১৫ নভেম্বর ২০১৮

অবশেষে আপন ঠিকানা পেল সাত গ্রামের মানুষ

-

হাইকোর্টের রায়ে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর ও যশোর জেলার চৌগাছা এ দুই উপজেলার সাত গ্রামের মানুষ রশি টানাটানির হাত থেকে মুক্তি পেল। দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর, শ্যামনগর, কমলাপুর, আলিশা, যদুনাথপুর, রাড়িপাড়া ও পাঁচবাড়িয়াসহ সাতটি গ্রামের মানুষ।

গত ২০০৮ সালের ১৭ই জানুয়ারী এ সংক্রান্ত একটি রীট বিচারপতি তারিক-উল হাকিম ও বিচারপতি ফারাহা মাহবুব এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রিটটি খারিজকরে দেন। তবে কোনপক্ষই বিষয়টি খোঁজ খবর না নেওয়ায় দীর্ঘদিন রায়টি কার্যকরের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত ১৩ই আগস্ট স্থানীয়রা রায়েরকপি উত্তোলন করে সাংবাদ কর্মীদের কাছে সরবরাহ করলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

জানাযায়, দুই উপজেলার মধ্যবর্তি এই সাতটি গ্রাম নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে রশি টানাটানি চলে আসছিল। সাতটি গ্রাম মহেশপুর উপজেলার পক্ষে রাখতে দায়ের করা একটি রিট হাইকোট খারিজ করে দেওয়ায় গ্রামগুলো চৌগাছা উপজেলায় থাকতে আর কোন বাধা নেই। এ রায়ের ফলে প্রশাসনিকভাবে মহেশপুর উপজেলায় সেচ-বিদ্যুৎ ও শিক্ষা বিষয়ে চৌগাছা উপজেলার নিয়ন্ত্রনে থাকা সাতটি গ্রামের নাগরিকদের টানাহেচড়া ও দ্বৈত শাসনের অবসান হতে চলেছে।

রীটের নথি সূত্রে জানা যায়, সাত গ্রামের গণমানুষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ‘নিকার’-৫৫ তম বৈঠকের সিন্ধান্ত মোতাবেক ১৯৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঝিনাইদাহ জেলার মহেশপুর উপজেলা থেকে বিযুক্ত করে গ্রামগুলো যশোরের চৌগাছা উপজেলায় যুক্ত করা হয়। ১৯৯০ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনে চৌগাছার অধিবাসী হয়ে গ্রামগুলোর মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

পরে ১৯৯৪ সালে সাত গ্রামের একাংশের জনগনের আবেদনে তৎকালীন চার জন জাতীয় সংসদ সদস্যে সাতটি গ্রাম মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নের অর্ন্তরভুক্ত করণের সুপারিশ করেন। সংসদ সদস্যদের সুপারিশ বিবেচনা করে ‘নিকার-৮১ তম বৈঠকে পূর্বের সিন্ধান্ত বাতিল করা হয়। এবং ৪ অক্টোবর ১৯৯৪ তারিখে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৭টি মৌজাকে পুনরায় মহেশপুর উপজেলায় যোগ হয়।

বিষয়টি আলোচনায় আসলে তৎকালীন বিদ্যুৎ জালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম কর্তৃক মন্ত্রী পরিষদের সচিবের বরাবর প্রেরিত একটি উপআনুষ্ঠানিক পত্রে পুনরায় সাত গ্রামকে চৌগাছা উপজেলায় সংযুক্তির জন্য বিভিন্ন দপ্তরে পাঠান।

১৯৯৪ সালের সীমানা কমিশনের রিপোর্টে সাতটি মৌজাকে পূনরায় যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলায় অর্ন্তভুক্তি করার সুপারিশ করেন। সুপারিশ পত্রে বলা হয় ‘নিকার’ ৮১তম বৈঠকে যথাযথ বিবেচনা না করেই ৫৫ তম বৈঠকের (৭টি মৌজা চৌগাছার সাথে সংযুক্তকরন) সিন্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। উপজেলা সদরের দুরত্ব, অর্থ ও সামাজিক বিষয় বিবেচনা করে ৭টি মৌজা যশোরের চৌগাছা উপজেলার সাথে যুক্ত করা যায়।

সুপারিশের ভিত্তিতে মহেশপুর ও চৌগাছা উপজেলার থানা পুর্নগঠনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও ভুমি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিকারের এই সিন্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মহেশপুর উপজেলার মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম সর্দার হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।

বিষয়টি আমলে নিয়ে হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি এম এ আজিজ ও বিচারপতি হুদার একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। যার কারণে সাতটি গ্রাম চৌগাছার অর্ন্তভুক্তির বিষয়টি স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ৭টি গ্রামের প্রশাসনিক কার্যক্রম দুই উপজেলার মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়। প্রশাসনিক দায়িত্ব মহেশপুর উপজেলায় এবং সেচ-বিদ্যুৎ ও শিক্ষাবিষয়ে চৌগাছা উপজেলার নিয়ন্ত্রনে থাকে।

এ ব্যাপারে আন্দুলিয়া দাখিল মাদরাসার সুপার ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মাও.আব্দুল কাদের ও বেল্টু রহমান বলেন, মামলাটি অফিসিয়াল প্রক্রিয়া নিজ গতিতে ২০০৮ সালেই রায় হয়েছে। আমরা কোন খোজ-খবর না রাখার ফলে জানতে পারিনি। পরে মন্ত্রণালয়ের একটি সুত্র থেকে জানতে পেরে মামলার কপি উত্তোলন করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।

পুড়াপাড়া কাটগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল মালেক বলেন, ৭ গ্রামের মানুষ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজসহ চাকুরী প্রত্যাশী ছেলে মেয়দের চাকুরির আবেদনে এবং চাকুরির মৌখিক পরীক্ষায় ঠিকানা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তিনি খোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অন্তত একটি ঠিকানা পেলাম।

এ ব্যাপারে কমলাপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত (ইদরাকপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের) প্রধান শিক্ষক মাষ্টার শহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার বলতে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য যা বুঝাই তা গ্রহণ করতে এ সাত গ্রামের মানুষের যশোর জেলার চৌগাছাতেই সুবিধা বেশি। তাই আমাদের দাবী পৃথক একটি নতুন ইউনিয়ন করে ঝিনাইদহ মহেশপুর থেকে আমাদেরকে যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার অন্তরগত করা হোক।

 

দেখুন:

আরো সংবাদ