনতম চার বছর চাকরি এবং স্বীকৃত কোনো জার্নালে বিষয়ভিত্তিক দুইটি নতুন আর্টিকেল প্রকাশের শর্তে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দ্বিতীয় গ্রেড পাবেন। একই ভাবে দ্বিতীয় গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের মোট চাকরিকাল ন্যূনতম ২০ বছর এবং দ্বিতীয় গ্রেডের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছানোর দুই বছর পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রথম গ্রেড পাবেন। তবে এ সংখ্যা মোট অধ্যাপকের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানান, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বেতন স্কেলে বৈষম্যের প্রতিবাদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে শিক্ষক নেতাদের বৈঠকে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বৈষম্যের বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। তখনই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি মানসম্মত অভিন্ন নীতিমালা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়। মন্ত্রণালয় উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসিকে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়।
দায়িত্ব পাওয়ার পর ইউজিসির পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে এ ব্যাপারে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. ইউসুফ আলী মোল্লাকে প্রধান করে কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. শাহ নওয়াজ আলি, প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম ও প্রফেসর ড. মো: আখতার হোসেন এবং ইউজিসি সচিব ড. মোহাম্মদ খালেদ। কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের পরিচালক খন্দকার হামিদুর রহমান দায়িত্ব পালন করেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি বিদ্যমান নীতিমালাসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও ফেডারেশনগুলোর শীর্ষ শিক্ষক নেতাদের সাথে বৈঠক ও মতামত নিয়ে খসড়া চূড়ান্ত করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ নিয়ে আজ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউজিসির মিলনায়তনে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। কর্মশালার সুপারিশের পর মঞ্জুরি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পাস হবে। এরপর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে এ বিধিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে। তবে আশার কথা হচ্ছে এটি প্রণীত হতে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই নীতিমালা হলে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি জটিলতা, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমাসহ শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সমন্বিত কোনো নীতিমালা নেই। ফলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানও সমান নয় এবং ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য বিরাজমান।


আরো সংবাদ