২০ জানুয়ারি ২০২০

রাসূলুল্লাহ সা:-এর অনুসরণ

-

(গত সংখ্যার পর)

ইত্তেবায়ে সুন্নাতকে বোঝার আগে এর গুরুত্ব বুঝতে হবে, আর এর গুরুত্ব বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। আরবের কাফেররাÑ আবু জেহেল, আবু লাহাব, ওতবা, শায়বাÑ ওরা আল্লাহ এক এ কথা কিন্তু মানত। আল্লাহর ইবাদত করত। আল্লাহ ছাড়া কোনো রব নেই তাও মানত। আল্লাহকে রাব্বুল আলামিন মানত; কিন্তু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মানত না। কেন মানত না। তা একটু বুঝুনÑ আরবের কাফেররা নিজেদের কাফের বলত না, বরং বলত তারা ইব্রাহিম নবীর উম্মত। তারা বলত, তারা আওলাদে রাসূল। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আ:-এর আওলাদে রাসূল। এ ছাড়া তারা সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সা:-এর বংশের আপন আত্মীয় ছিল এবং তারা দুনিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত ঘর কাবাঘরের খাদেম ছিল। তারা সব দিক থেকে দ্বীনের সবচেয়ে কাছের ছিল; কিন্তু প্রবলেম ছিল, মানুষ গতানুগতিকতার বদলে নতুনত্ব চায়Ñ তারা প্রায় তিন হাজার বছর ইব্রাহিম আ:-এর শরিয়ত মেনে চলেছে। ইব্রাহিম নবী যা যা করেছেন, তারাও তা মেনে চলার চেষ্টা করেছে। এরপর আরবের মানুষের মধ্যে কিছু ভালো বুদ্ধিমান লোক পাওয়া গেল। তারা দ্বীনের মধ্যে কিছু নতুন দলিল দিয়ে, যুক্তি দিয়ে যোগ করতে লাগল দ্বীন দুই রকমÑ ১. ইত্তেবাÑ নবী যা করেছেন তাই করব; অন্যটি ২. দলিল। ইত্তেবা আর দলিলের মধ্যে পার্থক্য হলোÑ আপনাদের একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করব, আমরা কুরআন পড়ি, আল্লাহর কিতাব পড়িÑ এটা যুক্তি অনুযায়ী বা দলিল অনুযায়ী দাঁড়িয়ে পড়াই উচিত। প্রধানমন্ত্রী, এমপি এলে দাঁড়িয়ে যাই; অথচ আল্লাহর কালাম পড়ার সময় দাঁড়াব না, এটা হয় না। আমরা তো নামাজেও কুরআন দাঁড়িয়ে পড়ি, রুকু-সিজদায় পড়ি দোয়া। সেজন্য বলা যায় কুরআন দাঁড়িয়ে পড়া উচিত, আল্লাহই এমন শিখিয়েছেন। নফল নামাজ দাঁড়িয়ে ও বসে পড়লেও চলবে। সুন্নত এক জিনিস আর দলিল আরেক জিনিস। নবী নামাজে কুরআন দাঁড়িয়ে পড়তেন, কিন্তু অন্য সময় কি দাঁড়িয়ে পড়তেন? নিশ্চয়ই না; বসে পড়তেন। নামাজের বাইরে রাসূলুল্লাহ সা: বসে এমনকি শুয়েও পড়তেন। হজরত আয়েশা রা: বলেছেন, রাসূল সা: আমার কোলে মাথা রেখে কুরআন পড়তেন। তাহলে কী হলোÑ কুরআন নামাজের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়া সুন্নত এবং নামাজের বাইরে বসে পড়া সুন্নত। দাঁড়িয়ে পড়া নামাজের নয়, দোষ নেই। দাঁড়িয়েই পড়–ক আর বসেই পড়–ক সওয়াব হবে; কিন্তু দাঁড়ানো নামক কাজকে কুরআন তেলাওয়াতের অংশ মনে করা, আদব মনে করার নাম হলো বিদায়াত। কেন বিদায়াত? একজন লোক পায়ে ব্যথা হওয়ার কারণে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়ছেÑ সে এটা মনে করে না, যে বসে বা শুয়ে পড়ছে সে ভুল করছে। কিন্তু কেউ যদি দাঁড়িয়ে পড়াকেই নিয়ম মনে করে তখনই সমস্যা। যে বসে পড়াকে বেয়াদবি বা আদবের খেলাপ মনে করছে। এতে কী হলো, লোকটা রাসূল সা:-এর সুন্নত তরিকাকে দোষ মনে করল। আর নবীর তরিকা দোষ মনে করলে ঈমান থাকে না। দলিলের অভাব নেই তা অকাট্য, কিন্তু সুন্নত রাসূল থেকে নিতে হবে, দেখতে হবে, জানতে হবে, মানতে হবে। নবীর সুন্নতকে দোষ মনে করলে ঈমান থাকে না। আরবের কাফেররা প্রায় তিন হাজার বছর ইব্রাহিম নবীর তরিকায় হজ, ওমরা সব করেছে। এরপর সমাজে কিছু আল্লামা জন্ম নিলেন, তারা ইজতেহাদ করে, গবেষণা করে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে লাগলেন। ইজতেহাদ ভালো জিনিসÑ যেমন ইব্রাহিম আ:-এর সময় একটা জিনিস ছিল না এখন কী হবেÑ আর একটা হলোÑ যুক্তি দিয়ে, দলিল দিয়ে নতুন নিয়মকানুন বানানো। দু-একটা নিয়মকানুনের কথা বলিÑ আমরা হজ করি, আবু জেহেল হজ করত। ইব্রাহিম আ: তালবিয়া পড়ে পড়ে হজ আদায় করতেন, ওমরা ও তাওয়াফ করতেন ইহরামের কাপড় পরে। মক্কার লোকেরাও তাই করত, কিন্তু এক সময় তারা বললÑ ইব্রাহিম হালাল খেতেন, এখন তো আমরা হারামের মধ্যে ডুবে আছি, আমাদের ইহরামের কাপড়ও হারামের টাকায় কেনাÑ তাই আমাদের উচিত ইহরাম ত্যাগ করে ন্যাংটা হয়ে কাবা তাওয়াফ করা। যারা সুন্নতের পাবন্দ তারা বললÑ হায় হায়, ইব্রাহিম নবী ইহরাম পরে তাওয়াফ করেছেন; তোমরা আবার ন্যাংটা হচ্ছো কেন? তারা বললÑ ইব্রাহিম আ: তো হারামখোর ছিলেন না, আমরা এখন এ নতুন পরিস্থিতিতে কী করবÑ আল্লাহ আমাদের দুনিয়ায় যেভাবে পাঠিয়েছেন সেভাবেই যেতে হবে। হজে আমরা ৯ জিলহাজ কোথায় থাকিÑ আরাফায়। মক্কার কাফেররা বললÑ পৃথিবীতে আল্লাহর মহাপবিত্র স্থান মক্কার হারাম বা মহাপবিত্র জায়গা হলো কাবা, এর বাইরে আরাফা হলো হালাল। আমরা মক্কার লোক হজের মতো মহাপবিত্র দিনে তাই আমরা আরাফাতে না গিয়ে মুজদালিফায় যাই, এ কারণে যে এটা হালাল এলাকা। ইব্রাহিম নবী বাইরের লোক তাই আরাফায় অবস্থান নিয়েছিলেন। ইব্রাহিম নবী হজ করেছেন সারা বিশ্বের মানুষের জন্য। আমরা মক্কার মানুষ, আমাদেরকে আরাফায় যেতে হবেÑ এমন কথা কি তিনি কোথাও বলেছেন? কাবাঘর মহাসম্মানিত, আরাফার দিনও মহাসম্মনিত এটা দলিল; কিন্তু ইব্রাহিম আ:-এর সুন্নত এভাবে কাফেররা অস্বীকার করল। তারা শামে, ইয়েমেনে ব্যবসার সময় কাবার পাথর নিয়ে যেত। কিছু দিন পর তারা পাথরের তাওয়াফ শুরু করল। ওইসব জায়গায় (ইয়েমেন ও সিরিয়ায়) বিভিন্ন নবীর মূর্তি পাওয়া যেত, তারা তা সংগ্রহ করল। এভাবেই তারা দলিল পেশ করে একপর্যায়ে মূর্তিগুলো কাবাঘরে রাখতে শুরু করল। এ মূর্তি ৩৬০টি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তারা বললÑ আমরা পূজা করার জন্য করছি না, তাদের সম্মানের জন্য রাখছি। এমন নানা যুক্তি-অজুহাতে ইত্তেবায়ে রাসূলের রশি গলা থেকে খুলে ফেলার জন্যই এমন হাল হলো তাদের। তেমনি আমরাও যদি সুন্নাহ থেকে দূরে সরতে থাকি, তো এক সময় শিরক আমাদের জড়িয়ে ধরবে। (চলবে)
অনুলিখন : হেলাল বিশ্বাস


আরো সংবাদ




krunker gebze evden eve nakliyat