২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদ নারীর জন্য কতটা কঠিন

ইন্দ্রা নুয়ি - ছবি : সংগ্রহ

ব্যবসায়িক দুনিয়ায় ইন্দ্রা নুয়ি ছিলেন খুবই বিরল একটি উদাহরণ। একজন অভিবাসী ও একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি গত ১২ বছর যাবৎ পেপসিকোর প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন। এই কাজের সুবাদেই তিনি ঠাই করে নিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান কর্পোরেট ব্যক্তিত্বদের তালিকায়।

এমন এক প্রতিষ্ঠানের দেখভালের দায়িত্বে তিনি ছিলেন যারা বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থের পণ্য কেনাবেচা করে আর যাদের রয়েছে ২২টি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড, যার মধ্যে কোয়েকার ও ট্রপিকানা অন্যতম।

২০০৬ সালে তিনি যখন পেপসিকোর প্রধান নির্বাহী হন, তখন অ্যামেরিকার শীর্ষ ৫০০টি পাবলিক কোম্পানি মিলে বারো জন নারীও শীর্ষ পদে ছিলেন না। ২০১১ সালে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে নয়ি বলেছিলেন, ‘আপনি এখন একজন রোল মডেল। ফলে সবাই তখন আপনার কাজ দেখছে, এবং এসব কাজ খুবই কঠিন। কারণ এজন্য আপনাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে সব সময়।’

তিনি বলেন, ‘কোন ধরণের বাড়তি সুবিধা কিংবা সাজপোশাক - এগুলো কখনো মাথায় জায়গা দেবেন না। নিজের পা সব সময় মাটিতেই যেন থাকে, আর নিজের পদের দায়িত্ব পালনে পুরোটা মনোযোগ দেয়া---এটুকুই করি আমি।’

দক্ষিণ ভারতে তৎকালীন মাদ্রাজ, আজকের চেন্নাইতে জন্ম নুয়ির বর্তমান বয়স ৬২ বছর। তার পরিবারই তার ভেতরে উচ্চাকাঙ্খা তৈরি করে দিয়েছিল। তার মা রোজ তাকে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ের ওপর বক্তৃতা করতে দিতেন। আর তার দাদা ছিলেন একজন বিচারক, যিনি নুয়ি ও তার ভাইবোনদের অংক শেখাতেন।

মাদ্রাজ ক্রিস্টিয়ান কলেজের পাট চুকিয়ে তিনি পড়তে যান ইন্ডিয়ান ইন্সিস্টিটিউট বা আইআইটিতে। এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে পড়তে যান। পড়াশোনা শেষে মটোরোলাসহ বিভিন্ন নামী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর ১৯৯৪ সালে পেপসিতে যোগ দেন নুয়ি।

এরপর ক্রমে ২০০১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে নির্বাচিত হন প্রধান নির্বাহী। ইন্দ্রা নুয়ি যখন পেপসিতে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন, তখন বিশ্বে একাধারে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা, সেই সঙ্গে চিনিমুক্ত সোডা জাতীয় পানীয়ের পক্ষে তুমুল প্রচারণা।

ফলে এক সময় প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধ্য হয়। এছাড়া পেপসির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিলেন পরিবেশ বিষয়ক কয়েকজন অ্যাকটিভিস্ট বা আন্দোলনকারী। তাদের সামলেও প্রতিষ্ঠানটি নুয়ির নেতৃত্বে সামনে এগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মধ্যে অভিবাসীদের যে প্রবণতা তা ভালোভাবেই আছে। মানে, আমার মনে হয়, আমার চাকরিটি যেকোনো সময় চলে যেতে পারে এবং আমার শূন্যস্থান অন্য কেউ পূরণ করে ফেলবে।’

২০০৬ সালে তিনি প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেবার পর পেপসির আয় বছরে সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি ডলারের ওপরে। সেসময় থেকে পুজিবাজারে পেপসির শেয়ারের দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ।

সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে নুয়ি বলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়া আসলে কোন চাকরির মত করে করা উচিত নয়। এটা কোনো কাজের প্রতি অন্তরে অনুভূত হওয়া এক ধরণের আহ্বান। আর সেই আহ্বানে সাড়া দিতে আপনি মাথা, হৃদয় ও হাত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আপনি যা করছেন তা আপনাকে ভালবাসতে হবে, আর সেটি আপনাকে একেবারে গ্রাস করে নেবে।’

আগামী অক্টোবরে নুয়ি যখন পদত্যাগ করবেন, তখন অ্যামেরিকার পুঁজি বাজারে নিবন্ধিত শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানি মিলে প্রায় পঁচিশ জন নারী শীর্ষ পদে থাকবেন। শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন ও পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে যে টেনশন বা উদ্বেগ পোহাতে হয় একজন নারীকে সে ব্যপারে সব সময় খোলামেলা আলাপ করেছেন ইন্দ্রা নুয়ি।

সংসার জীবনে নুয়ির দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। এই সফল কর্মকর্তা মনে করেন, ক্যারিয়ার ও সংসার দুই ক্ষেত্রে ভালো করতে হলে ব্যাপক পরিসরে সহযোগিতার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দরকার।


আরো সংবাদ