২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রসূতিদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে চৌগাছার পল্লবী ক্লিনিক

-

যশোরের চৌগাছার সেই পল্লবী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রসূতিদের জীবননিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলিপ কুমার রায়।
নির্দেশের প্রেক্ষিতে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে প্রসূতিদের জীবননিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ তদন্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.আওরঙ্গজেবকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গাইনি ডা. হাবিবা সিদ্দিক ফুয়ারা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হেডক্লার্ক আলামিন হোসেন। তদন্ত কমিটিকে দিন কর্মদিবসের মধ্যে রির্পোট পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, পল্লবী ক্লিনিকে চলছে সেবার নামে প্রহশন, প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নামিদামী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সোভা বৃদ্ধি করে ক্লিনিকে সেবার নামে চলছে প্রহশন ক্লিনিকে বড় বড় অক্ষরদিয়ে লেখা হয়েছে স্বল্পখরচে সেবা প্রদান করা হয়, জটিল ও কঠিন অপারেশন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা করা হয়। যে কথা গুলো লেখা রয়েছে ক্লিনিকে কাজ হচ্ছে সর্ম্পূণ উল্টো। প্রসূতিদের জীবন নিয়ে পল্লবী ক্লিনিক রিতিমত ছিনিমিনি খেলা করে চলেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক খবর প্রকাশে নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে আসা সকল অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে ওই ক্লিনিকের ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য আইনে কিøনিকে রোগীদের দেখভালের জন্য সার্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস ডাক্তার থাকার নির্দেশনা থাকলেও পল্লবী ক্লিনিকে তেমন কোন ডাক্তার নেই। এমনকি কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকাও (নার্স) নেই।
সূত্রমতে ২৪ জুলাই সিজারিয়ান অপারেশন করতে উপজেলার দিঘলসিংহা গ্রামের জয়নাল আবেদিনের মেয়ে ও মহেশপুরের ভাটপাড়া গ্রামের আলমগীরের স্ত্রী তাহমিনা খাতুনকে (২৫) পল্লবী ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। অপারেশনের সময় প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ ও হ্যান্ড গ্লোবস রেখে সেলাই করা হয় বলে অভিযোগ করেছে তার স্বজনেরা। তারা জানান সিজারের কয়েকেদিন পরে তাকে রিলিজ দেয়ার পরও বাড়িতে গিয়ে প্রসূতির ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় স্বজনরা কিøনিকের কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন বিষয়টি। তখন ক্লিনিক মালিক মিজানুর রহমান ঔষধ দিয়ে বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন আস্তে আস্তে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে কিøনিক থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে চলে যাওয়ার ১ মাস ১৩ দিন পরও রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় গত ২রা সেপ্টম্বর রোববার তাহমিনাকে আবারো ওই ক্লিনিকে নিয়ে যান স্বজনরা। এসময় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে বন্ড নিয়ে ওই রোগীকে দুইবার জরায়ু ওয়াস করে দেয়। ওয়াশের সময় রোগীর জরায়ু থেকে রক্তাক্ত মফ (যা অপারেশনের সময়ে তাৎক্ষণিক রক্ত বন্ধের সময়ে প্রটেকশনের জন্য জরায়ুতে ব্যবহার করা হয়, এটি সর্বোচ্চ ৭২ ঘন্টার মধ্যে খুলে ফেলতে হয়) বেরিয়ে আসে। বিষয়টি রোগীর স্বজনরা জানতে পেরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি কনসালটেন্ট ডা. রবিউল ইসলামের চৌগাছা শহরের চেম্বারে শরাপন্ন হন। রোগীর অবস্থা মুর্মুষ হওয়ায় ডা. রবিউল ইসলাম তাদেরকে বলেন অভিজ্ঞ নার্স দিয়ে রোগীর পিভি করতে হবে। তার শরীরের মধ্যে গজ-ব্যান্ডেজ বা অন্য কিছু থেকে যেতে পারে। এজন্য তিনি রোগীকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পরামর্শমত তহমিনাকে সদর হাসপাতালে গাইনী ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে ফের তার আলট্রাসোনো করানো হয়েছে। তহমিনার স্বজনরা জানিয়েছেন সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের বলেছেন প্রয়োজনে তার আবারো অস্ত্রপোচার করা লাগতে পারে।
একই ক্লিনিকেই ২০১৬ সালে ৭ই অক্টোবর উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের হাফিজুরের স্ত্রী মাফিজা (২৫) নামে এক প্রসূতির সিজার করা হয়। সেসময়ও প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ (মফ) রেখে সেলাই করা হয়। দীর্ঘদিন তার পেটের যন্ত্রনা বন্ধ না হলে স্বজনরা তাকে যশোরের নূর মহল ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে পেটে মফ রয়েছে বলে জানতে পারেন। পরে সেখানে পুনরায় অপারেশন করে রোগীর পেট থেকে মফ বের করা হয়। বিষয়টি বিভিন্ন পত্রপ্রত্রিকায় প্রকাশিত হলে পল্লবী ক্লিনিকের মালিক মিজানুর রহমান মোটা অংকের টাকা দিয়ে রোগীর স্বজনদের ম্যানেজ করেন।
এর আগে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি উপজেলার খড়িঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা ও চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী আসমা খাতুন (২৭) কে পল্লবী ক্লিনিকে সিজার করা হয়। সেসময় রোগীর পেটের মধ্যে ব্যান্ডেজের বান্ডিল রেখেই সেলাই করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে যশোর কুইন্স হাসপাতালে নিলে সেখানে আল্ট্রাসনো করলে রোগীর পেটে গজের বান্ডিল রয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। রোগিকে বাঁচাতে পুনরায় অপারেশন করে গজের বান্ডিলটি বের করা হয়। আসমা খাতুনের স্বজনরা জানিয়েছেন আর দু’এক দিন অতিবাহিত হলেই রোগীকে বাঁচানো যেতনা বলে জানিয়েছিলেন ডাক্তার। এ ঘটনায় যশোর সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগ করেছিলেন রোগীর স্বজনরা।
তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগম বলেন, “যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলিপ কুমারের নির্দেশে ক্লিনিকটির বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আওরঙ্গজেবকে প্রধান কওে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে”।


আরো সংবাদ